
নিউজ ডেস্ক; ইট শিল্পকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে এ বার সরকারি জমি লিজ় দেওয়ার উদ্যোগ নিল হাওড়া জেলা প্রশাসন। সরকারি আধিকারিকদের দাবি, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে এক দিকে ইটভাটা মালিকদের জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনি নিশ্চয়তা তৈরি হবে, অন্য দিকে সরকারি কোষাগারেও জমা পড়বে রাজস্ব। জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই সরকারি জমি ইটভাটার জন্য লিজ় দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যে সব ইটভাটা মালিক সরকারি জমি ব্যবহার করতে চান, তাঁদের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর সেই লিজ় নবীকরণের ব্যবস্থাও থাকবে।
হাওড়া গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি জমি দখল করে ইটভাটা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের দাবি, বেশ কিছু ইটভাটা কোনও বৈধ অনুমতি ছাড়াই সরকারি জমি ব্যবহার করছে। শুধু জমি দখল নয়, ইট তৈরির জন্য নদী থেকে মাটি তোলার অভিযোগও রয়েছে একাধিক মালিকের বিরুদ্ধে। এর ফলে এক দিকে যেমন পরিবেশ ও নদীর চরিত্রের উপর প্রভাব পড়ছে, অন্য দিকে রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতেই অব্যবহৃত সরকারি জমি নিয়ম মেনে ইটভাটার কাজে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের বক্তব্য, সরকারি জমি ব্যবহার করতে হলে আগে প্রশাসনের অনুমতি এবং নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে লিজ় নেওয়া বাধ্যতামূলক হবে। কেউ যদি লিজ় ছাড়াই সরকারি জমিতে ইটভাটা চালান, তা হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে এত দিন যে সব ইটভাটা সরকারি জমি ব্যবহার করছিল, তাদের ক্ষেত্রেও নতুন করে বৈধতার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
ভূমি সংস্কার দফতরের রিপোর্ট অনুযায়ী, হাওড়া গ্রামীণ জেলায় ইটভাটার সংখ্যা কয়েক হাজার। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে যুক্ত রয়েছেন বহু শ্রমিক। জেলার বিভিন্ন এলাকার মধ্যে শ্যামপুর থানার এলাকায় ইটভাটার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি বলে প্রশাসনিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
রূপনারায়ণ, হুগলি এবং দামোদর—এই তিন নদী দিয়ে ঘেরা শ্যামপুর এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০০টি ইটভাটা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৭০টি ইটভাটা নিজস্ব জমিতে রয়েছে। অর্থাৎ, বাকি ইটভাটাগুলির একটি বড় অংশ সরকারি জমি ব্যবহার করছে বলে ভূমি সংস্কার দফতরের রিপোর্টে উঠে এসেছে।
প্রশাসনের দাবি, এই সরকারি জমির বেশির ভাগই বৈধ লিজ় ছাড়াই দখল করে ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও নদীর চর বা সরকারি জমি দখল করে সেই জমি ইটভাটা মালিকদের কাছে লিজ় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সেই লেনদেন থেকে সরকারি কোষাগারে কোনও রাজস্ব জমা পড়ছে না বলেও প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারি জমি ব্যবহারের পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসতে চাইছে জেলা প্রশাসন। প্রশাসনের লক্ষ্য, অব্যবহৃত সরকারি জমি যদি ইট শিল্পের কাজে ব্যবহারের উপযোগী হয়, তা হলে নির্দিষ্ট নিয়মে লিজ় দেওয়া হবে। এতে জমির ব্যবহারও নিয়ন্ত্রিত হবে এবং সরকারও নিয়ম অনুযায়ী রাজস্ব পাবে।
তবে শুধু জমির লিজ়ের বিষয়েই থেমে থাকছে না প্রশাসন। সরকারি জমিতে ইট পোড়ানো এবং চিমনি নির্মাণ নিয়েও কড়া অবস্থান নিয়েছে ভূমি সংস্কার দফতর। দফতরের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, সরকারি জমি ব্যবহার করে ইট পোড়ানোর কাজ বা চিমনি তৈরি করা যাবে না।
যে সব সরকারি জমিতে ইতিমধ্যেই ইটভাটার চিমনি তৈরি হয়ে গিয়েছে, সেগুলি বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে আগেই সরকারি নির্দেশিকা জারি হয়েছিল। এ বার সেই নির্দেশিকাই বাস্তবে কার্যকর করার পথে হাঁটছে হাওড়া জেলা প্রশাসন।
প্রশাসনের এই পদক্ষেপের ফলে সরকারি জমিতে বেআইনি ভাবে চলা ইটভাটাগুলির উপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বৈধ নথি এবং অনুমতির প্রয়োজনীয়তাও আরও স্পষ্ট হবে।
ইতিমধ্যেই নিয়ম না মানার অভিযোগে পদক্ষেপ শুরু হয়েছে। শ্যামপুর ২ নম্বর ব্লকের ভূমি সংস্কার দফতরের পক্ষ থেকে ২৬টি ইটভাটাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সরকারি জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ম ভাঙার অভিযোগেই এই নোটিস বলে প্রশাসনিক সূত্রের খবর।
এখন নজর থাকবে, নোটিস পাওয়া ইটভাটা মালিকেরা কী জবাব দেন এবং তাঁদের জমি ব্যবহারের বৈধ নথি রয়েছে কি না। পাশাপাশি যাঁরা সরকারি জমি লিজ় নিতে আগ্রহী, তাঁদের আবেদন কী ভাবে বিবেচনা করা হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশাসনের এই উদ্যোগ কার্যকর হলে হাওড়া গ্রামীণ এলাকায় ইট শিল্পের জমি ব্যবহারে নতুন নিয়ম চালু হতে পারে। এত দিন যে জমি দখল করে বা অনিয়মের মাধ্যমে ইটভাটা চালানোর অভিযোগ উঠছিল, তার বদলে সরকারি জমির ব্যবহারকে লিজ় ও রাজস্বের আওতায় আনার চেষ্টা হবে। একই সঙ্গে বেআইনি চিমনি এবং অনুমতিহীন ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও জোরদার হতে পারে।
সব মিলিয়ে, হাওড়ার ইট শিল্পে সরকারি জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ বার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। এক দিকে ইটভাটা মালিকদের জন্য বৈধ ভাবে সরকারি জমি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্য দিকে অনুমতি ছাড়া জমি দখল করে ব্যবসা চালানোর বিরুদ্ধে প্রশাসনের অবস্থানও কঠোর হচ্ছে। এর ফলে সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি, জমির সুষ্ঠু ব্যবহার এবং বেআইনি দখল নিয়ন্ত্রণ—তিনটি ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments