Last updated: September 6th, 2026 at 09:05 am

নিজস্ব প্রতিনিধি : বিদেশে উচ্চশিক্ষা, জীবিকার টান, জরুরি চিকিৎসা কিংবা নিছক ভ্রমণের তাগিদে পাসপোর্ট বানান সাধারণ মানুষ। কিন্তু সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সেই পাসপোর্ট যাচাইকরণের নামেই এবার রাজ্যের অলিতে-গলিতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এক ভয়ংকর ‘কাটমানি সিন্ডিকেট’। পাসপোর্ট সেবা কেন্দ্রে গিয়ে সরকার নির্ধারিত ফি মেটানো, আঙুলের ছাপ দেওয়া কিংবা প্রাথমিক নথির সত্যতা যাচাইয়ের কাজ নির্বিঘ্নে উতরে গেলেও আসল নরকযন্ত্রণা শুরু হচ্ছে থানা আর জেলা গোয়েন্দা শাখার (DIB) চৌকাঠে পা রাখার পর। টেবিলের ওপর আইনের কড়াকড়ি, আর টেবিলের তলা দিয়ে ‘প্রণামী’ নেওয়ার এই অঘোষিত বাণিজ্য নিয়ে সম্প্রতি বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন একের পর এক ভুক্তভোগী সাধারণ নাগরিক। ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি ফেটে সামনে এসেছে কীভাবে সাধারণ মানুষকে চূড়ান্ত হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে।
আইন অনুযায়ী পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের রূপরেখা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রকের নির্দেশিকা স্পষ্ট জানাচ্ছে, আবেদনকারী ভারতীয় নাগরিক কি না, তাঁর বর্তমান স্থায়ী ঠিকানা সঠিক রয়েছে কি না এবং কোনও আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের মামলা চলছে কি না—মূলত এই তিনটি মৌলিক বিষয়ের খোঁজ নেওয়াই পুলিশি অনুসন্ধানের আসল এক্তিয়ার। কিন্তু গ্রাউন্ড রিয়্যালিটিতে আইনের এই স্পষ্ট নির্দেশিকাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তৈরি করা হচ্ছে মনগড়া নিয়মের বেড়াজাল। সাধারণ আবেদনকারীদের কাছে চাওয়া হচ্ছে চার দশক আগে মৃত বাবা-মায়ের মাধ্যমিকের আসল অ্যাডমিট কার্ড, সত্তরের দশকের স্কুলের লিভিং সার্টিফিকেট কিংবা ১৯৭১ সালের আগের পুরনো জমির দলিল। এমনকি পরিবারে কয়েক পুরুষ আগে কে কোথা থেকে এসেছিলেন, তার অবান্তর প্রমাণ দাখিল করতে বাধ্য করা হচ্ছে। কোনও সাধারণ নাগরিক সেই সব অপ্রাসঙ্গিক নথি জোগাড় করতে না পারলেই শুরু হয়ে যাচ্ছে মানসিক উৎপীড়ন এবং প্রকাশ্য ব্ল্যাকমেইলিং।
ভুক্তভোগীদের বিস্ফোরক অভিযোগ, এই পুরো জটিলতা তৈরির পেছনে আসল উদ্দেশ্য একটাই—পকেট কাটা। থানা ও এলাকাভেদে এই ‘পুলিশি ট্যাক্স’-এর দর ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে আড়াই হাজার, তিন হাজার এমনকি অবস্থা বুঝে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হাঁকানো হচ্ছে। সম্প্রতি পূর্ব বর্ধমানের একটি থানার ঘটনা সামনে আসতেই শিউরে উঠছেন সকলে। সেখানে কর্তব্যরত এক পুলিশ আধিকারিক সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি এড়াতে ড্রয়ার কিছুটা খুলে রেখে আবেদনকারীকে নির্দেশ দেন, বাইরে থেকে টাকা এনে যেন সটান ড্রয়ারের ভেতর ফেলে দেওয়া হয়। হাতেনাতে ঘুষ না নিয়ে ড্রয়ারে নগদ গুঁজে নেওয়ার এই চাতুরী দেখে হতবাক সমাজমাধ্যম। একইভাবে উত্তর ২৪ পরগনার লেকটাউন, বিরাটি, নিমতা থেকে শুরু করে কলকাতার কসবা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার নরেন্দ্রপুরের একাধিক থানাকে ঘিরে সাধারণ মানুষ ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। কেউ কাটমানি দিতে অস্বীকার করলেই তাঁর ওপর খাঁড়া নেমে আসছে—দিনের পর দিন নথির অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা, পুলিশি তদন্তে অসহযোগিতার তকমা দেওয়া এবং ঘরে না গিয়েই বাড়ি ‘খুঁজে পাওয়া যায়নি’ মর্মে অ্যাডভার্স পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট (Adverse PVR) আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে পাঠিয়ে দেওয়ার সরাসরি হুমকি।
পাসপোর্টের মতো একটি আন্তর্জাতিক পরিচয়পত্রের প্রাথমিক ধাপেই কেন রাজ্য পুলিশের এই মধ্যযুগীয় জুলুমবাজি সহ্য করতে হবে, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে প্রশাসনিক মহলে। ওয়াকিবহাল মহলের স্পষ্ট বক্তব্য, আধুনিক ডিজিটাল ইন্ডিয়ার জমানায় দেশের প্রত্যেকটি থানা ক্রাইম অ্যান্ড ক্রিমিনাল ট্র্যাকিং নেটওয়ার্ক অ্যান্ড সিস্টেমস (CCTNS)-এর মাধ্যমে সরাসরি ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB)-র কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত। কেন্দ্রীয় পাসপোর্ট দফতর যদি কোনও আবেদনকারীর নাম-ঠিকানা ডিজিটালি সেই কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে সার্চ করে নেয়, তবে সেকেন্ডের মধ্যে জানা সম্ভব তাঁর কোনও অপরাধের রেকর্ড রয়েছে কি না। এই ডিজিটাল ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ হলে স্থানীয় থানার টেবিলে টেবিলে ফাইল ফেলে রেখে সাধারণ মানুষকে ব্ল্যাকমেল করার এই নোংরা সংস্কৃতি রাতারাতি মুছে যেতে পারে।
তবে গাঢ় অন্ধকারের মধ্যেও কিছু ব্যতিক্রমী পুলিশ আধিকারিকের উজ্জ্বল ভূমিকা নজর কেড়েছে। সার্ভে পার্ক বা বেলঘড়িয়ার মতো জায়গায় কোনও বাড়তি পয়সা না চেয়ে, ভদ্র ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই কাজ সম্পন্ন করার প্রশংসাও করেছেন বহু নাগরিক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে সাধারণ মানুষকেই রুখে দাঁড়াতে হবে। কোনও পুলিশকর্মী অহেতুক পুরোনো নথি চেয়ে ভয় দেখালে কিংবা টাকা দাবি করলে মুখ বুজে পয়সা না দিয়ে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার, রাজ্য ভিজিল্যান্স কমিশন ও দুর্নীতি দমন শাখার (ACB) দ্বারস্থ হতে হবে। কেন্দ্রীয় পাসপোর্ট সেবা পোর্টালে সরাসরি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের মুখোশ টেনে খোলার সময় এসেছে। পাসপোর্ট কোনও সরকারি দান নয়, নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার—এই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই ‘কাটমানি রাজ’ সমূলে উপড়ে ফেলা ছাড়া গতি নেই।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments