
নিউজ ডেস্ক; কালনার সাধক ভবাপাগলাকে নিয়ে বাংলা সিনেমা তৈরির পরিকল্পনা হয়েছিল। আর সেই ছবিতে ভবাপাগলার চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল স্বয়ং মহানায়ক উত্তমকুমারের। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেই স্বপ্ন বাস্তবের পর্দায় ধরা দেয়নি। তার আগেই প্রয়াণ হয় উত্তমকুমারের। ফলে ভবাপাগলাকে নিয়ে সেই সিনেমা আর তৈরি হয়নি। তবে কালনার ভবানী মন্দিরে আজও টিকে রয়েছে সেই সময়ের স্মৃতি। মন্দিরের দেওয়ালে উত্তমকুমারের সঙ্গে ভবাপাগলার সাক্ষাতের ছবি যেন হারিয়ে যাওয়া এক সম্ভাবনার গল্প বলে।
কালনা শহরের জাপট এলাকায় অবস্থিত ভবানী মন্দির। এই মন্দিরেই আজীবন সাধনা করেছেন কালীসাধক ভবাপাগলা। আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের পাশাপাশি কয়েক হাজার লোকগানের রচয়িতা হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল। শুধু গান রচনা নয়, সেলাই-সহ নানা কাজেও দক্ষ ছিলেন তিনি। তাঁর সৃষ্টিশীলতা ও সাধনার জন্য বাংলা সিনেমার বহু শিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী এবং সুরকারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় গড়ে উঠেছিল।
ভবাপাগলা একাধিক বার গিয়েছিলেন টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায়। সেই সময়ের বহু শিল্পীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, মলিনা দেবী-সহ অন্য শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর ফ্রেমবন্দি ছবি এখনও দেখা যায় কালনার ভবানী মন্দিরে। মন্দিরে ঢুকলেই বাঁ দিকের দেওয়ালে চোখে পড়ে উত্তমকুমারের সঙ্গে ভবাপাগলার সাক্ষাতের ছবিটি।
পরিবারের উত্তরসূরিদের কাছে সেই ছবির গুরুত্ব আলাদা। কারণ, ছবিটি শুধু দুই শিল্পীর সাক্ষাতের স্মারক নয়, বরং একটি অসম্পূর্ণ সিনেমার স্বপ্নেরও সাক্ষ্য বহন করছে। ভবাপাগলার নাতি অভিজিৎ চৌধুরী জানিয়েছেন, তাঁর দাদু নিজে শিল্পী ছিলেন বলেই অন্য শিল্পীদের যথেষ্ট সম্মান করতেন। নিজের আরাধ্য দেবীর মন্দিরে অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে শিল্পীদের ছবিও রাখতেন সম্মান জানিয়ে।
অভিজিৎবাবুর কথায়, উত্তমকুমারের সঙ্গে ভবাপাগলার সাক্ষাতের ছবিটি ১৯৭৯ সালের। ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে সেই সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেই সময় তাঁর বাবা সঞ্জয় চৌধুরীও ভবাপাগলার সঙ্গে ছিলেন। বাবার কাছেই তিনি শুনেছেন, ভবাপাগলাকে নিয়ে একটি ছবি তৈরির কথা হয়েছিল। আর সেই ছবিতে ভবাপাগলার চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল উত্তমকুমারের।
ভবাপাগলার জীবন, সাধনা এবং সঙ্গীতসৃষ্টিকে কেন্দ্র করে সিনেমা তৈরির পরিকল্পনা হয়েছিল—এই তথ্যই পরিবারের কাছে আজও এক বিশেষ স্মৃতি। তবে সেই ছবির পরিচালক কে ছিলেন, চিত্রনাট্য কত দূর এগিয়েছিল, কিংবা প্রযোজনার কাজ শুরু হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে পরিবারের তরফে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। তাই এই পরিকল্পনার সম্পূর্ণ ইতিহাস এখনও অজানা।
তবে উত্তমকুমারের মতো জনপ্রিয় অভিনেতাকে ভবাপাগলার ভূমিকায় ভাবা হয়েছিল, এই তথ্যই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ভবাপাগলার জীবন ছিল একদিকে আধ্যাত্মিক সাধনার, অন্যদিকে লোকসঙ্গীত ও সৃষ্টিশীলতার। তাঁর গান ও সাধনার কথা কালনা ছাড়িয়ে বহু মানুষের কাছে পৌঁছেছিল। সেই জীবনকাহিনি বড় পর্দায় এলে তা বাংলা সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারত।
কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই প্রয়াণ হয় উত্তমকুমারের। ফলে ছবিটি আর তৈরি হয়নি। পরিবারের উত্তরসূরিদের মুখে আজও সেই আক্ষেপের কথা শোনা যায়। তাঁদের কাছে এটি শুধু একটি অসম্পূর্ণ সিনেমার গল্প নয়, বরং ভবাপাগলার জীবন ও সাধনাকে আরও বড় পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি অপূর্ণ সুযোগ।
কালনার ভবানী মন্দিরে এখনও সংরক্ষিত রয়েছে ভবাপাগলার নানা স্মৃতি। তাঁর সাধনা, সঙ্গীতচর্চা এবং শিল্পীদের সঙ্গে সম্পর্কের নানা ছবি সেখানে দেখা যায়। মন্দিরের দেওয়ালে থাকা ছবিগুলি যেন তাঁর জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ের সাক্ষ্য বহন করে।
উত্তমকুমারের সঙ্গে ভবাপাগলার ছবিটি বিশেষ ভাবে নজর কাড়ে। কারণ, বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়কের সঙ্গে এক সাধকের সাক্ষাৎ—এই দৃশ্যের মধ্যেই যেন দুই ভিন্ন জগতের মিলন ঘটেছে। এক দিকে সিনেমার পর্দার জনপ্রিয় নায়ক, অন্য দিকে লোকসঙ্গীত ও আধ্যাত্মিক সাধনার জগতে পরিচিত এক স্রষ্টা। তাঁদের সাক্ষাতের ছবিটি সেই সাংস্কৃতিক যোগাযোগের স্মারক হয়ে রয়েছে।
পরিবারের বক্তব্য, ভবাপাগলা শিল্পীদের সম্মান করতেন। তাঁর কাছে শিল্প ছিল সাধনারই একটি রূপ। তাই মন্দিরে শিল্পীদের ছবি রাখা তাঁর কাছে স্বাভাবিক বিষয় ছিল। সেই ছবিগুলির মধ্যে উত্তমকুমারের ছবিও আজও যত্নে সংরক্ষিত রয়েছে।
ভবাপাগলার আধ্যাত্মিক সঙ্গীত এবং লোকগানের রচনাসম্ভার এখনও তাঁর উত্তরাধিকারীদের কাছে মূল্যবান। কালনার মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন সাধক নন, একজন স্রষ্টাও। তাঁর গান, সাধনা এবং শিল্পীদের সঙ্গে সম্পর্কের স্মৃতি স্থানীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাঁকে নিয়ে সিনেমা তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হলেও, সেই স্বপ্নের কথা এখনও বেঁচে রয়েছে পরিবারের স্মৃতিতে। উত্তমকুমারের সঙ্গে সাক্ষাতের ছবি, মন্দিরের দেওয়ালে সংরক্ষিত অন্যান্য শিল্পীদের ছবি এবং ভবাপাগলার সৃষ্টির কথা—সব মিলিয়ে কালনার ভবানী মন্দির যেন এক জীবন্ত স্মৃতিভাণ্ডার।
আজও সেখানে গেলে মনে হয়, সময়ের স্রোত অনেক কিছু বদলে দিলেও কিছু ছবি থেকে যায়। ভবাপাগলা ও উত্তমকুমারের সেই সাক্ষাতের ছবিও তেমনই। একটি অসম্পূর্ণ সিনেমার স্বপ্ন, এক সাধকের সৃষ্টিশীল জীবন এবং বাংলা সংস্কৃতির দুই জগতের মিলন—সবকিছুরই নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছে কালনার সেই মন্দির।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments