Homeজেলাছয় বছরেও মেলেনি সুরাহা, কাঠের সাঁকো পেরিয়েই চলছে মহিষঘাটার যাতায়াত

ছয় বছরেও মেলেনি সুরাহা, কাঠের সাঁকো পেরিয়েই চলছে মহিষঘাটার যাতায়াত

নিউজ ডেস্ক; পাকা ব্রিজ রয়েছে। অথচ সেই ব্রিজে ওঠার রাস্তা নেই। ফলে কংক্রিটের সেতুর সঙ্গে কাঠের সাঁকো জুড়ে কোনও রকমে চলছে যাতায়াত। সাইকেল ও মোটরবাইক পারাপার সম্ভব হলেও ভারী যানবাহন
resizeplus_eisamay_2026-09-21_c6jfpwf1_dwsz

নিউজ ডেস্ক; পাকা ব্রিজ রয়েছে। অথচ সেই ব্রিজে ওঠার রাস্তা নেই। ফলে কংক্রিটের সেতুর সঙ্গে কাঠের সাঁকো জুড়ে কোনও রকমে চলছে যাতায়াত। সাইকেল ও মোটরবাইক পারাপার সম্ভব হলেও ভারী যানবাহন কার্যত বন্ধ। এমনকি জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুল্যান্সও গ্রামে ঢুকতে পারে না বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর ধরে এই দুর্ভোগের ছবি দাসপুর-২ ব্লকের মহিষঘাটায়।

পলাশপাই খালের উপর থাকা মহিষঘাটা ব্রিজের সংযোগকারী রাস্তা ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই এই পরিস্থিতি। বর্ষায় খালের জল বাড়লে সমস্যা আরও তীব্র হয়। একাধিক বার অস্থায়ী সাঁকো তৈরি করে দুই পাড়ের যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু বারবার জলের তোড়ে কিংবা ভারী যান চলাচলের চাপে সেই সাঁকো ভেঙে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত কাঠের পাটাতন বিছিয়ে ব্রিজের সঙ্গে রাস্তার সংযোগ তৈরি করে কোনও রকমে যাতায়াত করছেন মানুষজন।

স্থানীয়দের দাবি, এই অস্থায়ী ব্যবস্থায় দৈনন্দিন যাতায়াত চালানো গেলেও তা কোনও ভাবেই নিরাপদ বা স্থায়ী সমাধান নয়। বিশেষ করে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে পরিবারগুলিকে। নতুন করে একটি স্থায়ী ব্রিজ ও সংযোগকারী রাস্তা তৈরির দাবি জানিয়ে একাধিক বার প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে আবেদন এবং আন্দোলনও হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ।

প্রবল বৃষ্টিতে ধস, বিচ্ছিন্ন ব্রিজ

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২০ সালে প্রবল বৃষ্টির জেরে পলাশপাই খালের জলস্তর অনেকটা বেড়ে যায়। সেই সময় মহিষঘাটা ব্রিজের সঙ্গে রাজ্যসড়কের সংযোগকারী পিচ রাস্তার প্রায় ৪০ ফুট অংশ ধসে পড়ে। রাস্তা ভেঙে যাওয়ার ফলে মূল কংক্রিটের ব্রিজটি কার্যত রাস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ধসের অভিঘাতে সেতুর কাঠামোরও ক্ষতি হয় বলে স্থানীয়দের দাবি।

এর পর থেকেই ব্রিজের উপর দিয়ে চারচাকা ও ভারী যান চলাচল বন্ধ। যোগাযোগ সচল রাখতে প্রশাসনের তরফে কখনও বাঁশের সাঁকো, কখনও অস্থায়ী কাঠের সেতু তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনও ব্যবস্থাই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

এক পর্যায়ে লক্ষাধিক টাকা খরচ করে ব্রিজের পাশে কাঠের সাঁকো তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সাঁকোর উপর দিয়ে একটি পণ্যবাহী গাড়ি যাওয়ার সময় মাঝের অংশ ভেঙে পড়ে। ২০২৪ সালে ঘটে ওই ঘটনা। তারপর থেকেই কাঠের পাটাতন বিছিয়ে কোনও রকমে ব্রিজের সঙ্গে রাস্তার যোগাযোগ তৈরি করে রাখা হয়েছে।

দুই পঞ্চায়েতের মানুষের ভরসা এই ব্রিজ

মহিষঘাটা ব্রিজটি দাসপুর-২ ব্লকের মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। পলাশপাই খালের একদিকে খেপুত গ্রাম পঞ্চায়েত, অন্যদিকে দুধকোমরা গ্রাম পঞ্চায়েত। দুই পঞ্চায়েত এলাকার বহু মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম উত্তরবাড়-শিবরা সড়কের উপর থাকা এই ব্রিজ।

শুধু স্থানীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রেই নয়, দাসপুর থেকে কোলাঘাট যাওয়ার ক্ষেত্রেও এই রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুর এবং পশ্চিম মেদিনীপুর—দুই জেলার বহু মানুষ এই পথকে বিকল্প যোগাযোগপথ হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে মহিষঘাটা ব্রিজে যান চলাচল বন্ধ থাকায় শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, বৃহত্তর এলাকার মানুষও সমস্যায় পড়ছেন।

বিশেষ করে কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ আরও বেশি। দাসপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় শাকসবজি, আনাজ ও ফুল চাষ হয়। চাষিরা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে কোলাঘাটের দিকে যাতায়াত করেন। কিন্তু ভারী যানবাহন ব্রিজ পার হতে না পারায় পণ্য পরিবহণে অতিরিক্ত সময় ও খরচ দুই-ই বাড়ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

অ্যাম্বুল্যান্স ঢুকতে না পারায় উদ্বেগ

স্থানীয় বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ জরুরি পরিষেবা নিয়ে। তাঁদের বক্তব্য, কাঠের সাঁকো দিয়ে কোনও রকমে সাইকেল বা মোটরবাইক যাতায়াত করতে পারলেও অ্যাম্বুল্যান্সের মতো ভারী যান সেখানে ঢুকতে পারে না। ফলে কোনও বাসিন্দা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

স্থানীয়দের কথায়, দিনের পর দিন এই পরিস্থিতি মেনে নিয়ে চলা কার্যত অসম্ভব। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। খালের জল বাড়লে অস্থায়ী কাঠের সংযোগপথের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয় আশঙ্কা।

বারবার আন্দোলন, তবু স্থায়ী সমাধান অধরা

নতুন ব্রিজ তৈরির দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা একাধিক বার প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনও হয়েছে। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ। তাঁদের বক্তব্য, অস্থায়ী সাঁকো তৈরি করে সমস্যা মেটানোর চেষ্টা যত বারই করা হোক, বর্ষার জল এবং যানবাহনের চাপ সামলাতে তা পারছে না।

স্থানীয় বাসিন্দা রতন সামন্ত বলেন, ‘‘আমরা প্রশাসনের সমস্ত দফতরে জানিয়েছি। নতুন ব্রিজ না হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হবে না। গ্রামে অ্যাম্বুল্যান্স পর্যন্ত ঢোকে না। আগের সরকারের আমলে হয়নি, এই সরকার ব্রিজ তৈরির জন্য উদ্যোগ নিক।’’

স্থানীয়দের দাবি, মহিষঘাটা ব্রিজের স্থায়ী সমাধানের জন্য নতুন করে সমীক্ষা করে দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করা হোক। শুধু অস্থায়ী সাঁকো তৈরি করে নয়, শক্তপোক্ত সংযোগকারী রাস্তা-সহ স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরি করলেই দীর্ঘদিনের সমস্যা মিটবে বলে তাঁদের মত।

ছয় বছর ধরে ভাঙা রাস্তা আর অস্থায়ী সাঁকোর উপর নির্ভর করে চলছে হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত। প্রতিদিনের এই দুর্ভোগের অবসান কবে হবে, এখন সেই প্রশ্নই ঘুরছে মহিষঘাটা ও সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে।

No Comments

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved