
নিউজ ডেস্ক: টানা অতিবৃষ্টির জেরে মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা সংলগ্ন রেলপথে ধস নামায় ব্যাহত হল উত্তরবঙ্গমুখী রেল যোগাযোগ। বৃহস্পতিবার সকালে তিলডাঙা ও নিউ ফরাক্কা স্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় ডাউন লাইনের ধারে মাটি সরে যাওয়ার পাশাপাশি রেললাইনের একটি অংশ বসে যাওয়ায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে উত্তরবঙ্গের দিকে যাওয়া একাধিক দূরপাল্লার ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে ও রেলপথে আটকে পড়ে। পরিস্থিতির জেরে দুর্ভোগে পড়েছেন বহু যাত্রী।
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে সংশ্লিষ্ট রেলপথ পরিদর্শনের সময় লাইনের পাশে মাটি সরে যাওয়ার ঘটনা নজরে আসে। অতিবৃষ্টির ফলে রেললাইনের নীচের মাটি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলেই প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে। এর জেরে ডাউন লাইনের একাংশে বসে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এমন অবস্থায় কোনও ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নেয় রেল কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার পরই ওই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে উত্তরবঙ্গগামী একাধিক ট্রেনের গতি থমকে যায়। বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ে দূরপাল্লার একাধিক ট্রেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দার্জিলিং মেল, কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনও এই পরিস্থিতির প্রভাবের মুখে পড়েছে। নিউ জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ির দিকে যাত্রা করা অন্যান্য ট্রেনের সময়সূচিতেও বিঘ্ন ঘটেছে। পাশাপাশি স্থানীয় যাত্রীবাহী ট্রেন পরিষেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
প্রতিবেদন তৈরির সময় ফরাক্কার বল্লারপুর এলাকায় দাঁড়িয়ে ছিল দার্জিলিং মেল। তার পিছনেও একাধিক ট্রেন আটকে থাকার খবর পাওয়া যায়। ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস এবং কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনও রেলপথে অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়। ফলে দীর্ঘক্ষণ ট্রেনে বসে থাকতে হচ্ছে যাত্রীদের। কোথায় কতক্ষণ ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকবে, কখন পরিষেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে— সেই অনিশ্চয়তাও বাড়িয়েছে যাত্রীদের উদ্বেগ।
ঘটনার খবর পাওয়ার পরই রেলের ইঞ্জিনিয়ার ও কারিগরি কর্মীদের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা শুরু করে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশের মাটি ও রেললাইনের অবস্থা পরীক্ষা করে মেরামতির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। রেললাইনকে ফের নিরাপদ অবস্থায় ফিরিয়ে এনে দ্রুত ট্রেন পরিষেবা স্বাভাবিক করাই এখন রেল কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য।
তবে দ্রুত পরিষেবা চালুর তাড়াহুড়োয় যাত্রী নিরাপত্তার সঙ্গে কোনও আপস করা হবে না বলেই রেল সূত্রে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। মেরামতির কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে রেলপথটি ট্রেন চলাচলের উপযোগী কি না, তা নিশ্চিত করা হবে। সন্তোষজনক ভাবে নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরেই ওই লাইনে ফের ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ফরাক্কা সংলগ্ন এই রেলপথ উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গ ও দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই পথে পরিষেবা ব্যাহত হলে তার প্রভাব একসঙ্গে বহু ট্রেনের উপর পড়ে। বিশেষত দীর্ঘ দূরত্বের ট্রেনগুলির ক্ষেত্রে একটি জায়গায় চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে পিছনে থাকা অন্যান্য ট্রেনকেও বিভিন্ন স্টেশনে বা রেলপথে দাঁড় করিয়ে দিতে হয়। বৃহস্পতিবারের ঘটনাতেও সেই পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে।
শুধু রেল পরিষেবা নয়, সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টিতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় স্বাভাবিক জীবনও প্রভাবিত হয়েছে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নিম্নচাপের প্রভাবে গত কয়েক দিন ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বৃষ্টি চলছে। মুর্শিদাবাদ-সহ কয়েকটি জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও জানানো হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার বীরভূম এবং মুর্শিদাবাদে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস। টানা বৃষ্টির ফলে নদী ও জলাশয়ের জলস্তর বৃদ্ধি, জল জমা এবং মাটি আলগা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। রেললাইনের পাশের মাটি অতিরিক্ত জল শোষণ করে দুর্বল হয়ে পড়লে এ ধরনের ধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, শুক্রবার থেকে দক্ষিণবঙ্গের কিছু এলাকায় দুর্যোগের তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে। যদিও সম্পূর্ণ ভাবে বৃষ্টির হাত থেকে এখনই রেহাই মিলছে না। বিক্ষিপ্ত ভাবে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হয়ে বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টিপাত চলতে পারে। আগামী কয়েক দিনের আবহাওয়ার পরিবর্তনের উপর পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।
আবার সপ্তাহের শুরুতে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে ঝড়বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে বলেও পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে প্রশাসন এবং বিভিন্ন পরিষেবা সংস্থার সামনে সতর্ক থাকার চ্যালেঞ্জ থাকছে। রেলপথের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোতে অতিবৃষ্টির প্রভাব ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তাও এই ঘটনায় নতুন করে সামনে এল।
এ দিকে, ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথে মেরামতির কাজ চলছে। রেল কর্তৃপক্ষের তরফে যাত্রীদের ধৈর্য ধরার আবেদন জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পর্যায়ক্রমে ট্রেন চলাচল শুরু করা হবে। তবে নিরাপত্তা পরীক্ষার আগে কোনওভাবেই ট্রেন চালানো হবে না বলেই জানা গিয়েছে।
ফলে উত্তরবঙ্গমুখী যাত্রীদের এখন নজর রাখতে হচ্ছে ট্রেনের সর্বশেষ অবস্থানের দিকে। মেরামতির কাজ কত দ্রুত শেষ হয় এবং কখন সংশ্লিষ্ট রেলপথ সম্পূর্ণ নিরাপদ ঘোষণা করা হয়, তার উপর নির্ভর করছে উত্তরবঙ্গগামী রেল পরিষেবা কবে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments