Homeনদিয়ারানাঘাটচাকার ঘূর্ণনেই সংসার, বিশ্বকর্মা পুজোয় মেহনতি চালকদের আবেগ

চাকার ঘূর্ণনেই সংসার, বিশ্বকর্মা পুজোয় মেহনতি চালকদের আবেগ

নিউজ ডেস্ক; রানাঘাট: বিশ্বকর্মা পুজো মানেই শুধু কারখানা, যন্ত্রপাতি কিংবা বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎসব নয়। নদিয়ার রানাঘাটের অলিগলি, বাজার, স্ট্যান্ড কিংবা ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন যাঁদের জীবিকা ঘুরে চলে চাকার সঙ্গে,
WhatsApp Image 2026-09-17 at 5.41.54 PM

নিউজ ডেস্ক; রানাঘাট: বিশ্বকর্মা পুজো মানেই শুধু কারখানা, যন্ত্রপাতি কিংবা বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎসব নয়। নদিয়ার রানাঘাটের অলিগলি, বাজার, স্ট্যান্ড কিংবা ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন যাঁদের জীবিকা ঘুরে চলে চাকার সঙ্গে, তাঁদের কাছেও এই দিনটির আলাদা আবেগ রয়েছে। রিকশা হোক কিংবা টোটো—এই বাহনই তাঁদের কাছে সংসার চালানোর প্রধান অবলম্বন। তাই বিশ্বকর্মা পুজোর আগে বাহনটিকে ধুয়ে-মুছে সাজিয়ে তোলা অনেকের কাছেই নিছক নিয়ম নয়, বরং নিজের রুজি-রুটির হাতিয়ারকে সম্মান জানানোর এক বিশেষ মুহূর্ত।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে বাহনের চেহারা। একসময় রানাঘাট-সহ নদিয়ার বিভিন্ন এলাকায় হাতে টানা রিকশা কিংবা প্যাডেল রিকশাই ছিল যাতায়াতের অন্যতম ভরসা। ভারী লোহার চাকা ঘুরিয়ে, ঘাম ঝরিয়ে রাস্তায় ছুটতেন চালকেরা। বিশ্বকর্মা পুজোর আগের দিন রাত পর্যন্ত চলত রিকশা পরিষ্কারের কাজ। কাঠের হাতল, লোহার কাঠামো থেকে শুরু করে চাকার প্রতিটি অংশ ধুয়ে-মুছে ঝকঝকে করে তোলা হত। রঙিন কাগজ, ফিতে কিংবা ফুল দিয়ে সাজানো হত বাহন।

এর পর ধীরে ধীরে বদল আসে। মোটরচালিত রিকশা, ভ্যানরিকশা এবং বিভিন্ন ধরনের মালবাহী যান শহর ও মফস্‌সলের রাস্তায় জায়গা করে নেয়। যাত্রী ও মাল বহনের ক্ষমতা বাড়ে। প্রযুক্তির হাত ধরে আরও এক ধাপ এগিয়ে এখন বহু রাস্তায় দাপট টোটোর। রানাঘাট পুরসভার ব্যবস্থাপনাতেও টোটো ও ভ্যান-সংক্রান্ত অনলাইন ভেহিকেল ম্যানেজমেন্ট পরিষেবা রয়েছে।

টোটো আসায় চালকদের শারীরিক পরিশ্রমের ধরন কিছুটা বদলেছে ঠিকই, কিন্তু জীবিকার লড়াই যে সহজ হয়েছে, তা নয়। বরং নতুন সমস্যা যোগ হয়েছে। ব্যাটারির খরচ, চার্জিংয়ের টাকা, কিস্তি, রক্ষণাবেক্ষণ—সব মিলিয়ে প্রতিদিনের আয়ের একটা বড় অংশ চলে যায় বাহন সচল রাখতেই। তার উপর একই রাস্তায় টোটোর সংখ্যা বাড়ায় যাত্রী ভাগ হয়ে যাচ্ছে। নদিয়ায় টোটো নিয়ে পরিবহণ সংক্রান্ত টানাপড়েনের জেরে বেসরকারি বাস পরিষেবা বন্ধ হওয়ার ঘটনাও সাম্প্রতিক সময়ে সামনে এসেছিল।

তবু বিশ্বকর্মা পুজোর দিন হিসাব-নিকাশ কিছুক্ষণের জন্য দূরে সরিয়ে রাখেন চালকেরা। আগের দিন রাত জেগে টোটো বা রিকশা পরিষ্কার করা হয়। গাঁদা ও বেলি ফুলের মালা, রঙিন ফিতে, ছোট পতাকা দিয়ে সাজানো হয় বাহন। কেউ কেউ সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন রং করান, আবার কেউ পুরনো বাহনটিকেই যত্ন করে সাজিয়ে তোলেন।

পুজোর দিন অনেক স্ট্যান্ডেই চালকেরা একসঙ্গে বসে আয়োজন করেন পুজো। কোথাও মাইকে গান বাজে, কোথাও হয় খিচুড়ি প্রসাদ। পরিবারের ছোটরাও নতুন জামাকাপড় পরে বাবার টোটো কিংবা রিকশার পাশে এসে দাঁড়ায়। সারা বছর রাস্তায় ছুটে বেড়ানো মানুষগুলির কাছে এই একটি দিন যেন একটু অন্য রকম।

কিন্তু উৎসবের হাসির আড়ালে থেকে যায় কঠিন বাস্তব। দিনের আয় থেকে ব্যাটারির কিস্তি, ধার-দেনা, চার্জিং খরচ, বিদ্যুতের বিল এবং সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে হয়। যেদিন আয় কম, সেদিন হিসাব আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বৃষ্টির দিন, যানজট, অসুস্থতা কিংবা যাত্রী কম থাকলে সরাসরি প্রভাব পড়ে রোজগারে।

তার উপর বাড়ছে প্রতিযোগিতা। পাড়ার গলি থেকে বাজার, স্টেশন থেকে গ্রামের রাস্তা—বিভিন্ন রুটে টোটোর সংখ্যা বাড়ায় একই যাত্রীর জন্য একাধিক চালকের প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। ফলে সারাদিন রাস্তায় থাকার পরও প্রত্যাশিত আয় অনেক সময় হাতে থাকে না।

তবু বিশ্বকর্মা পুজোর দিন সেই দুশ্চিন্তাগুলিকে কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকতে চান মেহনতি চালকেরা। কারণ তাঁদের কাছে টোটো বা রিকশা শুধু একটি যান নয়—এটাই সংসারের চাকা ঘোরানোর মাধ্যম। এই বাহনটিই তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের খাবার, বাড়ির খরচ কিংবা অসুস্থ পরিজনের চিকিৎসার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

বিশ্বকর্মা পুজোর ফুল, ধূপ আর প্রসাদের গন্ধের মধ্যে তাই মিশে থাকে একটাই প্রার্থনা—সারা বছর যেন বাহনটি ভালো থাকে, চাকা যেন থেমে না যায়। কারণ সেই চাকা থেমে গেলে থমকে যেতে পারে একটি পরিবারের রোজগারও।

রানাঘাটের রাস্তায় পুরনো প্যাডেল রিকশা থেকে আজকের ব্যাটারিচালিত টোটো—বাহনের বিবর্তন হয়েছে, বদলেছে প্রযুক্তি। কিন্তু মেহনতি চালকদের লড়াইটা রয়ে গিয়েছে একই জায়গায়। বিশ্বকর্মা পুজোর একদিনের আনন্দের মধ্যেই তাঁরা খুঁজে নেন আগামী দিনের নিশ্চয়তার আশা।

No Comments

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved