যাদবপুরে ফের উত্তেজনা! এইটবি-তে এসএফআইয়ের জমায়েত, পাল্টা পথে এবিভিপি—মুখোমুখি দুই শিবির | NGTV Newsনিউজ ডেস্ক: বুধবার রাতের সংঘর্ষের পর বৃহস্পতিবার সকালেও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। ফ্যাকাল্টি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (FETSU)-এর সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এবং এবিভিপির মধ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, রাত বাড়ার সঙ্গে তা সংঘর্ষে গড়ায়। দুই পক্ষেরই একাধিক পড়ুয়া আহত হওয়ার দাবি উঠেছে।
এই ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা নাগাদ যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ডে জমায়েতের কর্মসূচি নেয় এসএফআই। নির্ধারিত সময়ে সংগঠনের সদস্যরা সেখানে জড়ো হন। অন্যদিকে, তাদের কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগ তুলে দুপুর ১২টায় গোলপার্ক থেকে পাল্টা মিছিলের ডাক দেয় এবিভিপি। ফলে দিনের শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ও সংলগ্ন এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়।
রাতের ঘটনার পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মূলত শিক্ষা, গবেষণা এবং মতের আদানপ্রদানের জায়গা। সেই পরিসরে সংঘর্ষ কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
উপাচার্যের মতে, উৎকর্ষের জন্য পরিচিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বারবার অপ্রত্যাশিত কারণে সংবাদ শিরোনামে আসছে, যা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির পক্ষে অত্যন্ত হতাশাজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এখনও কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি বলেও তিনি জানান। শুক্রবার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। পুলিশকেও ঘটনার বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনা গড়িয়েছে কলকাতা হাই কোর্ট পর্যন্ত। বুধবার রাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া আবেদনের দ্রুত শুনানির আর্জি জানানো হয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চে।
আবেদনকারীর বক্তব্য ছিল, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত একটি মামলা ইতিমধ্যেই আদালতে বিচারাধীন। নতুন ঘটনার বিষয়টিও সেই মামলার সঙ্গে যুক্ত করে দ্রুত শুনানি করা হোক। তবে তাৎক্ষণিক শুনানির আবেদন গ্রহণ করেনি আদালত।

সংঘর্ষের সূত্রপাত কীভাবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা।
এবিভিপির দাবি, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও স্বীকৃত ছাত্র ইউনিয়ন নেই। সেই পরিস্থিতিতে জেনারেল বডি বা জিবি মিটিং আয়োজনের প্রতিবাদ করতে গেলে তাঁদের উপর বড় সংখ্যক পড়ুয়া হামলা চালায়। সংগঠনের দাবি, প্রায় ৭০-৮০ জন তাঁদের কর্মীদের উপর চড়াও হয়েছিলেন। এই ঘটনায় যাদবপুর শাখার সভাপতি নিখিল দাস-সহ একাধিক সদস্য আহত হন। চারজনকে রাতেই কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় বলে এবিভিপির তরফে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে এসএফআই, ডিএসও এবং অন্যান্য বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ, হামলার সূচনা এবিভিপির তরফেই হয়েছিল। তাঁদের দাবি, বাইরে থেকে লোকজন এনে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা তৈরি করা হয়। বাম ছাত্র সংগঠনগুলির আরও অভিযোগ, অরবিন্দ ভবনে কয়েকজন পড়ুয়াকে আটকে রাখা হয়েছিল এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় আগুন জ্বালানোর ঘটনাও ঘটে।
ঘটনার পর এবিভিপির কেন্দ্রীয় কর্মসমিতির সদস্য শুভব্রত অধিকারী বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। তাঁর অভিযোগ, দলিত পড়ুয়াদের উপরেও হামলা হয়েছে এবং নিখিল দাসকে প্রাণঘাতীভাবে আক্রমণের চেষ্টা করা হয়েছিল।
তিনি জানান, বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে এফআইআর করার প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে যাদবপুরে ‘গণতান্ত্রিক ভাবে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ করার কথাও বলেন তিনি।
অন্যদিকে, রেভলিউশনারি স্টুডেন্টস ফ্রন্টের সদস্য ও দর্শন বিভাগের ছাত্র অভিনব দাস পাল্টা অভিযোগ করেন, FETSU-র সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে এবিভিপি এবং এনএসএফের সঙ্গে বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে ঢুকেছিল। তাঁর দাবি, সংঘর্ষে অস্মিত সিন্হা, সায়ক মণ্ডল-সহ বেশ কয়েকজন আহত হন। বামপন্থী পড়ুয়াদের অরবিন্দ ভবনের দিকে তাড়া করে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে আটকে রাখার অভিযোগও করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার যাদবপুরের অশান্তি নিয়ে রাস্তায় নামে এবিভিপি। গোলপার্ক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটের দিকে মিছিলের কর্মসূচি ছিল তাদের। সেই মিছিলে যোগ দেন যাদবপুরের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়।
মিছিল থেকে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ কার্যকলাপের অভিযোগ তোলেন। তাঁর বক্তব্য, দেশবিরোধী স্লোগান বা ‘আজাদি’, ‘ইনশাআল্লা’ ধরনের বক্তব্য কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। যাদবপুরকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী মেশিনারি তৈরির’ জায়গা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনও কার্যকলাপ চলতে দেওয়া হবে না।

বিধায়কের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন বামপন্থী নেত্রী ও শিক্ষিকা নন্দিনী মুখোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, একজন বিধায়কের ভূমিকা হওয়া উচিত পরিস্থিতি শান্ত করা, উত্তেজনা বাড়ানো নয়।
নন্দিনীর প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে ছাত্রদের মধ্যে কোনও বিরোধ তৈরি হলে জনপ্রতিনিধি হিসেবে সেটি মীমাংসার চেষ্টা না করে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া কেন? শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন এবং ‘গুন্ডাদমন আইন’ কার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়ে রাজ্য সরকারের কাছে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন।
পুরো ঘটনায় সরাসরি মন্তব্য করতে চাননি বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, এবিভিপি একটি পৃথক ছাত্র সংগঠন এবং তারা বিজেপির নির্দেশে কাজ করে না। তাই সংগঠন সংক্রান্ত কোনও বক্তব্য থাকলে এবিভিপির নেতারাই তা জানাবেন।
একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কোনও প্রশ্ন থাকলে তার উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বুধবার রাতের ঘটনার প্রতিবাদে আগামী ২০ অগস্ট ‘ধিক্কার দিবস’ পালনের ঘোষণা করেছে ডিএসও। সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায়ের অভিযোগ, এবিভিপি এবং আরএসএসের একাংশ পতাকা ছেঁড়া, আগুন লাগানো ও অশান্তি তৈরির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় দখলের চেষ্টা করছে।
তাঁর দাবি, যাদবপুরের দীর্ঘদিনের ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহ্যকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা বক্তব্য দিয়েছে এবিভিপি।
একদিকে ৮বি-তে এসএফআইয়ের জমায়েত, অন্যদিকে গোলপার্ক থেকে এবিভিপির মিছিল—দুই কর্মসূচিকে ঘিরে বৃহস্পতিবার যাদবপুর ও সংলগ্ন এলাকায় পুলিশের তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে। সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ, বহিরাগতদের উপস্থিতি, আহতদের অভিযোগ এবং ক্যাম্পাসে আগুন লাগানোর দাবিগুলি তদন্তের মাধ্যমে কতটা সত্য প্রমাণিত হয়, এখন সেটাই দেখার।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরই পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments