
নিউজ ডেস্ক; ইনস্টাগ্রামে পরিচয়। তার পর বিদেশে পড়াশোনা এবং চাকরির প্রলোভন। সেই টোপেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল হাওড়ার জগৎবল্লভপুরের একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রী। কিন্তু কলকাতায় পৌঁছনোর পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। অভিযোগ, ওই কিশোরীকে একটি হোটেলের ঘরে আটকে রেখে তাঁর পরিবারের কাছে ফোন করে ৩ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে মেয়েকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ পরিবারের।
ঘটনার খবর পাওয়ার পর দ্রুত তদন্তে নামে হাওড়ার জগৎবল্লভপুর থানার পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার তিন দিনের মধ্যেই কলকাতার নিউ মার্কেট থানা এলাকার একটি হোটেল থেকে কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়েছে। যদিও পুলিশের অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে কোনও অভিযুক্তকে পাওয়া যায়নি। গোটা ঘটনার পিছনে আন্তঃরাজ্য সাইবার অপরাধ চক্রের যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
হাওড়া গ্রামীণের পুলিশ সুপার অমিত ভার্মা জানিয়েছেন, কিশোরীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কারা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত এবং কী ভাবে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, জগৎবল্লভপুরের ওই কিশোরীর সঙ্গে ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে কয়েক জনের যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, নিজেদের পরিচয় গোপন করে সাইবার অপরাধীরা ওই কিশোরীকে নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়েছিল। বিদেশে নিয়ে গিয়ে পড়াশোনা করানোর পাশাপাশি চাকরির ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
সেই কথায় বিশ্বাস করেই গত ৭ সেপ্টেম্বর স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বেরোয় কিশোরী। পরিবারের লোকজন প্রথমে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ করেননি। তাঁর সঙ্গে আধার কার্ড-সহ বিভিন্ন পরিচয়পত্রও ছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। কিন্তু পরে বাড়িতে আসে একটি ফোন। সেখানেই জানানো হয়, কিশোরী অপহৃত হয়েছে। তাঁকে নিরাপদে ফিরে পেতে হলে ৩ লক্ষ টাকা দিতে হবে। টাকা না দিলে মেয়েকে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
এর পরেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে পরিবার। তাঁরা দ্রুত জগৎবল্লভপুর থানায় যোগাযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ নিখোঁজ কিশোরীর সন্ধানে তদন্ত শুরু করে। প্রথম থেকেই তদন্তকারীদের কাছে বিষয়টি সাধারণ নিখোঁজের ঘটনা বলে মনে হয়নি। কারণ, এক দিকে ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ, অন্য দিকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন এবং পরে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি। ফলে সাইবার অপরাধের সম্ভাবনাও সামনে আসে।
তদন্তে নেমে পুলিশ কিশোরীর গতিবিধি সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারে। জানা যায়, বাড়ি থেকে বেরিয়ে ওই কিশোরী কয়েক জন বন্ধুর কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করেছিল। পরে বাসে চেপে ধর্মতলায় পৌঁছয় সে। সেখান থেকে নিউ মার্কেট এলাকার দিকে যায়। শেষ পর্যন্ত নিউ মার্কেট থানা এলাকার একটি হোটেলে ওঠে কিশোরী।
পুলিশের অনুমান, হোটেলের ওই ঘরটি আগে থেকেই ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। সেখানে কিশোরীকে আটকে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ। তদন্তকারীরা কিশোরী এবং তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ব্যক্তিদের ফোন নম্বর ও অন্যান্য ডিজিটাল সূত্র খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। ফোনের অবস্থান এবং যোগাযোগের সূত্র ধরে নিউ মার্কেট এলাকার ওই হোটেলের সন্ধান মেলে।
এর পর বুধবার রাতে পরিকল্পনা করে অভিযান চালায় জগৎবল্লভপুর থানার পুলিশ। কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার নির্দিষ্ট হোটেলে পৌঁছে তদন্তকারীরা তল্লাশি শুরু করেন। সেখান থেকেই উদ্ধার করা হয় ওই কিশোরীকে। তাঁকে নিরাপদে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
তবে পুলিশের অভিযানের সময় হোটেলে কোনও অপহরণকারীকে পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তকারীদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন—কিশোরীকে কারা সেখানে নিয়ে গিয়েছিল? কার নামে ঘর ভাড়া নেওয়া হয়েছিল? সোশ্যাল মিডিয়ায় কারা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল? মুক্তিপণের ফোনটি কোথা থেকে করা হয়েছিল? এবং পুরো ঘটনার পিছনে আরও কেউ যুক্ত রয়েছে কি না?
তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই ঘটনার সঙ্গে একাধিক ব্যক্তি যুক্ত থাকতে পারেন। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রলোভন দেখিয়ে তরুণী বা কিশোরীদের ফাঁদে ফেলা এবং পরে তাঁদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা কোনও সংগঠিত চক্রের কাজ কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার ধরন দেখে আন্তঃরাজ্য সাইবার অপরাধ চক্রের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ। ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রথমে বিশ্বাস তৈরি করা, তার পরে চাকরি বা বিদেশে পড়াশোনার মতো প্রলোভন দেখানো এবং শেষ পর্যন্ত ভয় দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা—এই গোটা প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিত কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম বিষয়।
পুলিশ কিশোরীর কাছ থেকেও বিস্তারিত তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করছে। কার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল, কী ধরনের কথাবার্তা হয়েছিল, কলকাতায় আসার আগে তাঁকে কে বা কারা নির্দেশ দিয়েছিল এবং হোটেলে পৌঁছনোর পর কী ঘটেছিল—সব কিছুই জানার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে হোটেলের বুকিং সংক্রান্ত তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ডিজিটাল যোগাযোগের তথ্যও তদন্তের আওতায় আনা হতে পারে।
এই ঘটনা ফের এক বার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিশোর-কিশোরীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। অচেনা ব্যক্তির দেওয়া চাকরি, বিদেশে পড়াশোনা বা অন্য কোনও বড় সুযোগের প্রস্তাব যাচাই না করে বিশ্বাস করলে কতটা বিপদ হতে পারে, এই ঘটনা তারই উদাহরণ বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
সবচেয়ে স্বস্তির বিষয়, নিখোঁজ হওয়ার মাত্র তিন দিনের মধ্যেই কিশোরীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ঘটনার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিরা এখনও অধরা। ফলে তদন্ত এখানেই শেষ হচ্ছে না। পুলিশ এখন ডিজিটাল সূত্র এবং অন্যান্য প্রমাণের সাহায্যে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত কি না, অন্য কোনও তরুণ-তরুণীকে একই ভাবে ফাঁদে ফেলা হয়েছে কি না, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কিশোরীকে উদ্ধার করা গেলেও তদন্তের আসল রহস্য এখনও কাটেনি। ইনস্টাগ্রামের আড়ালে থাকা সেই ব্যক্তিরা কারা, কেনই বা ওই কিশোরীকে টার্গেট করা হয়েছিল এবং ৩ লক্ষ টাকা মুক্তিপণের দাবির নেপথ্যে ঠিক কী উদ্দেশ্য ছিল—এই প্রশ্নগুলির উত্তরই এখন খুঁজছে জগৎবল্লভপুর থানার পুলিশ।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments