Homeহুগলিচন্দননগরজীর্ণ রেজিস্ট্রি ভবনে ফিরবে ফরাসি আমলের ছোঁয়া, ১১ সেপ্টেম্বর চন্দননগরে শুরু সংস্কার

জীর্ণ রেজিস্ট্রি ভবনে ফিরবে ফরাসি আমলের ছোঁয়া, ১১ সেপ্টেম্বর চন্দননগরে শুরু সংস্কার

নিউজ ডেস্ক; ইতিহাসের পাতায় চন্দননগরের নাম জড়িয়ে রয়েছে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে। গঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা এই শহরের অলিগলি, স্থাপত্য এবং সংস্কৃতির নানা স্তরে আজও স্পষ্ট সেই ফরাসি প্রভাব। ফরাসি
resizeplus_Screenshot 2026-09-10 141132

নিউজ ডেস্ক; ইতিহাসের পাতায় চন্দননগরের নাম জড়িয়ে রয়েছে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে। গঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা এই শহরের অলিগলি, স্থাপত্য এবং সংস্কৃতির নানা স্তরে আজও স্পষ্ট সেই ফরাসি প্রভাব। ফরাসি মিউজিয়াম থেকে ক্লক টাওয়ার, ডুপ্লে কলেজ থেকে ফরাসি গির্জা—একাধিক স্থাপত্য এখনও অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে। সরকারি ভাবে বেশ কিছু স্থাপত্য হেরিটেজ তালিকাতেও রয়েছে। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে তালিকার বাইরে থাকা বহু ঐতিহ্যবাহী ভবনের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। সেই তালিকায় অন্যতম চন্দননগরের পুরনো রেজিস্ট্রি বিল্ডিং।

দীর্ঘদিন ধরে মেরামতির অভাবে কার্যত ভগ্নদশায় পৌঁছেছে ফরাসি আমলের এই দ্বিতল ভবন। আগাছায় ঢেকে গিয়েছে বাড়ির বিস্তীর্ণ অংশ। কোথাও খসে পড়েছে দেওয়ালের আস্তরণ, কোথাও আবার দেখা দিয়েছে জীর্ণতার স্পষ্ট চিহ্ন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার না হলে ইতিহাসের এই সাক্ষী ভবনটি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেই পরিস্থিতি বদলানোর উদ্যোগ শুরু হচ্ছে। সরকারি সূত্রের খবর, আগামী ১১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে রেজিস্ট্রি ভবন সংস্কারের কাজের সূচনা হবে। অনুষ্ঠানে রাজ্যের মন্ত্রী ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের পাশাপাশি উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে ভারতে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত এবং ফ্রান্স সরকারের একটি প্রতিনিধি দলের। ফলে শুধু একটি পুরনো ভবনের সংস্কার নয়, এই উদ্যোগকে ভারত ও ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই অনুষ্ঠান ঘিরে ইতিমধ্যেই উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে চন্দননগরে। সাজিয়ে তোলা হচ্ছে শহরের ঐতিহ্যবাহী স্ট্র্যান্ড রোড। আলোকসজ্জায় সাজবে গঙ্গার ধারের এলাকা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি হচ্ছে মঞ্চ। নাচ-গানের পাশাপাশি গঙ্গা আরতিরও পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় খাবার ও মিষ্টির নানা স্টলও থাকবে অনুষ্ঠানে। অর্থাৎ সংস্কারকাজের সূচনাকে ঘিরে তিন দিনের একটি ইন্দো-ফরাসি সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করার পরিকল্পনা করেছে প্রশাসন।

স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, চন্দননগর স্ট্র্যান্ড রোডের কাছে, রানিঘাট সংলগ্ন এলাকায় ১৮৭৫ সালে তৈরি হয়েছিল এই রেজিস্ট্রি ভবন। ফরাসি স্থাপত্যরীতির আদলে নির্মিত দ্বিতল বাড়িটিতে এক সময় ফরাসি সরকারের রেজিস্ট্রি অফিস ছিল। শুধু প্রশাসনিক কাজই নয়, একটি সময়ে সেখানে আদালতও বসত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। ফলে ভবনটির সঙ্গে শহরের প্রশাসনিক ইতিহাসেরও গভীর যোগ রয়েছে।

১৯৫০ সালে চন্দননগর আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে ভবনটির গুরুত্ব কমতে থাকে। সময়ের সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব বাড়তে থাকে। পরিণতিতে এক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনটি আজ কার্যত অবহেলার স্মারকে পরিণত হয়েছে।

তবে এই ভবনকে নতুন করে তার পুরনো রূপে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নতুন নয়। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভবনটির সংস্কার ও সংরক্ষণ নিয়ে একটি ‘মউ’ বা সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সংস্কারের জন্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবে রূপ পায়নি। ফলে বছরের পর বছর একই অবস্থায় পড়ে থেকেছে ঐতিহাসিক ভবনটি।

এ বার সেই অসম্পূর্ণ উদ্যোগই নতুন করে বাস্তবায়নের পথে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবনটির ঐতিহাসিক স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই সংস্কার করা হবে। লক্ষ্য শুধু নতুন করে রং করা বা ভেঙে যাওয়া অংশ মেরামত করা নয়, বরং ফরাসি আমলের স্থাপত্যের চরিত্র যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ণ রেখে ভবনটিকে সংরক্ষণ করা।

১১ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানে রাজ্যের পর্যটন দপ্তরের মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষের পাশাপাশি ফরাসি প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ভারত ও ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে চন্দননগরকে তুলে ধরার পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রশাসনের আশা, ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলি সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে পর্যটনের ক্ষেত্রেও শহরটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

এই উদ্যোগকে ঘিরে ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি খতিয়ে দেখেছেন চন্দননগরের বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন হুগলির অতিরিক্ত জেলাশাসক অনুজ প্রতাপ সিং এবং মহকুমাশাসক আশুতোষ কুমার। প্রশাসনিক আধিকারিকেরা অনুষ্ঠানের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করেছেন।

জানা গিয়েছে, ১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর, টানা তিন দিন ধরে চন্দননগরে চলবে এই বিশেষ উৎসব। স্ট্র্যান্ড রোডে আলোকসজ্জার পাশাপাশি থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তৈরি হচ্ছে মঞ্চ। স্থানীয় খাবারের নানা আয়োজনও থাকছে। চন্দননগরের বিখ্যাত জলভরা সন্দেশ-সহ বিভিন্ন খাবারের স্টল উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে।

চন্দননগর হেরিটেজ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা কল্যাণ চক্রবর্তীর মতে, শহরের ঐতিহ্য শুধু ফরাসি ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসেও চন্দননগরের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। একাধিক বিপ্লবী এই শহরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মতে, ইন্দো-ফরাসি উৎসবের মঞ্চে সেই বিপ্লবীদেরও স্মরণ করা হলে চন্দননগরের ইতিহাসের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সামনে আসবে।

বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহও জানিয়েছেন, চন্দননগরের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং স্থাপত্য—সবকিছুকেই সংরক্ষণ করার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এক সময়ে বিপ্লবীদের আত্মগোপনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল এই শহর। ফ্রান্সের সঙ্গে চন্দননগরের যে দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্ক, সেটিকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি চন্দননগরকে ঘিরে রাজ্যের পর্যটন পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

চন্দননগরের পর্যটন সম্ভাবনার সঙ্গে নদীপথকেও যুক্ত করার ভাবনা রয়েছে। রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিং জানিয়েছেন, কলকাতার গঙ্গায় প্রস্তাবিত রিভার ক্রুজ পরিষেবাকে ভবিষ্যতে ব্যান্ডেল থেকে শ্রীরামপুর হয়ে ব্যারাকপুর পর্যন্ত বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই ধরনের নদীকেন্দ্রিক পর্যটন প্রকল্পের সঙ্গে চন্দননগরের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য ও ফরাসি ইতিহাসকে যুক্ত করা গেলে পর্যটনের নতুন দরজা খুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘ অবহেলার পর চন্দননগরের পুরনো রেজিস্ট্রি ভবন ঘিরে নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে। এক সময় যে বাড়িতে ফরাসি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলত, যে ভবন শহরের ঔপনিবেশিক অতীত এবং প্রশাসনিক ইতিহাসের সাক্ষী, সেটিই এ বার ফিরে পেতে চলেছে তার পুরনো জৌলুস। সংস্কারের কাজ বাস্তবে কতটা দ্রুত এগোয়, আর ঐতিহাসিক স্থাপত্যের চরিত্র কতটা অক্ষুণ্ণ রাখা যায়—সেদিকেই এখন নজর চন্দননগরবাসীর।

No Comments

তাজা খবর

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved