
নিউজ ডেস্ক: শীত মানেই বাঙালির ভ্রমণের মরশুম। আর সেই তালিকায় বাঁকুড়ার মুকুটমণিপুরের নাম দীর্ঘদিন ধরেই বেশ উপরের দিকে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই কয়েক মাসে জল, জঙ্গল আর পাহাড়ের টানে হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করেন কংসাবতী-কুমারীর মিলনস্থলে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা বলছে, সেই চেনা ছবিতে কিছুটা বদল এসেছে। গত পর্যটন মরশুমে মুকুটমণিপুরে পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে বলে দাবি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। ফলে নতুন শীতের মরশুম শুরু হওয়ার আগেই পর্যটনকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৪-২৫ সালে প্রায় তিন লক্ষ পর্যটক মুকুটমণিপুরে এসেছিলেন। কিন্তু ২০২৫-২৬ সালে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের মতে, এর পিছনে অন্যতম কারণ হল নতুন আকর্ষণের অভাব। মুকুটমণিপুরে মূলত জলাধার, নৌকাবিহার এবং বন পুকুরিয়া ডিয়ার পার্ককে কেন্দ্র করেই পর্যটন আবর্তিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে নতুন কোনও বড় আকর্ষণ তৈরি না হওয়ায় পর্যটকদের একটা অংশ অন্য গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন বলে তাঁদের দাবি।
এই পরিস্থিতিতে অবশ্য পর্যটনকেন্দ্রকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফে মুকুটমণিপুরের পরিকাঠামো এবং পর্যটন পরিষেবা উন্নত করার একাধিক পরিকল্পনা সামনে এসেছে। হুল দিবসের অনুষ্ঠানে মুকুটমণপুরে উপস্থিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ২০ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছেন বলে জানানো হয়েছে। সেই অর্থে পর্যটন দপ্তরের মাধ্যমে একাধিক উন্নয়নমূলক কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মুকুটমণিপুরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলির মধ্যে অন্যতম হতে পারে প্রস্তাবিত রোপওয়ে। পরেশনাথ মন্দির থেকে ড্যামের ওপারে গোপালপুর পর্যন্ত রোপওয়ে তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই RITES-এর তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল এলাকায় সমীক্ষা করেছে বলে স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পর্যটকদের জন্য মুকুটমণিপুর ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।
শুধু রোপওয়ে নয়, বন পুকুরিয়া ডিয়ার পার্ককেও ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমান ডিয়ার পার্ক সংস্কার করে সেখানে একটি মিনি জ়ু তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি উন্নত পার্ক, পরেশনাথ মন্দিরের ব্যাপক সংস্কার, পর্যটকদের থাকার জন্য আবাসন এবং তিনটি নতুন ভিউ পয়েন্ট তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। বারঘুটুর সংস্কারের পাশাপাশি রাস্তা, শৌচালয়, পানীয় জল এবং পর্যটকদের নিরাপত্তার মতো মৌলিক পরিষেবার উন্নয়নেও জোর দেওয়া হবে।
স্থানীয় বিধায়ক তথা মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডুর দাবি, পর্যটকদের কাছে মুকুটমণিপুরকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশ অনুযায়ী পর্যটন দপ্তর কাজ শুরু করেছে। তাঁর বক্তব্য, শুধু পর্যটনকেন্দ্রের ভিতরের পরিকাঠামো নয়, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে জমিজটের কারণে আটকে থাকা ছাতনা-মুকুটমণিপুর রেলপথের কাজও আগামী এক বছরের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ করে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ীরাও নতুন প্রকল্পগুলিকে ঘিরে আশাবাদী। মুকুটমণিপুর হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুদীপ সাহুর মতে, দীর্ঘদিন ধরে নতুনত্বের অভাবের কারণে মুকুটমণিপুরে পর্যটকের সংখ্যা কমছিল। নতুন আকর্ষণ তৈরি হলে পরিস্থিতির বদল হতে পারে। তাঁর আশা, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে শুধু হোটেল ব্যবসা নয়, দক্ষিণ বাঁকুড়ার বিস্তীর্ণ এলাকার অর্থনীতিতেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং গোটা অঞ্চলে একটি বড় আর্থিক করিডর গড়ে উঠতে পারে।
তবে মুকুটমণিপুরের অর্থনীতির সঙ্গে শুধু হোটেল ব্যবসায়ীরাই যুক্ত নন। নৌকাবিহার থেকে শুরু করে ছোট দোকান, হস্তশিল্পের পসরা—বহু মানুষের রুজিরুটিই পর্যটকদের উপর নির্ভরশীল। মুকুটমণিপুর পর্যটনকেন্দ্রে নৌকা চালান তারাপদ সিং সর্দার। তাঁর কথায়, নভেম্বরের মাঝামাঝি শীতের আমেজ শুরু হলেই পর্যটক আসতে শুরু করেন। সরস্বতী পুজো পর্যন্ত চলে মূল পর্যটন মরশুম। বছরের বাকি সময়ে জলাধারে মাছ ধরেই অনেকের দিন কাটে।
পর্যটকদের ভিড় কমে যাওয়ার প্রভাব স্পষ্ট স্থানীয় ছোট ব্যবসাতেও। মুকুটমণপুরে হস্তশিল্পের পসরা নিয়ে বসেন জগবন্ধু সাহু। তাঁর দাবি, ছোট-বড় মিলিয়ে এলাকায় প্রায় ২০০ জন ব্যবসা করেন। কিন্তু অফ-সিজ়নে অধিকাংশ দোকান বন্ধ থাকে। সাধারণত ৮-১০টি দোকান খোলা থাকে। শনিবার ও রবিবার কিছু পর্যটক এলে কেনাবেচা হয়, অন্য দিনগুলিতে ব্যবসা প্রায় থাকে না বললেই চলে।
এই পরিস্থিতিতে রোপওয়ে এবং মিনি জ়ু-র মতো প্রকল্পকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী উত্তম কুম্ভকারের আশা, এই দু’টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু শীতের কয়েক মাস নয়, বছরের অন্যান্য সময়েও মুকুটমণিপুরে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে পারে। পর্যটন মরশুম দীর্ঘ হলে ছোট ব্যবসায়ী থেকে হোটেল মালিক, নৌকাচালক থেকে হস্তশিল্প বিক্রেতা—সবাই উপকৃত হবেন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে অবশ্য মুকুটমণিপুরের কোনও ঘাটতি নেই। কংসাবতী ও কুমারী নদীর মিলনস্থলে গড়ে ওঠা এই পর্যটনকেন্দ্রে জলাধারের বিস্তীর্ণ নীল জল, চারপাশের সবুজ বনভূমি এবং পাহাড়ি পরিবেশ পর্যটকদের বরাবরই আকর্ষণ করে। কিন্তু শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন ধরে রাখা কঠিন—স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে সেই বার্তাই স্পষ্ট।
মুকুটমণিপুরে কী কী নতুন হতে চলেছে?
মুকুটমণপুরে গেলে কোথায় থাকবেন?
মুকুটমণপুরে পর্যটকদের থাকার জন্য সরকারি কয়েকটি লজ রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২০টির মতো বেসরকারি হোটেলও রয়েছে। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, হোটেলের দৈনিক ভাড়া সাধারণত ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকার মধ্যে। নৌকাবিহারের ক্ষেত্রে মাথাপিছু খরচ আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।
শীতের মরশুম দরজায় কড়া নাড়ছে। ফলে আগামী কয়েক মাসই মুকুটমণপুরের পর্যটন ব্যবসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রকল্পগুলির কাজ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তার উপরই অনেকটা নির্ভর করছে পর্যটকদের পুরনো পছন্দের তালিকায় মুকুটমণপুর আবার কতটা জোরালোভাবে জায়গা করে নিতে পারে। প্রকৃতি সেখানে এখনও আগের মতোই আছে। এখন প্রয়োজন সেই প্রকৃতির সঙ্গে নতুন অভিজ্ঞতা জুড়ে দেওয়া। তবেই হয়তো পর্যটকের ভাটার টান কাটিয়ে ফের জমজমাট হয়ে উঠবে দক্ষিণ বাঁকুড়ার এই জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments