
নিউজ ডেস্ক; মাত্র চার মাসে বীরভূমে ৪ হাজারেরও বেশি নাবালিকা গর্ভবতী হওয়ার তথ্য সামনে আসতেই উদ্বেগ ছড়িয়েছে জেলা জুড়ে। স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই—এই চার মাসে জেলায় মোট ৪১৮১ জন নাবালিকা গর্ভবতী হয়েছেন। সরকারি ভাবে নিবন্ধিত মোট গর্ভবতীর প্রায় ১৮ শতাংশই নাবালিকা বলে জানানো হয়েছে। একই সময়ে বাল্যবিবাহ রোধে জেলা শিশু সুরক্ষা দপ্তরের তরফে ১১৪টি অভিযান চালানো হলেও বিয়ে আটকানো সম্ভব হয়েছে ১১৩টি ক্ষেত্রে।
পরিসংখ্যানের আর একটি দিকও নজর কাড়ছে। যে সব এলাকায় নাবালিকা গর্ভধারণের হার তুলনামূলক ভাবে বেশি, সেখান থেকেই বাল্যবিবাহের খবর প্রশাসনের কাছে খুব কম পৌঁছচ্ছে বলে দাবি জেলা প্রশাসনের একাংশের। ফলে বাল্যবিবাহ রোধে তৈরি শিশু সুরক্ষা কমিটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বীরভূমের মহম্মদবাজার ব্লকের পরিসংখ্যান এই উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করেছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত ওই ব্লকে মাত্র একটি নাবালিকা বিয়ে আটকানো গিয়েছে। অথচ একই সময়ে মহম্মদবাজারে ২৭৫ জন নাবালিকা গর্ভবতী হয়েছেন বলে স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ওই সংখ্যা সংশ্লিষ্ট ব্লকের মোট গর্ভবতীর প্রায় ২৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহম্মদবাজার ব্লকের মধ্যেই রয়েছে ডেউচা-পাঁচামি এলাকা। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকার নাবালিকা গর্ভধারণের সংখ্যাও প্রশাসনের নজরে রয়েছে। পাঁচামিকে ঘিরে ভবিষ্যতে কয়লাখনি সংক্রান্ত পরিকল্পনা নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে আলোচনা চলার মধ্যেই সামাজিক পরিকাঠামোর এই সমস্যাও নতুন করে সামনে এসেছে।
স্বাস্থ্য প্রশাসনের কাঠামো অনুযায়ী বীরভূমে রয়েছে বীরভূম ও রামপুরহাট—দুই স্বাস্থ্য জেলা। এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে বীরভূম স্বাস্থ্য জেলায় নাবালিকা গর্ভধারণের সংখ্যা ১৯৩০ বলে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে মহম্মদবাজারে সংখ্যাটি উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি। অন্য দিকে, রামপুরহাট স্বাস্থ্য জেলার নলহাটি-১, নলহাটি-২, মুরারই-১ এবং মুরারই-২ ব্লকেও মোট গর্ভবতীর প্রায় ২০ থেকে ২২ শতাংশ নাবালিকা বলে তথ্য উঠে এসেছে।
এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে—নাবালিকা গর্ভধারণের এত বেশি ঘটনা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নজরে এলেও বাল্যবিবাহের খবর প্রশাসনের কাছে কেন পৌঁছচ্ছে না?
জেলা স্তর থেকে গ্রাম সংসদ পর্যন্ত বাল্যবিবাহ এবং নাবালিকা সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন কমিটি রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিনিধি, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, আশাকর্মী এবং অন্যান্য স্থানীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে এই কমিটিগুলি কাজ করার কথা।
প্রশাসনের একাংশের বক্তব্য, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার কথা গ্রাম সংসদ স্তরের কমিটির। কারণ কোনও নাবালিকার বিয়ে ঠিক হয়েছে কি না, কোথাও গোপনে বাল্যবিবাহের আয়োজন চলছে কি না—এই ধরনের খবর প্রথমে স্থানীয় স্তরেই পৌঁছনোর কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সেই তথ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছচ্ছে না বলে অভিযোগ।
বীরভূম জেলা প্রশাসনের এক কর্তার বক্তব্য, কোনও কোনও ব্লক থেকে বাল্যবিবাহের খবর প্রায় আসছেই না। অথচ সেই ব্লকগুলির মধ্যেই নাবালিকা গর্ভধারণের হার উল্লেখযোগ্য। তাঁর এই বক্তব্যই স্থানীয় স্তরে নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শুভাশিস গড়াইয়ের মতে, বাল্যবিবাহ রোধে আইন প্রয়োগ জরুরি হলেও শুধু আইন করে বা কয়েকটি সচেতনতা কর্মসূচি চালিয়ে সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। সামাজিক সমস্যাটির মূল কারণ খুঁজে বের করা এবং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যভিত্তিক সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
স্বাস্থ্য দপ্তরের এক আধিকারিকও আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এর অনিচ্ছাকৃত নেতিবাচক প্রভাবও হতে পারে।
স্বাস্থ্য আধিকারিকের আশঙ্কা, অতিরিক্ত আইনি ভয়ের পরিবেশ তৈরি হলে কিছু নাবালিকা বা তাঁদের পরিবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসা এড়িয়ে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে গোপনে বাড়িতে প্রসব বা অনিরাপদ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আর তাতে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।
বীরভূমে প্রায় ৯৯ শতাংশ প্রসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে হচ্ছে—এমন তথ্যও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বজায় রাখার পাশাপাশি নাবালিকা গর্ভধারণের কারণ শনাক্ত করা এবং তাঁদের নিরাপদ স্বাস্থ্য পরিষেবার আওতায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মত স্বাস্থ্য মহলের।
চার মাসে ৪১৮১ নাবালিকা গর্ভধারণের তথ্য তাই শুধুমাত্র একটি পরিসংখ্যান নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাল্যবিবাহ, সামাজিক সচেতনতা, কিশোরীদের স্বাস্থ্য এবং স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির মতো একাধিক বিষয়। গ্রাম স্তরের শিশু সুরক্ষা কমিটিগুলিকে আরও সক্রিয় করা, সময়মতো খবর প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো—এই সবকিছুর সমন্বয়েই সমস্যার মোকাবিলা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments