
নিউজ ডেস্ক: প্রায় ২৭ বছর ধরে আমেরিকায় বসবাস। রয়েছে বৈধ গ্রিন কার্ড। আমেরিকাতেই রয়েছে পরিবার, বাড়ি এবং চাকরি। এমনকি চলতি বছরের মে মাসে তাঁকে ভারতে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তও নাকচ করেছিল অভিবাসন আদালত। তার পরেও মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE)-এর হাতে আটক হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক মহিলা। ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে আমেরিকায়।
আটক মহিলার নাম ভেঙ্কাটা নরসম্বা ভেসামসেট্টি। জানা গিয়েছে, ২০১৩ সাল থেকে তিনি আমেরিকার পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট বা গ্রিন কার্ডধারী। তাঁর দুই সন্তান এবং দুই নাতনি আমেরিকার নাগরিক। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষক হিসাবেও কাজ করেন তিনি।
ঘটনাটি ঘটেছে গত ১১ অগস্ট জর্জিয়ায়। নিয়ম মেনে ICE দফতরে নিজের উপস্থিতি নথিভুক্ত করাতে গিয়েছিলেন ভেঙ্কাটা। অভিযোগ, সেখানেই তাঁকে আটক করে একটি ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়।
পরিবারের দাবি, এমন ঘটনায় তাঁরা কার্যত হতবাক। কারণ, মাত্র কয়েক মাস আগেই তাঁকে ভারতে ফেরত পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্ত খারিজ হয়েছিল বলে তাঁদের বক্তব্য। সেই পরিস্থিতিতে আবার কেন তাঁকে আটক করা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভেঙ্কাটার পরিবার ও আইনজীবীরা।
মার্কিন সরকারের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ২০২২ সালে ভেঙ্কাটার ভারত সফর। সরকারি পক্ষের দাবি, সে সময় তিনি প্রায় সাত মাস ভারতে ছিলেন। দীর্ঘ সময় আমেরিকার বাইরে থাকার কারণে তাঁর পার্মানেন্ট রেসিডেন্সির শর্ত লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, সেটিই এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তবে ভেঙ্কাটার পরিবার ও আইনজীবীর বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের দাবি, অসুস্থ বাবা-মায়ের দেখভালের জন্যই ভারতে যেতে হয়েছিল তাঁকে। সেই সময় নিজেও কোভিডে আক্রান্ত হয়েছিলেন ভেঙ্কাটা। ফলে দীর্ঘ সময় দেশে থাকার পিছনে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ ছিল।
আইনজীবীদের বক্তব্য, আমেরিকার সঙ্গে ভেঙ্কাটার সম্পর্ক কখনও বিচ্ছিন্ন হয়নি। তাঁর বাড়ি, চাকরি এবং পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই আমেরিকায়। দীর্ঘদিন ধরে সেখানেই বসবাস করছেন তিনি।
ভেঙ্কাটার ঘটনা সামনে আসার পর গ্রিন কার্ডধারীদের অধিকার নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গ্রিন কার্ড থাকলেই যে কোনও পরিস্থিতিতে আমেরিকায় থাকার অধিকার সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ থাকবে, এমন নয়। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আমেরিকায় স্থায়ী ভাবে বসবাসের অভিপ্রায় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে ছ’মাসের বেশি সময় আমেরিকার বাইরে থাকলেই স্বয়ংক্রিয় ভাবে গ্রিন কার্ড বাতিল হয়ে যায় বা কাউকে বহিষ্কার করা হয়—বিষয়টি এমন সরল নয়। পরিস্থিতি, ব্যক্তির কারণ এবং অভিবাসন আইনের সংশ্লিষ্ট বিধি খতিয়ে দেখা হয়।
ভেঙ্কাটার ক্ষেত্রেও মূল প্রশ্ন হল, ২০২২ সালের দীর্ঘ ভারত সফর তাঁর আমেরিকায় স্থায়ী বসবাসের অভিপ্রায়কে প্রভাবিত করেছিল কি না এবং সেই সফরের জন্য তাঁর দেওয়া কারণ ও অন্যান্য তথ্য কী ভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
ভেঙ্কাটার আইনজীবী জোয়ি উইলসনের দাবি, তাঁর মক্কেল কখনও আমেরিকার আইন ভাঙেননি। তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর দুই সন্তান এবং দুই নাতনিই আমেরিকার নাগরিক।
আইনজীবীর আরও দাবি, ভেঙ্কাটার শারীরিক সমস্যাও রয়েছে এবং নিয়মিত চিকিৎসা ও নজরদারি প্রয়োজন। ফলে তাঁকে ডিটেনশন সেন্টারে রাখার বিষয়টিও পরিবারের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জোয়ি উইলসন জানিয়েছেন, পরিবারের অনুমতি নিয়েই তিনি ভেঙ্কাটার বিষয়টি সংবাদমাধ্যম এবং সমাজমাধ্যমের সামনে এনেছেন। তাঁর বক্তব্য, ২৭ বছর ধরে আমেরিকায় বসবাস করা একজন গ্রিন কার্ডধারীকে এই ভাবে আটক করার ঘটনা নিয়ে জনসমক্ষে আলোচনা প্রয়োজন।
ভেঙ্কাটার মামলায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল সময়ের ব্যবধান। চলতি বছরের মে মাসেই তাঁকে ভারতে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নাকচ হয়েছিল বলে পরিবার ও আইনজীবীর দাবি। তার কয়েক মাসের মধ্যেই ফের ICE-এর হেফাজতে চলে গেলেন তিনি।
ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে, আগের আদালতের সিদ্ধান্তের পর নতুন করে কোন আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে তাঁকে আটক করা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও জানা গিয়েছে।
এই মুহূর্তে ভেঙ্কাটা ICE-এর হেফাজতে রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে আমেরিকায় থাকার অনুমতি দেওয়া হবে, নাকি ভারতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ ও আদালতের সিদ্ধান্তের উপর।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments