Last updated: October 2nd, 2026 at 07:22 pm

নিউজ ডেস্ক: স্কুলে একের পর এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল আতঙ্ক। কেউ বলছিল অলৌকিক কিছু ঘটেছে, কেউ আবার স্কুলে পুজো ও যজ্ঞ করার দাবিও তুলছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে কুসংস্কারের বদলে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে পড়ুয়া ও অভিভাবকদের ভয় কাটাতে উদ্যোগ নিল পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ।
ঘটনাটি পুরুলিয়ার নিতুড়িয়া ব্লকের দিঘা পঞ্চায়েতের রমণীবালা হাইস্কুলের। গত ১৭ সেপ্টেম্বর স্কুলে ইন্টার-ক্লাস ফুটবল প্রতিযোগিতা চলছিল। খেলা শেষ হওয়ার পর নবম শ্রেণির কয়েক জন ছাত্রী আচমকা শ্বাসকষ্ট, হাত-পায়ে টান এবং দুর্বলতার মতো উপসর্গের কথা জানায়। প্রথমে কয়েক জন অসুস্থ হলেও ধীরে ধীরে সেই সংখ্যা বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে একে একে ২১ জন ছাত্রীকে হাড়মাড্ডি গ্রামীণ হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। পরে রাতেও আরও কয়েক জনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনার পরই স্কুল চত্বরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পড়ুয়াদের উপস্থিতি দ্রুত কমতে শুরু করে। অনেকের মধ্যেই তৈরি হয় অজানা আশঙ্কা। এমনকি কুসংস্কারের বশে স্কুলে পুজো ও যজ্ঞ করার দাবিও উঠতে থাকে বলে জানা যায়।
স্কুলের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক দেবাশিস দাস জানান, প্রতি বছরই পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির মধ্যে ক্লাস-লিগ ফুটবল প্রতিযোগিতা হয়। এ বারও সেই নিয়ম মেনেই খেলা চলছিল। তাঁর কথায়, খেলার পরে নবম শ্রেণির কয়েক জন ছাত্রী অসুস্থ বোধ করে। পরে ধীরে ধীরে অসুস্থ পড়ুয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে অভিভাবক ও পড়ুয়াদের ভয় কাটিয়ে স্কুলের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিজ্ঞান মঞ্চকে স্কুলে আসার অনুরোধ জানানো হয়। মাইকে প্রচারের মাধ্যমে পড়ুয়াদেরও বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়।
ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে স্কুলে যান পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের পুরুলিয়া জেলা সম্পাদক তথা পুরুলিয়া মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক নয়ন মুখোপাধ্যায় এবং সংগঠনের সভানেত্রী মল্লিকা সান্যাল। তাঁরা পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলেন এবং কী ভাবে একসঙ্গে এত জনের মধ্যে একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে, তা সহজ ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করেন।
নয়ন মুখোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা, ফুটবল ম্যাচের দিন অনেক পড়ুয়া হয়তো খালি পেটে অথবা খুব অল্প খেয়ে স্কুলে এসেছিল। খেলার উত্তেজনা ও শারীরিক পরিশ্রমের পরে কয়েক জন দুর্বলতা অনুভব করতে পারেন। দু’-এক জনের মধ্যে একই ধরনের উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর তা অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ধরনের পরিস্থিতিকে ‘ম্যাস সাইকোজেনিক ইলনেস’ বা গণ-মনোজাত অসুস্থতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাখ্যাই নয়, পড়ুয়াদের ভয় ও ভুল ধারণা দূর করতে বিজ্ঞান মঞ্চের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় ‘ভয় নয়, যুক্তি দিয়ে ভাবো’ কর্মসূচি। বিজ্ঞানকর্মী জয়প্রকাশ মাহাতো, শৌভিক মুখোপাধ্যায়-সহ অন্যরা বিভিন্ন মজার খেলা ও সহজ পরীক্ষার মাধ্যমে পড়ুয়াদের বোঝান, অজানা কোনও ঘটনাকে অলৌকিক বলে ধরে নেওয়ার আগে তার পিছনে বৈজ্ঞানিক কারণ খোঁজা প্রয়োজন।
বিজ্ঞান মঞ্চের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার পরে অনেক পড়ুয়ার মধ্যেই আতঙ্ক কমে আসে। মেঘনা বাউড়ি, লক্ষ্মী বাউড়ি, শম্পা বাউড়িদের মতো ছাত্রীরা জানায়, স্কুলে আসা নিয়ে যে ভয় তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কেটে গিয়েছে।
একসঙ্গে বহু পড়ুয়া অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ঘিরে যে আতঙ্ক ও কুসংস্কার তৈরি হয়েছিল, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে তা কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্কুলে স্বাভাবিক পরিবেশ ফেরানোর চেষ্টা চলছে। বিজ্ঞান মঞ্চের এই উদ্যোগে পড়ুয়া ও অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে বলেই আশা স্কুল কর্তৃপক্ষের।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments