
নিউজ ডেস্ক : কাশ্মীর মানেই এত দিন ছিল পাহাড়, বরফ, ডাল লেক আর শিকারার ছবি। বলিউডের পর্দায় বহুবার সেই সৌন্দর্যের প্রেমে পড়েছেন দর্শক। ‘কাশ্মীর কি কলি’ থেকে ‘কভি কভি’, ‘হাইওয়ে’ থেকে ‘রাজি’—দেশের একাধিক জনপ্রিয় ছবির গল্প ও দৃশ্যপটে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে উপত্যকা। কিন্তু এবার শুধু অন্যের সিনেমার শুটিং লোকেশন হয়ে থাকা নয়, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের মঞ্চ হিসাবেও নিজের পরিচয় তৈরি করতে চলেছে জম্মু-কাশ্মীর।
আগামী ৭ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো আয়োজিত হতে চলেছে ‘রং-এ-সিনেমা—ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অফ জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর’। জম্মু-কাশ্মীর সরকারের তথ্য ও জনসংযোগ দপ্তরের উদ্যোগে এই চলচ্চিত্র উৎসবকে ঘিরে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।
আয়োজকদের দাবি, এই উৎসবের জন্য বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ থেকে ১১০০-র বেশি ছবি জমা পড়েছিল। সেখান থেকে বাছাই করে নেওয়া হয়েছে ৪১টি দেশের ১৩৫টি ছবি। অর্থাৎ প্রথম আয়োজনেই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের একটি বড় পরিসরকে কাশ্মীরের মাটিতে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বাছাই হওয়া ছবির তালিকাতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। ভারতের ৬৪টি ছবি জায়গা পেয়েছে উৎসবে। এর পাশাপাশি ফ্রান্সের ১৩টি এবং ইরানের ৮টি ছবিও প্রতিযোগিতায় থাকছে। তুরস্ক, জার্মানি, রাশিয়া, স্পেন, ব্রাজিল, আমেরিকা এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছবিও প্রদর্শিত হবে।
তবে এই চলচ্চিত্র উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজন সম্ভবত হতে চলেছে ডাল লেকের ভাসমান সিনেমা পর্দা। অর্থাৎ সাধারণ সিনেমা হলের চার দেওয়ালের মধ্যে বসে নয়, শিকারা চড়ে ডাল লেকে ঘুরতে ঘুরতেই সিনেমা দেখার সুযোগ পাবেন দর্শক ও পর্যটকেরা।
কাশ্মীরের বিখ্যাত ডাল লেকের জলে ভাসবে বড় পর্দা। চারপাশে থাকবে পাহাড় ও জলের অপরূপ দৃশ্য, আর সামনে চলবে সিনেমা। ফলে চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতার সঙ্গে কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও একসঙ্গে উপভোগ করতে পারবেন দর্শকেরা। উৎসবের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ হিসাবেই এই আয়োজনকে দেখা হচ্ছে।
শুধু ডাল লেকেই নয়, শ্রীনগরের SKICC এবং INOX PVR-এ হবে মূল অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। পাশাপাশি জম্মু এবং গুলমার্গেও থাকছে বিশেষ স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা। ফলে উৎসবের পরিসর শুধু শ্রীনগরকেন্দ্রিক থাকছে না।
উৎসবের জুরি বোর্ডেও রয়েছে আন্তর্জাতিক এবং ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের একাধিক পরিচিত নাম। জুরি বোর্ডের নেতৃত্বে থাকছেন খ্যাতনামা চিত্রগ্রাহক ও পরিচালক সন্তোষ শিবন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন অস্কারজয়ী সাউন্ড ডিজাইনার রসুল পুকুট্টি। পাশাপাশি জার্মান চলচ্চিত্র কিউরেটর ডরোথি ভেনার-সহ আরও বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব জুরি বোর্ডে থাকছেন।
আয়োজকদের পরিকল্পনা অবশ্য শুধু সিনেমা প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উৎসবকে চলচ্চিত্র নিয়ে মতবিনিময় এবং নতুন প্রতিভা তুলে ধরার একটি বড় মঞ্চ হিসাবেও গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। থাকছে মাস্টারক্লাস, ওয়ার্কশপ, আলোচনা এবং ইন্ডাস্ট্রি সেশন। বিশেষ করে তরুণ এবং স্থানীয় চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য এই পর্বগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কাশ্মীরের স্থানীয় প্রতিভাকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে এই উৎসবের। সেই ভাবনা থেকেই রাখা হয়েছে বিশেষ ‘J&K Select’ বিভাগ। এই বিভাগে জম্মু-কাশ্মীরের গল্প, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং স্থানীয় চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাজকে বিশেষ ভাবে তুলে ধরা হবে।
পুরস্কারের ক্ষেত্রেও থাকছে বড় অঙ্কের অর্থমূল্য। মোট ৯টি বিভাগে ৯৬ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। তার মধ্যে সেরা ছবির জন্য থাকছে ২৫ লক্ষ টাকা। সেরা পরিচালক এবং সেরা ডেবিউ পরিচালকের পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে ১৫ লক্ষ টাকা করে।
আয়োজকদের মতে, এই উৎসবের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরের চলচ্চিত্র সংস্কৃতিকে নতুন পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এত দিন আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় চলচ্চিত্রের কাছে কাশ্মীর মূলত একটি আকর্ষণীয় শুটিং লোকেশন হিসাবেই পরিচিত ছিল। এবার সেই পরিচয়ের বাইরে গিয়ে উপত্যকাকে নিজস্ব গল্প, শিল্পী এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বরাবরই চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আকর্ষণ করেছে। কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে সেই সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ছবি এক জায়গায় দেখার সুযোগ যেমন তৈরি হবে, তেমনই স্থানীয় নির্মাতাদের কাছেও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির দরজা খুলতে পারে।
আর ডাল লেকের ভাসমান পর্দা এই পুরো আয়োজনকে নিঃসন্দেহে আলাদা মাত্রা দেবে। শিকারা, পাহাড়, জলের ঢেউ আর সিনেমা—এই চার উপাদানের মেলবন্ধন পর্যটকদের কাছেও নতুন আকর্ষণ তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ৭ থেকে ১০ সেপ্টেম্বরের ‘রং-এ-সিনেমা’ শুধু একটি চলচ্চিত্র উৎসব নয়, জম্মু-কাশ্মীরকে চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক মানচিত্রে নতুন ভাবে তুলে ধরার একটি উদ্যোগ হিসাবেও দেখা হচ্ছে।
এবার তাই কাশ্মীরের উপত্যকায় শুধু পাহাড়, হ্রদ আর শিকারার দৃশ্য নয়—ডাল লেকের জলে ভাসবে সিনেমার পর্দা, আর ‘ভূস্বর্গ’ রাঙবে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের রঙে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments