Last updated: September 4th, 2026 at 12:33 pm

নিউজ ডেস্ক; সরকারি নথিতে এখনও ‘নোম্যান্স ল্যান্ড’ হিসেবে পরিচিত হুগলি ও হলদি নদীর মোহনার কাছের নয়াচর দ্বীপে প্রথম বার সম্পূর্ণ জনসমীক্ষার কাজ শেষ হল। প্রায় আশি বছরের পুরনো এই দ্বীপে কয়েক হাজার মানুষের বসবাস হলেও এত দিন তাঁদের বসতবাড়ি, পরিবারের সংখ্যা এবং জনসংখ্যা নিয়ে প্রশাসনের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য ছিল না। বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে সেই সমীক্ষা। প্রশাসনের উদ্যোগে চালানো এই কাজের মাধ্যমে নয়াচরের বাসিন্দাদের জীবনযাপন, বসতবাড়ি এবং পারিবারিক পরিচয় সংক্রান্ত নানা তথ্য প্রথম বার সরকারি নথিতে উঠে এল।
হলদিয়া ব্লক প্রশাসনের উদ্যোগে গত ৩১ অগস্ট নয়াচরে জনসমীক্ষার কাজ শুরু হয়েছিল। টানা পাঁচ দিন ধরে চলে সমীক্ষা। ব্লক প্রশাসনের ১৪ সদস্যের একটি দলকে দু’টি ভাগে ভাগ করে দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। দুর্গম ও নদীবেষ্টিত এলাকায় পৌঁছে প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন সমীক্ষক দলের সদস্যেরা। বাড়িতে কত জন সদস্য রয়েছেন, পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কেমন, বসতবাড়ির অবস্থান কোথায়—এই ধরনের একাধিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।
সমীক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রতিটি বাড়িকে পৃথক নম্বরের মাধ্যমে চিহ্নিত করা। এর ফলে নয়াচরের কোন এলাকায় কতগুলি বাড়ি রয়েছে, কোন পরিবার কোথায় বসবাস করে এবং দ্বীপের কোন অংশে জনবসতি বেশি, তার একটি সুস্পষ্ট চিত্র তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, এত দিন বিচ্ছিন্ন ভাবে থাকা পরিবারগুলিকে একই সমীক্ষার আওতায় আনার ফলে দ্বীপের সামগ্রিক জনসংখ্যা ও বসতির পরিমাণ সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, নয়াচর দ্বীপের আয়তন প্রায় ৩১ কিলোমিটার লম্বা এবং ১০ কিলোমিটার চওড়া। বিস্তীর্ণ এই এলাকায় আনুমানিক ৪ হাজার পরিবারের বসবাস। মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। তবে দ্বীপের সর্বত্র জনবসতি সমান নয়। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করেন মৎস্যজীবী পরিবারগুলি। তাঁদের জীবিকা মূলত নদী ও জলজ সম্পদের উপর নির্ভরশীল। মাছ ধরা, মাছ সংরক্ষণ এবং নদীকেন্দ্রিক নানা কাজকে ঘিরেই বহু পরিবারের জীবনযাপন গড়ে উঠেছে।
নয়াচরের টুপিঘর, বড় খাল, পকমিল সাইট, খেজুরতলা, বাঁধের মাথা এবং বাবলাতলা এলাকায় জনবসতি তুলনামূলক বেশি। সমীক্ষক দল এই সব এলাকায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করেছে। কোথাও নদীর ধারে, কোথাও বাঁধ সংলগ্ন এলাকায় আবার কোথাও দ্বীপের ভিতরের অংশে গড়ে উঠেছে বসতি। যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রশাসনের পক্ষে প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছনো সহজ ছিল না। তবু নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে দুই দলে ভাগ হয়ে সমীক্ষার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
নয়াচরের বাসিন্দাদের কাছে এই সমীক্ষা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি পরিষেবা, পরিচয় এবং প্রশাসনিক নথির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। সরকারি খাতায় কোনও এলাকা ‘নোম্যান্স ল্যান্ড’ হিসেবে চিহ্নিত থাকলে সেখানকার বাসিন্দাদের প্রশাসনিক স্বীকৃতি, পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ এবং সরকারি প্রকল্পের আওতায় আসা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। সেই জায়গায় প্রথম বার নিয়মিত প্রশাসনিক সমীক্ষা হওয়ায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে।
হলদিয়ার বিডিও মৃত্যুঞ্জয় কাজী জানিয়েছেন, প্রশাসনিক নিয়ম মেনেই নয়াচর দ্বীপে সমীক্ষার কাজ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, কোনও মানুষই এই সমীক্ষার বাইরে থাকবেন না। পাঁচ দিন ধরে দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় সমীক্ষা চালিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সমীক্ষায় পাওয়া তথ্য ভবিষ্যতে দ্বীপের বাসিন্দাদের প্রয়োজন, বসতির পরিমাণ এবং প্রশাসনিক পরিকল্পনা নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।
নয়াচরের বাসিন্দা ও মৎস্যজীবী সঞ্জয় দাস বলেন, সরকারি সমীক্ষার অন্তর্ভুক্ত হতে পেরে তাঁরা খুশি। সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, বিষয়টি তাঁদের কাছে আনন্দের। সমীক্ষার কাজে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনকে সব রকম ভাবে সাহায্য করেছেন বলেও জানান তিনি। তাঁর কথায়, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা এই দ্বীপে বসবাস করছেন। কিন্তু তাঁদের জীবনযাপন ও পরিবারের সঠিক তথ্য সরকারি ভাবে নথিভুক্ত হওয়ার সুযোগ এত দিন হয়নি।
প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্থানীয় বাসিন্দারা শুধু তথ্য সংগ্রহের কাজ হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের মতে, সমীক্ষার মাধ্যমে নয়াচরের মানুষের অস্তিত্ব এবং বসবাসের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট ভাবে সামনে এল। ভবিষ্যতে সরকারি পরিষেবা, পানীয় জল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রাস্তা, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা তৈরি হলে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। যদিও সমীক্ষার পর অবিলম্বে কী কী পরিষেবা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট ঘোষণা করা হয়নি।
প্রশাসনিক মহলের বক্তব্য, কোনও এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করতে হলে প্রথমে সেই এলাকার মানুষের সংখ্যা, বসতির বিস্তার এবং পরিবারের প্রকৃত তথ্য জানা জরুরি। নয়াচরের ক্ষেত্রে সেই ভিত্তিগত কাজই প্রথম বার সম্পন্ন হল। সমীক্ষার তথ্য যাচাই করে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা হবে কি না, তা নিয়ে এখন নজর রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
নদীর মোহনায় অবস্থিত নয়াচর বরাবরই ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে আলাদা গুরুত্ব বহন করে এসেছে। এক দিকে নদী ও জলাভূমি, অন্য দিকে বিচ্ছিন্ন জনবসতি—সব মিলিয়ে দ্বীপটির জীবনযাত্রা মূল ভূখণ্ডের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। এই পরিস্থিতিতে পাঁচ দিনের সমীক্ষা শেষ হওয়াকে প্রশাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছে। প্রথম বার প্রতিটি বাড়ি পৃথক নম্বরের আওতায় আসায় নয়াচরের মানুষের পরিচয় ও বসতির একটি সংগঠিত তথ্যভান্ডার তৈরি হল। এখন সেই তথ্য ভবিষ্যতে কী ভাবে কাজে লাগানো হয়, তার দিকেই তাকিয়ে দ্বীপবাসী।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments