
নিউজ ডেস্ক: স্কুলের অর্থ তছরুপের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা বাঁকুড়ার এক স্কুলে। চুরির অভিযোগ তুলে প্রধানশিক্ষককে স্কুল থেকে বার করে এনে বৃষ্টির মধ্যে গেটের সামনে চেয়ারে বসিয়ে রাখার অভিযোগ উঠল। (তবে, এনডিটিভি নিউজ এই ভিডিওর সত্যতা৷ যাচাই করেনি) শুধু তা-ই নয়, প্রকাশ্যেই তাঁর মাথা ও শরীরে কাঁচা ডিম ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। পরে তাঁর মাথায় গোবর ঢেলে দেওয়া হয় বলেও জানা গিয়েছে। সোমবার দুপুরে বাঁকুড়ার বাঁকি সিন্দ্রা হাই স্কুলের এই ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
অভিযোগ, স্কুলের মিড-ডে মিলের টাকা থেকে শুরু করে উন্নয়ন তহবিলের অর্থ নয়ছয় করেছেন প্রধানশিক্ষক সাধনচন্দ্র পাল। স্কুলের কাজে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি বড় অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়দের একাংশ। যদিও এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন প্রধানশিক্ষক। তাঁর দাবি, আগেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল এবং তদন্তে তা প্রমাণিত হয়নি। নতুন করে তদন্তের রিপোর্ট হাতে আসার আগেই তাঁকে হেনস্থা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত সোমবার স্কুলে প্রধানশিক্ষকের উপস্থিতিকে ঘিরে। জানা গিয়েছে, সাধনচন্দ্র পাল স্কুলে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে জড়ো হতে শুরু করেন একদল প্রাক্তন পড়ুয়া, অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দা। স্কুলের অর্থনৈতিক অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রধানশিক্ষককে স্কুলের ভিতর থেকে বাইরে বের করে আনা হয় বলে অভিযোগ।
এর পর স্কুলের গেটের সামনে একটি চেয়ার পেতে তাঁকে বসিয়ে রাখা হয়। সেই সময় বৃষ্টিও পড়ছিল। অভিযোগ, বৃষ্টির মধ্যেই প্রকাশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন বিক্ষোভকারীরা। এক পর্যায়ে কয়েক জন তাঁর দিকে কাঁচা ডিম ছুড়তে শুরু করেন। ডিম ভেঙে তাঁর মাথা ও শরীরে পড়ে। পরে মাথায় গোবর ঢেলে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়।
বাঁকি সিন্দ্রা হাই স্কুল বাঁকুড়ার পুরোনো এবং ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে অন্যতম। সেই স্কুলেই প্রধানশিক্ষককে এ ভাবে প্রকাশ্যে হেনস্থার অভিযোগ ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। স্কুলের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে যদি সত্যিই কোনও অভিযোগ থাকে, তা হলে আইন মেনে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানো এবং তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করার পরিবর্তে কেন এ ভাবে প্রকাশ্যে ‘শাস্তি’ দেওয়ার চেষ্টা হল, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রধানশিক্ষকের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক বার বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ অনুযায়ী, সেই বিক্ষোভ বা দাবির পরেও সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধান হয়নি। সেই ক্ষোভ থেকেই সোমবার তাঁরা ফের একত্রিত হন বলে দাবি স্থানীয়দের একাংশের।
স্কুলের এক প্রাক্তনী দীপক সিংহ প্রধানশিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, মিড-ডে মিল এবং স্কুলের উন্নয়ন খাত মিলিয়ে প্রায় ২৭ লক্ষ টাকা নয়ছয় করা হয়েছে। তাঁর আরও দাবি, বিষয়টি নিয়ে আগে আলোচনা হওয়ার সময় প্রধানশিক্ষক স্কুলের নিজস্ব তহবিলে তিন লক্ষ টাকা জমা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই টাকা জমা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর। সেই কারণেই প্রাক্তন পড়ুয়া, অভিভাবক এবং স্থানীয়দের একাংশ ক্ষুব্ধ হয়ে এমন প্রতিবাদ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তবে বিক্ষোভকারীদের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন প্রধানশিক্ষক সাধনচন্দ্র পাল। তাঁর বক্তব্য, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই। সাধনের দাবি, এর আগে একবার একই ধরনের অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত হয়েছিল এবং সেই তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। পরে দ্বিতীয় বারও তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু সেই তদন্তের রিপোর্ট তাঁর হাতে আসার আগেই তাঁকে স্কুলে ঢুকে এ ভাবে হেনস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।
প্রধানশিক্ষকের আরও দাবি, কয়েক জন শিক্ষক এবং স্থানীয় মানুষের মদতে তাঁর কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যেই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। যদিও তাঁর এই অভিযোগও স্বতন্ত্র ভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার খবর পেয়ে বাঁকুড়া সদর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পুলিশের উপস্থিতিতেই বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে বিতণ্ডা শুরু হয় বলে জানা গিয়েছে। তবে পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনার বিষয়ে এখনও কোনও পক্ষ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনি।
এই ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন উঠছে স্কুলের অর্থ সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে। সত্যিই কি মিড-ডে মিল কিংবা উন্নয়ন তহবিলের টাকা তছরুপ হয়েছে, নাকি অভিযোগগুলি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন—তা তদন্তের পরেই স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণের আগেই কোনও শিক্ষক বা প্রধানশিক্ষককে প্রকাশ্যে অপমান বা শারীরিক ভাবে হেনস্থা করার ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক স্বচ্ছতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ আইন এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মেনে অভিযোগের তদন্ত হওয়া। বাঁকি সেন্দড়া হাই স্কুলের ঘটনায় একদিকে যেমন প্রধানশিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকাশ্যে তাঁকে হেনস্থার অভিযোগও আলাদা করে গুরুত্ব পাচ্ছে। আপাতত পুলিশের কাছে কোনও লিখিত অভিযোগ না থাকায় ঘটনার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই নজর রয়েছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments