Homeউত্তর ২৪ পরগনাবাদুড়িয়াশিক্ষিত বেকার থেকে সরাসরি তালিবানি জঙ্গি! বেঙ্গালুরুতে ধৃত বাদুড়িয়ার যুবকের নিশানায় ছিল বাংলার তরুণরা

শিক্ষিত বেকার থেকে সরাসরি তালিবানি জঙ্গি! বেঙ্গালুরুতে ধৃত বাদুড়িয়ার যুবকের নিশানায় ছিল বাংলার তরুণরা

নিউজ ডেস্ক: কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়া এক যুবকের হাত ধরেই কি বাংলায় নিঃশব্দে ছড়াচ্ছিল আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের বিষাক্ত
terrorist

নিউজ ডেস্ক: কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়া এক যুবকের হাত ধরেই কি বাংলায় নিঃশব্দে ছড়াচ্ছিল আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের বিষাক্ত জাল? বেঙ্গালুরুতে এক সন্দেহভাজন জঙ্গির গ্রেপ্তারি ঘিরে এবার এমনই এক চাঞ্চল্যকর এবং ভয়াবহ তথ্য উঠে এল তদন্তকারী আধিকারিকদের হাতে। ধৃত ওই যুবকের নাম আশরাফুল মল্লিক। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, তার বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া বাদুড়িয়া এলাকায়। কাজের সন্ধানে সুদূর বেঙ্গালুরুতে গিয়ে সে জড়িয়ে পড়েছিল দেশবিরোধী মারাত্মক সব নাশকতামূলক কার্যকলাপে। এ রাজ্যের উঠতি এবং বেকার তরুণ প্রজন্মকে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সুকৌশলে মগজ ধোলাই করে সে জঙ্গি সংগঠনে নিয়োগ করছিল কি না, এখন মূলত সেই বিষয়টিই অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছেন বেঙ্গালুরু পুলিশ এবং জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ (NIA)-এর দুঁদে আধিকারিকরা। ধৃতের শিকড় খুঁজতে এবং বাংলায় তার নেটওয়ার্কের বিস্তারিত খোঁজখবর নিতে ইতিমধ্যেই রাজ্যের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছে বেঙ্গালুরু পুলিশের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল।

Table of Contents

    পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, দিন কয়েক আগেই গোপন সূত্রে খবর পেয়ে বেঙ্গালুরু থেকে এই আশরাফুল মল্লিককে পাকড়াও করে পুলিশ। তাকে জেরা করে এবং তার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল প্রমাণাদি ঘেঁটে তদন্তকারীরা জানতে পারেন যে, অভিযুক্ত যুবক ইন্টারনেটের অন্ধকার জগত এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার করে সরাসরি যোগাযোগ রাখছিল পাকিস্তানের অন্যতম কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠন ‘তেহেরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান’ (TTP)-এর সঙ্গে। জানা গিয়েছে, আফগানিস্তানে গা ঢাকা দিয়ে থাকা ওই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের অন্যতম এক চাঁই বা সদস্য ইমরানের সঙ্গে তার রীতিমতো নিয়মিত কথাবার্তা হত। সেই সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল ধৃতের অতীত জীবন। তদন্তকারীরা জেনেছেন, আশরাফুল কোনও অশিক্ষিত যুবক নয়। সে এ রাজ্যেরই গোবরডাঙা হিন্দু কলেজ থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক স্তরের পড়াশোনা শেষ করেছিল। আর পাঁচটা সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের শিক্ষিত বেকারের মতোই সেও সরকারি চাকরির জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতি শুরু করেছিল। কিন্তু দিনের পর দিন চাকরির পরীক্ষায় বসেও ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই জোটেনি তার কপালে। লাগাতার এই ব্যর্থতা এবং বেকারত্বের তীব্র জ্বালা তাকে মানসিকভাবে চূড়ান্ত হতাশ করে তোলে। এরপরই ভাগ্য বদলানোর আশায় এবং পেটের দায়ে সে পাড়ি দেয় দক্ষিণ ভারতের আইটি শহর বেঙ্গালুরুতে। সেখানে গিয়ে একটি নামী বহুজাতিক সংস্থায় সামান্য নিরাপত্তারক্ষীর কাজে যোগ দেয় সে। আর এই হতাশার অন্ধকার দিকটিকেই কাজে লাগিয়ে তাকে নিজেদের জালে টানে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর মাথা।

    আশরাফুলের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা মোবাইল ফোন এবং ল্যাপটপ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে তদন্তকারীরা রীতিমতো শিউরে উঠেছেন। তাঁরা জেনেছেন, আফগানিস্তানে বসে থাকা তেহরিক-ই-তালিবানের মাস্টারমাইন্ড ইমরানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তার। সেই হ্যান্ডলারের প্রত্যক্ষ নির্দেশেই ভারতে বড়সড় নাশকতার নীল নকশা বা ছক কষছিল এই যুবক। তবে গোয়েন্দাদের সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে আশরাফুলের বাংলা-কানেকশন। তদন্তকারীদের ম্যারাথন জেরার মুখে পড়ে ধৃত যুবক স্বীকার করেছে যে, পশ্চিমবঙ্গে এখনও তার প্রচুর বন্ধুবান্ধব বা ‘দোস্ত’ রয়েছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই শিক্ষিত কিন্তু বেকার। আর এই বেকারত্বের চরম হতাশাগ্রস্ত যুবকদেরই নিজের মডিউলের সফট টার্গেট বানিয়েছিল আশরাফুল। সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন গোপন গ্রুপ এবং মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে অত্যন্ত সন্তর্পণে তাদের মগজ ধোলাই করার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল সে। ধর্মের নামে ভুল বুঝিয়ে এবং আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে ওই যুবকদের নিয়ে বাংলায় একটি শক্তিশালী ‘স্লিপার সেল’ বা গোপন মডিউল তৈরির গভীর পরিকল্পনা ছিল তার।

    শুধু নতুন সদস্য নিয়োগই নয়, ইতিমধ্যে মগজ ধোলাই হওয়া বর্তমান সদস্যদের দিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে লজিস্টিক সাপোর্ট বা রসদ জোগাড়ের কাজও করানো হচ্ছিল বলে তদন্তকারীদের অনুমান। এখানেই শেষ নয়, আশরাফুলের ছক ছিল আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী। গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, তেহেরিক-ই-তালিবান জঙ্গি গোষ্ঠীর যে সমস্ত সদস্য বর্তমানে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে আত্মগোপন করে রয়েছে, তাদের এ দেশে ঢোকানোর জন্য এ রাজ্য থেকে জাল আধার কার্ড, ভোটার কার্ড সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় নাগরিকত্বের পরিচয়পত্র বা ভুয়ো নথি তৈরির চেষ্টাও চালাচ্ছিল সে। পাশাপাশি, তার নিজের এলাকা বাদুড়িয়ার বেশ কিছু স্কুল ও কলেজের পড়ুয়াও ছিল তার মগজ ধোলাইয়ের অন্যতম টার্গেট। তাদের বিপথগামী করে জঙ্গি কার্যকলাপে যুক্ত করার নীল নকশা তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

    সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি হল আর্থিক লেনদেনের। তদন্তকারীরা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের লেনদেন খতিয়ে দেখে জানতে পেরেছেন যে, আশরাফুলের কাছে বাংলা থেকেও মোটা অঙ্কের ফান্ড বা টাকা পৌঁছত। এই টাকা কারা, কেন এবং কোথা থেকে পাঠাত, সেই হাওয়ালার রুট খুঁজে বের করাটাই এখন গোয়েন্দাদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বিপুল পরিমাণ টাকা কি বাংলায় নতুন সদস্য নিয়োগের জন্য ব্যবহার করা হত, নাকি নাশকতার রসদ কিনতে, তা জানতে মরিয়া তদন্তকারীরা। ধৃত আশরাফুলের এই বিপুল দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড, তার সাঙ্গোপাঙ্গোদের আসল পরিচয় এবং বাংলায় ছড়িয়ে থাকা তার গোপন স্লিপার সেল সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে এবার সরাসরি বাংলাতেই আসছে বেঙ্গালুরু পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের একটি বিশেষ দল। তারা রাজ্য পুলিশের এসটিএফ (STF) বা স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের সঙ্গে সমন্বয় রেখে বাদুড়িয়া সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বড়সড় তল্লাশি অভিযান চালাতে পারে বলে প্রশাসনিক ও পুলিশ সূত্রে খবর। সব মিলিয়ে, এক শিক্ষিত যুবকের জঙ্গি হয়ে ওঠার এই কাহিনীতে এখন রীতিমতো আতঙ্কিত রাজ্যের সচেতন মহল।

    No Comments

    তাজা খবর

    আরও পড়ুন

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved