
নিউজ ডেস্ক: টানা বৃষ্টি এবং পাহাড়ি এলাকায় একের পর এক ধসের জেরে ভয়াবহ পরিস্থিতি উত্তরাখণ্ডে। হড়পা বান, ধস এবং নদীর জলস্তর বৃদ্ধিতে রাজ্যের বিস্তীর্ণ অংশে কার্যত বিপর্যস্ত জনজীবন। ইতিমধ্যেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাত জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। পরিস্থিতি সামলাতে একাধিক এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বন্ধ হয়ে গিয়েছে ১৭২টি রাস্তা। এর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ হাইওয়ের অংশও। আগামী দিনে বৃষ্টি আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের তথ্য অনুযায়ী, প্রবল বৃষ্টি ও ধসের কারণে উত্তরাখণ্ডের ১৭২টি রাস্তা বর্তমানে বন্ধ। পিথোরাগড়, নৈনীতাল এবং বাগেশ্বরের বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। ধসের কারণে দুটি হাইওয়েও বন্ধ রয়েছে। পাহাড়ি রাস্তায় মাটি ও পাথর নেমে আসায় যান চলাচল কার্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একাধিক জায়গায় রাস্তা পরিষ্কারের কাজ চালানো হলেও লাগাতার বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
আবহাওয়া দফতরও আগামী সময় নিয়ে সতর্ক করেছে। অলমোড়া, বাগেশ্বর, টিহরী, নৈনীতাল, উধম সিংহ নগর এবং পৌড়ী জেলায় অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। ফলে ইতিমধ্যেই দুর্যোগে বিপর্যস্ত এলাকাগুলিতে নতুন করে ধস ও হড়পা বানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে টানা বৃষ্টির ফলে মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন ঢালে ধসের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে নদী ও পাহাড়ি নালাগুলিতে জলস্তর দ্রুত বাড়ায় বিপদ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে গোলা নদীকে ঘিরে। লাগাতার বৃষ্টির জেরে নদী থেকে প্রায় ২৭ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে। এর ফলে হলদোয়ানী, উধম সিংহ নগর, পুলভট্টা, শান্তিপুরী এবং সূর্যনগরের মতো এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন। ইতিমধ্যেই ওই এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করতে মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে যাতে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া যায়, সেই প্রস্তুতিও রাখা হচ্ছে।
খটীমার বনগাঁও এলাকাতেও জলস্তর বৃদ্ধির প্রভাব দেখা দিয়েছে। খকরা নদীর জল বেড়ে যাওয়ায় নিচু এলাকার কয়েকটি অংশে জল ঢুকতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি বুঝে স্থানীয় বাসিন্দাদের উঁচু জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু করেছে প্রশাসন। নদীর জলস্তর আরও বাড়লে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ইতিমধ্যেই প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। পৌড়ীর কোটদ্বারে নদীর জলের প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে এক মা এবং তাঁর দেড় বছরের শিশুকন্যার। অন্য দিকে, অলমোড়ার হবালবাগে বাড়ি ভেঙে পড়ে দুই মহিলা এবং এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ধারের টুনি এলাকাতেও ধসের নীচে চাপা পড়ে দুই নেপালি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই সাতের ঘরে পৌঁছেছে।
প্রশাসনের তরফে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণে নৈনীতাল, চম্পাবত, উধম সিংহ নগর এবং পিথোরাগড়ে বুধবার পর্যন্ত স্কুল এবং অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় বাসিন্দাদেরও অপ্রয়োজনে বাড়ির বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েছেন সাধারণ মানুষ এবং পণ্যবাহী যানবাহনের চালকেরাও। বাগেশ্বরের ১০৯ নম্বর জাতীয় সড়কের একটি অংশ ধসের কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে ওই পথে যাতায়াত ব্যাহত হয়েছে। নৈনীতালে শিপ্রা এবং কোশী নদীর জল বিপদসীমা ছুঁয়ে ফেলেছে। নদীর জলস্তর আরও বাড়লে আশপাশের এলাকায় জল ঢোকার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। অন্য দিকে, টিহরীতে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক বন্ধ থাকায় যানবাহন চলাচলেও ব্যাপক সমস্যা দেখা দিয়েছে।
উত্তরাখণ্ডের পাশাপাশি প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতেও পরিস্থিতির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশে নদী ও জলাধারগুলির জলস্তর বাড়লে নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। ফলে উত্তরাখণ্ড থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত জলের পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
অন্য দিকে, ঝাড়খণ্ডেরও ১০টি জেলায় হড়পা বানের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। টানা বৃষ্টির জেরে পাহাড়ি ও নদী সংলগ্ন এলাকায় আচমকা জলস্তর বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকায় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নিচু এলাকা এবং নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষদের পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে উত্তরাখণ্ডে এখন মূল উদ্বেগ তিনটি—বৃষ্টি, ধস এবং নদীর জলস্তর। এক দিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া রাস্তা খুলে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে, অন্য দিকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূল না হলে উদ্ধার ও ত্রাণকাজও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
প্রশাসনের সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ হল, একসঙ্গে একাধিক বিপর্যয় মোকাবিলা করা। পাহাড়ে ধসের কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি সমতলের দিকে বাড়ছে বন্যার আশঙ্কা। আগামী কয়েক ঘণ্টায় বৃষ্টির পরিমাণ এবং নদীগুলির জলস্তর পরিস্থিতির গতিপথ ঠিক করবে। আপাতত উত্তরাখণ্ডের বিস্তীর্ণ এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ। আরও বৃষ্টি হলে নতুন করে কোথাও ধস নামে কি না, কিংবা নদীর জল বিপদসীমা ছাড়িয়ে যায় কি না—সেই দিকেই নজর প্রশাসনের।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments