
নিউজ ডেস্ক; “আমরা এ বার রাস্তায় চাকু নিয়ে বসব। ছিনতাই করব। সংসার আছে, বাড়িতে ছোট বাচ্চা আছে। স্কুলে পড়ে। কী করে পড়াব, কী করে খাওয়াব?”—রবিবার সকাল সকাল দোকান ভেঙে দেওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পড়ে এমনই কথা বললেন শিলিগুড়ির বর্ধমান রোড ফ্লাইওভারের নীচে অস্থায়ী দোকান করা এক ব্যবসায়ী। রাগের মাথায় হুঁশিয়ারির সুরে কথাগুলি বললেও পর মুহূর্তেই কান্নায় ভেঙে পড়েন গৌড় কর্মকার। তাঁর মতো আরও কয়েক জন ব্যবসায়ীর দোকান এ দিন গুঁড়িয়ে দিয়েছে প্রশাসন।
বর্ধমান রোডে নবনির্মিত ফ্লাইওভারের নীচের জায়গা দখল করে একের পর এক দোকান তৈরি করা হয়েছে—এমন অভিযোগ পেয়েই রবিবার উচ্ছেদ অভিযানে নামে শিলিগুড়ি পুরসভা। পুরসভার কর্মীদের সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছিলেন পুলিশ কমিশনারেটের আধিকারিক ও কর্মীরাও। প্রশাসনের দাবি, ফ্লাইওভারের নীচে বেআইনি ভাবে দখল করে তৈরি করা দোকান সরাতেই এই অভিযান। অন্য দিকে, ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তাঁদের কোনও নোটিস না দিয়েই আচমকা দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
অভিযান শুরু হতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দোকান হারানোর আশঙ্কায় একাধিক ব্যবসায়ী ঘটনাস্থলে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ, অনেকেই নিজেদের সঞ্চয়ের টাকা খরচ করে দোকান তৈরি করেছিলেন। ব্যবসার জন্য মালপত্রও কিনেছিলেন। আচমকা সেই দোকান ভেঙে দেওয়ায় তাঁরা কার্যত সর্বস্বান্ত।
গৌড় কর্মকারের দাবি, দোকান তৈরিতে তাঁর বিপুল টাকা খরচ হয়েছিল। দোকানের ভিতরে লক্ষাধিক টাকার সামগ্রী ছিল। পাশাপাশি নগদ প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকাও রাখা ছিল বলে দাবি তাঁর। উচ্ছেদ অভিযানে দোকান ভেঙে যাওয়ায় সেই সমস্ত সামগ্রী নষ্ট হয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দোকান হারানোর পর পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন গৌড়। তাঁর কথায়, সংসারের খরচ চালানো এবং সন্তানের পড়াশোনার দায়িত্ব রয়েছে। হঠাৎ করে ব্যবসার জায়গা চলে যাওয়ায় কী ভাবে পরিবার চালাবেন, সেটাই এখন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ক্ষতিপূরণ না পেলে আরও কঠোর পথে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। যদিও পরে আবেগপ্রবণ হয়ে কেঁদে ফেলেন ওই ব্যবসায়ী।
প্রশাসনের এই উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ থাকলেও শহরের একাংশের বাসিন্দা অবশ্য পদক্ষেপটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, ফ্লাইওভার বা সরকারি পরিকাঠামোর নীচের খালি জায়গা দেখেই কেউ সেখানে নিজের মতো করে দোকান বসিয়ে দিতে পারেন না। জনসাধারণের চলাচল এবং সরকারি সম্পত্তি দখল করে ব্যবসা করা হলে প্রশাসনের তরফে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
শিলিগুড়ির হোটেল ব্যবসায়ী রণবীর তালুকদার ওই ব্যবসায়ীদের ‘সুযোগসন্ধানী’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, ফ্লাইওভার তৈরি হওয়ার আগে যাঁরা এখন সেখানে ব্যবসা করছিলেন, তাঁরা কোথায় ব্যবসা করতেন? তাঁর মতে, সরকারি পরিকাঠামো তৈরি হওয়ার পরে তার নীচের জায়গা দখল করে নতুন করে ব্যবসার ব্যবস্থা তৈরি করা কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শহরের বাসিন্দা সুবীর সরকারেরও বক্তব্য, কোনও রাস্তার ধারে বা সরকারি খালি জায়গা পড়ে থাকলেই সেটি দখল করে নেওয়া যায় না। তাঁর কথায়, জায়গাটি যদি বেআইনি ভাবে দখল করা হয়ে থাকে, তা হলে তা সরিয়ে দেওয়াই সরকারের দায়িত্ব। সেই দিক থেকে প্রশাসনের এ দিনের পদক্ষেপকে তিনি যুক্তিসঙ্গত বলেই মনে করছেন।
পুরসভা সূত্রে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, এই উচ্ছেদ অভিযান আচমকা নেওয়া কোনও সিদ্ধান্ত নয়। দীর্ঘদিন ধরেই সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জায়গা খালি করে দেওয়ার কথা জানানো হচ্ছিল। শিলিগুড়ি পুরসভার এক আধিকারিক বলেন, বেআইনি দখল সরানো প্রশাসনের দায়িত্ব। এর আগে বর্ধমান রোডে একাধিক বার দখলদারি সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে তা পিছিয়ে গিয়েছিল। অনেক দিন ধরে ব্যবসায়ীদের দোকান সরিয়ে নেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা সেই নির্দেশ না মানায় শেষ পর্যন্ত অভিযান চালাতে হয়েছে।
বর্ধমান রোডের এই উচ্ছেদ অভিযানের নেপথ্যে রয়েছে আরও একটি অভিযোগ। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, ফ্লাইওভার তৈরির পর তার নীচের জায়গা দখল করে দোকান বসানোর জন্য একটি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। অর্থের বিনিময়ে জায়গা বিক্রি বা বরাদ্দ করার অভিযোগও উঠেছে। সেই সুযোগে বেশ কিছু মানুষ সেখানে দোকান তৈরি করে ব্যবসা শুরু করেন বলে অভিযোগ।
উল্লেখ্য, তৃণমূল সরকারের আমলে বর্ধমান রোড ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ শেষ হলেও নির্বাচন ঘোষণার কারণে উদ্বোধনের সময় পিছিয়ে যায়। পরে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার প্রায় দু’মাসের মাথায় ফ্লাইওভারটির উদ্বোধন করা হয়। তার পরেই ফ্লাইওভারের নীচের অব্যবহৃত জায়গায় ধীরে ধীরে দোকানপাট গজিয়ে ওঠে বলে অভিযোগ।
এ দিনের অভিযানের পর অবশ্য আরও একটি প্রশ্ন তুলছেন শিলিগুড়ির বাসিন্দাদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, শহরের অন্য কয়েকটি ফ্লাইওভার এবং সরকারি জায়গার নীচেও দীর্ঘদিন ধরে দোকান বা বাজার গড়ে উঠেছে। মহাবীরস্থানে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ফ্লাইওভারের নীচে থাকা দোকান, বাগডোগরার ফ্লাইওভারের নীচের বাজার কিংবা শিলিগুড়ি থানার সামনের বাজারের প্রসঙ্গও তাঁরা তুলেছেন।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, ওই জায়গাগুলিও কোনও না কোনও ভাবে দখল করেই ব্যবসার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে জায়গা বা ‘স্পেস’ বিক্রির অভিযোগও শোনা যায়। ফলে বর্ধমান রোডে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পাশাপাশি শহরের অন্যান্য সরকারি জায়গা ও ফ্লাইওভারের নীচে থাকা দখলদারির ক্ষেত্রেও প্রশাসন একই রকম পদক্ষেপ করবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তাঁদের বক্তব্য, সরকারি জায়গা দখল যদি বেআইনি হয়, তা হলে আইন সবার ক্ষেত্রেই সমান ভাবে প্রয়োগ করা উচিত। একটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে অন্য জায়গায় একই ধরনের দখলদারি রেখে দেওয়া হলে প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে বর্ধমান রোডের পর এ বার নজর অন্য এলাকাগুলির দিকে যায় কি না, সেদিকেও তাকিয়ে শহরবাসী।
এ দিকে, রবিবারের অভিযানের পর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণের দাবি উঠেছে। ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, তাঁদের দোকান বেআইনি হয়ে থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ব্যবসা চলেছে। দোকান তৈরিতে এবং মালপত্র কিনতে অনেকেরই বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়েছে। ফলে একেবারে পথে বসিয়ে দেওয়া হলে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।
অন্য দিকে প্রশাসনের অবস্থানও স্পষ্ট—সরকারি বা জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গা দখল করে ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়া হবে না। ফলে একদিকে জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় ব্যবসায়ীদের কান্না ও ক্ষোভ, অন্য দিকে সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করার প্রশাসনিক অভিযান—দুইয়ের টানাপড়েনে রবিবার সকাল থেকেই সরগরম ছিল বর্ধমান রোড।
এ দিনের ঘটনা ফের সামনে আনল শিলিগুড়ি শহরে সরকারি জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা দোকান-বাজারের পুরনো প্রশ্নটিও। বর্ধমান রোডে অভিযান দিয়ে সেই সমস্যার সমাধানের প্রথম ধাপ শুরু হল, নাকি এখানেই থেমে থাকবে পদক্ষেপ—এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন শহরবাসী।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments