নিউজ ডেস্ক : নেপালের ভয়াবহ হরপা বানের ধাক্কায় যখন একের পর এক জনপদ বিপর্যস্ত, তখন ধ্বংসস্তূপের মাঝে উঠে এসেছে এমন এক ছবি, যা ছুঁয়ে গিয়েছে কলকাতার এক পশুপ্রেমীর মন। কাদামাটির উপর একা বসে থাকা একটি পোষ্য। চারপাশে বন্যার ধ্বংসের চিহ্ন। সামনে খাবার রাখা হলেও সে মুখ তুলছে না। হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মালিকের অপেক্ষায় যেন একই জায়গায় বসে কেটে যাচ্ছে তার সময়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সেই ছবি দেখেই নেপালের ওই অসহায় প্রাণীটিকে নিজের পরিবারের সদস্য করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কলকাতার বেহালার পশুপ্রেমী অর্চনা মিত্র। এবার সেই পোষ্যকে নেপাল থেকে বেহালায় ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি পথে উদ্যোগ শুরু করেছে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাব’।
নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা বহু এলাকা কার্যত বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। প্রবল জলের স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাড়িঘর, রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-সহ বিভিন্ন পরিকাঠামো। বহু মানুষের নিখোঁজ হওয়ার খবরও সামনে এসেছে। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই কিসুরি বাজার এলাকার একটি দৃশ্য সামাজিক ও সংবাদমাধ্যমে মানুষের নজর কেড়েছে। সেখানে ধ্বংসস্তূপ এবং কাদার মধ্যে একটি পোষ্যকে একা বসে থাকতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের দাবি, প্রাণীটি তার মালিককে হারিয়েছে। বন্যার পর থেকে তাকে ওই জায়গাতেই অপেক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে। আশপাশের মানুষ খাবার দিয়ে তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করলেও সে তাতে সাড়া দিচ্ছে না। খাবারের দিকে না তাকিয়ে তার চোখ যেন আটকে রয়েছে পরিচিত কারও ফিরে আসার আশায়। দুর্যোগের ভয়াবহতার মধ্যেও এই দৃশ্য মানুষের মনে তৈরি করেছে গভীর বিষণ্ণতা।
সেই ছবিই কলকাতার বেহালার বোসপাড়ার বাসিন্দা অর্চনা মিত্রের নজরে আসে। প্রাণীটির অবস্থার কথা জানতে পেরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। সিদ্ধান্ত নেন, সম্ভব হলে ওই পোষ্যকে নিজের কাছে এনে পরিবারের সদস্যের মতোই রাখবেন। শুধু সহানুভূতি প্রকাশ করেই থেমে থাকেননি তিনি। কী ভাবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে প্রাণীটিকে আইনসম্মত ভাবে কলকাতায় আনা যায়, সেই বিষয়ে সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করেন ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাব’-এর সঙ্গে।
অর্চনা মিত্রের পশুপ্রেমের নজির অবশ্য নতুন নয়। করোনাকালের কঠিন সময়ে কলকাতার রাস্তায় থাকা বহু অবলা প্রাণীর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। সেই সময় হ্যাম রেডিওর সদস্যরাও তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রয়োজনীয় চাল-ডাল-সহ বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন তাঁরা। ফলে অর্চনাদেবীর সঙ্গে এই সংগঠনের যোগাযোগও পুরনো।
দুর্যোগ মোকাবিলায় ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের ভূমিকার ইতিহাসও দীর্ঘ। বিশেষ করে ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পের সময় বাংলার হ্যাম রেডিও সদস্যদের কাজ এখনও বহু মানুষের মনে রয়েছে। ভয়াবহ ভূমিকম্পে নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিপর্যস্ত হওয়ার পর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে হ্যাম রেডিওর মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কাঠমান্ডু থেকে পোখরা এবং গোর্খার মতো এলাকায় জরুরি বার্তা আদানপ্রদানে তাঁদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবারও নেপালে গিয়ে দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল সংগঠনটি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আলাদা। জানা গিয়েছে, উদ্ধার ও সহায়তার জন্য দল পাঠানোর উদ্দেশ্যে কলকাতায় অবস্থিত নেপালের দূতাবাসের কাছে লিখিত অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই অনুমতি না পাওয়ায় সরাসরি নেপালে গিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়নি।
তবু সেখানেই থেমে যায়নি উদ্যোগ। অর্চনা মিত্রের ইচ্ছার কথা জানার পর বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাব। তবে সীমান্ত পেরিয়ে কোনও প্রাণীকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে একাধিক নিয়ম ও অনুমতির বিষয় রয়েছে। তাই আবেগের বশে কোনও পদক্ষেপ না করে সম্পূর্ণ আইন মেনেই এগোতে চাইছে সংগঠনটি।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য এখন একটাই—নেপালের সেই শোকাতুর পোষ্যটির জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা। তার মালিক বা পরিবারের খোঁজ পাওয়া গেলে পরিস্থিতি অবশ্য অন্য দিকে মোড় নিতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত তার কোনও স্বজনের সন্ধান মিলছে না, ততক্ষণ তাকে নিরাপদে রাখা এবং প্রয়োজনীয় যত্ন দেওয়াই অগ্রাধিকার।
ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের সম্পাদক অম্বরিশ নাগ বিশ্বাস জানিয়েছেন, ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের সময়ের মতো এবারও তাঁরা নেপালে গিয়ে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত ছিলেন। অনুমতি না মেলায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে অর্চনা দেবীর ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে ওই পোষ্যকে কলকাতায় আনার সম্ভাব্য সব আইনি পথ খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের পাশাপাশি কত অসহায় করে দিতে পারে প্রাণীদেরও—নেপালের কিসুরি বাজারের এই দৃশ্য যেন তারই এক মর্মস্পর্শী উদাহরণ। স্বজন হারানোর পরও একটি প্রাণীর অপেক্ষা, আর দূর কলকাতা থেকে তাকে আপন করে নেওয়ার এক মানুষের ইচ্ছা—দুই দেশের সীমান্তের মাঝেও তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য মানবিক সেতু। সেই সেতু পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত পোষ্যটি বেহালার নতুন ঠিকানায় পৌঁছতে পারে কি না, এখন নজর সেদিকেই।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments