Last updated: September 10th, 2026 at 02:17 pm

শফিকুল ইসলাম, নদিয়া : প্রকাশ্য দিবালোকে এক অবলা প্রাণীর উপর চরম নারকীয় হামলা। সঙ্গমরত অবস্থায় থাকা একটি পথকুকুরের যৌনাঙ্গে মাংস কাটার ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার অভিযোগ উঠল এক মাংস ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় লুটিয়ে পড়া সারমেয়টিকে ঘিরে শোরগোল পড়তেই এলাকা ছেড়ে চম্পট দেয় অভিযুক্ত। মঙ্গলবার দুপুরে নদিয়ার তাহেরপুর থানার অন্তর্গত মাছ বাজার এলাকায় ঘটে যাওয়া এই পৈশাচিক ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা জনপদে। ঘটনার জেরে রাতেই অভিযুক্তকে পাকড়াও করে তাহেরপুর থানার পুলিশ। বুধবার ধৃতকে রানাঘাট মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার দুপুর নাগাদ। তাহেরপুরের ব্যস্ত মাছ বাজারের কাছে দু’টি পথকুকুর সঙ্গমরত অবস্থায় ছিল। স্বাভাবিক এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় কোনও রকম ব্যাঘাত ঘটানোর কথা দূর, পথচলতি মানুষজন বা অন্যান্য বিক্রেতারা যে যার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু আচমকাই রুদ্রমূর্তি ধারণ করে স্থানীয় মাংস বিক্রেতা মানিক দাস। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কোনও প্ররোচনা ছাড়াই হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ওই ব্যবসায়ী। নিজের দোকানের মাংস কাটার ধারালো কাটারি বা ছুরি হাতে নিয়ে সে সটান এগিয়ে যায় সারমেয় দু’টির দিকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি কুকুরের নিম্নাঙ্গে সজোরে আঘাত হানে। আকস্মিক ও নৃশংস এই হামলায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রক্তাপ্লুত অবলা প্রাণীটি। রক্তে ভেসে যায় বাজারের পাকা রাস্তা।
প্রকাশ্য বাজারে দিনের আলোয় এমন বর্বরোচিত দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান উপস্থিত অন্যান্য ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীরা। মুহূর্তের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে বাজারে। বেগতিক বুঝে রক্তাক্ত অস্ত্র ফেলে দোকান ছেড়ে এলাকা থেকে চম্পট দেয় অভিযুক্ত মানিক। খবর দেওয়া হয় তাহেরপুর থানায়। পুলিশ পৌঁছনোর আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা এবং কয়েক জন পশুপ্রেমী গুরুতর জখম কুকুরটির প্রাথমিক শুশ্রূষা শুরু করেন। ঘটনাস্থলে এসে তাহেরপুর থানার কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং কালবিলম্ব না করে রক্তাক্ত সারমেয়টিকে উদ্ধার করে দ্রুত স্থানীয় পশু হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠান।
পশু চিকিৎসকদের একাংশের বক্তব্য, ধারালো অস্ত্রের কোপে অবলা প্রাণীটির গোপনাঙ্গ এবং সংলগ্ন অংশে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় দেহে বিপজ্জনক মাত্রায় রক্তচাপ কমে গিয়েছিল। দ্রুত হাসপাতালে না আনা হলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই সারমেয়টির মৃত্যু হতে পারত। বর্তমানে সেটির অবস্থা স্থিতিশীল হলেও সঙ্কট পুরোপুরি কাটেনি। সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে তাকে। বিশেষভাবে প্রশংসনীয় ভূমিকা নিয়েছে তাহেরপুর থানা, যেখানে পুলিশের নিজস্ব নজরদারিতে আহত কুকুরটির নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধের তদারকি চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্তের সন্ধানে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ বাহিনী। সম্ভাব্য একাধিক ডেরায় হানা দিয়ে অবশেষে মঙ্গলবার গভীর রাতে মানিক দাসকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হন তদন্তকারীরা। তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এবং পশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা নিবারণ আইনের (Prevention of Cruelty to Animals Act) নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। বুধবার কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে অভিযুক্তকে রানাঘাট মহকুমা আদালতে পেশ করে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানায় পুলিশ।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমাজমাধ্যম থেকে শুরু করে স্থানীয় জনজীবনে আছড়ে পড়েছে তীব্র নিন্দার ঝড়। পশুপ্রেমী সংগঠনগুলি এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সরব হয়েছে। তাদের বক্তব্য, রাস্তাঘাটে নির্বাক প্রাণীদের উপর ক্রমবর্ধমান এই হিংসাত্মক মানসিকতা সমাজের এক ভয়ঙ্কর অধঃপতনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মানুষের অসহিষ্ণুতা কোন পর্যায়ে পৌঁছলে একটি অবলা প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনপ্রক্রিয়ার উপর এমন ধারালো অস্ত্রের কোপ বসানো যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সমাজকর্মীরা। কোনও ধরনের মানসিক বিকৃতি থেকেই অভিযুক্ত মানিক দাস এমন জঘন্য কাণ্ড ঘটিয়েছে নাকি এর নেপথ্যে অন্য কোনও আক্রোশ ছিল, তা বিশদে খতিয়ে দেখছে তাহেরপুর থানার তদন্তকারী আধিকারিকেরা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments