
নিউজ ডেস্ক : একদিকে ক্যাম্পাসজুড়ে রাজনৈতিক উত্তাপ, অন্যদিকে প্রশাসনিক স্তরে বড়সড় পরিবর্তন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এবং ভারপ্রাপ্ত ফিনান্স অফিসারকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য তথা রাজ্যপাল আর এন রবি। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সেলিম বক্স মণ্ডল এবং ভারপ্রাপ্ত ফিনান্স অফিসার শিলাদিত্য চট্টোপাধ্যায়ের দায়িত্ব অবিলম্বে শেষ হবে। তাঁদের জায়গায় আগামী ছয় মাসের জন্য নতুন দুই আধিকারিককে দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশ জারি হয়েছে।
রাজ্যপালের এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ইতিমধ্যেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক মহলে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধি মেনে ভারপ্রাপ্ত পদে থাকার নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে আচার্যের নির্দেশ। তাঁর পর্যবেক্ষণ, অস্থায়ী বা ভারপ্রাপ্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে যে ছয় মাসের সীমা রয়েছে, তা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও কী ভাবে ‘অ্যাক্টিং’ ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছিল, সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে গত কয়েক দিন ধরেই নানা কারণে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। স্লোগান, দেওয়াল লিখন এবং ছাত্র বিক্ষোভে বার বার সরগরম হয়েছে ক্যাম্পাস। এর আগে জেনারেল বডি বা জিবি মিটিংকে কেন্দ্র করে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এবং এবিভিপির মধ্যে সংঘাতের ঘটনাও সামনে এসেছিল। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয় আলোচনা।
এই আবহের মধ্যেই প্রশাসনিক ক্ষেত্রে রাজ্যপালের এই পদক্ষেপকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে আচার্যের নির্দেশের মূল যুক্তি রাজনৈতিক পরিস্থিতি নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিধিবদ্ধ কাঠামো—এমনটাই নির্দেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজ্যপালের নির্দেশ অনুযায়ী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এবং ফিনান্স অফিসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থা চলা নিয়ে আপত্তি রয়েছে। স্থায়ী নিয়োগের জন্য যে বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন, সেই প্রক্রিয়া শুরু করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এগজিকিউটিভ কাউন্সিল যথাযথ পদক্ষেপ করেনি বলেও নির্দেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে রেজিস্ট্রারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সরকারি যোগাযোগ, নথিপত্র এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের সঙ্গে এই পদ সরাসরি যুক্ত। অন্যদিকে ফিনান্স অফিসারের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বাজেট, হিসাব-নিকাশ এবং আর্থিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এই দুই পদে স্থায়ী নিয়োগ না হয়ে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থা চালু থাকা নিয়ে আচার্যের আপত্তি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
নির্দেশে আরও বলা হয়েছে, ছয় মাসের নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রম করার পরেও যদি একই ভাবে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থা চালু থাকে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু প্রশাসনিক পরিচালনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শিক্ষাগত কার্যক্রম এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই কারণেই বর্তমান ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকদের দায়িত্ব শেষ করে নতুন করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের জন্য ড. দেবজিৎ দত্তকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ড. ইন্দ্রজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফিনান্স অফিসারের দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। অর্থাৎ আপাতত ছয় মাসের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও আর্থিক কাজকর্ম চালানোর দায়িত্ব এই দুই নতুন আধিকারিকের হাতে থাকবে।
তবে আচার্যের নির্দেশে শুধুমাত্র বর্তমান আধিকারিকদের সরিয়ে নতুন দু’জনকে দায়িত্ব দেওয়ার কথাই বলা হয়নি। একই সঙ্গে স্থায়ী রেজিস্ট্রার এবং স্থায়ী ফিনান্স অফিসার নিয়োগের বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের মেয়াদ মূলত অন্তর্বর্তী সময়ের জন্যই।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোয় স্থায়ী নিয়োগের প্রক্রিয়া যাতে আর দীর্ঘসূত্রিতায় না পড়ে, সেই বিষয়টির উপর জোর দিয়েছেন আচার্য। তাঁর নির্দেশে বলা হয়েছে, এগজিকিউটিভ কাউন্সিলকে স্থায়ী নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করতে হবে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশেও। ছাত্রছাত্রীদের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ থেকে শুরু করে শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের বিভিন্ন বিষয়, আর্থিক অনুমোদন, বাজেট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—সব ক্ষেত্রেই রেজিস্ট্রার ও ফিনান্স অফিসারের ভূমিকা রয়েছে। ফলে এই দুই পদে স্থায়ী ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করার নির্দেশকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এই প্রশাসনিক বদলের কোনও প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হলেও আচার্যের নির্দেশে মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং স্থায়ী নিয়োগের বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ার কথাই সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে প্রশাসনিক স্তরে দুই গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন নিঃসন্দেহে বড় ঘটনা। নতুন ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকদের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ কতটা মসৃণ হয়, সেই দিকেই এখন নজর থাকবে। একই সঙ্গে আগামী ছয় মাসের মধ্যে স্থায়ী রেজিস্ট্রার এবং স্থায়ী ফিনান্স অফিসার নিয়োগের প্রক্রিয়া কতটা এগোয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ক্যাম্পাসে যখন রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং ছাত্র সংগঠনগুলির বিক্ষোভের আবহ অব্যাহত, তখন প্রশাসনিক স্তরে এই পরিবর্তন যাদবপুরের পরিস্থিতিতে নতুন কোনও মোড় আনে কি না, তা সময়ই বলবে। আপাতত আচার্যের নির্দেশে দায়িত্ব বদলের পাশাপাশি স্থায়ী নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার উপরই জোর দেওয়া হয়েছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments