
নিউজ ডেস্ক; টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে দুর্বল হয়ে পড়েছিল মাটির দেওয়াল। মঙ্গলবার ভোরে আচমকাই বিকট শব্দে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল গোঘাটের কামচে এলাকার একটি মাটির বাড়ি। বাড়িটির ভিতরের অংশ ধসে পড়ায় মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। সেই সময় বাড়ির ভিতরেই ছিলেন বৃদ্ধ পরেশ সাঁতরা এবং তাঁর স্ত্রী। দেওয়াল ভেঙে পড়ার শব্দ শুনে কোনও রকমে ঘর থেকে বেরিয়ে আসায় বড়সড় দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পান তাঁরা। কিন্তু প্রাণে বাঁচলেও মাথার উপর ছাদটুকু আর রইল না। আপাতত স্থানীয় একটি মন্দিরের বারান্দাতেই আশ্রয় নিতে হয়েছে অসহায় বৃদ্ধ দম্পতিকে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েক দিন ধরেই গোঘাট এবং আরামবাগ মহকুমার বিস্তীর্ণ এলাকায় কখনও মাঝারি, কখনও আবার মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। অবিরাম বৃষ্টিতে মাটির বাড়িগুলির দেওয়ালে জল ঢুকে সেগুলি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। কামচে এলাকার পরেশ সাঁতরার বাড়িটিও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বাইরে থেকে বাড়িটি কোনও রকমে দাঁড়িয়ে থাকলেও ভিতরের মাটির দেওয়ালগুলির অবস্থা যে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল, তা বুঝতে পারেননি পরিবারের সদস্যেরা।
মঙ্গলবার ভোরে আচমকাই ঘটে বিপত্তি। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, একটি বিকট শব্দের সঙ্গে বাড়ির ভিতরের অংশের মাটির দেওয়াল ভেঙে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন পরেশ ও তাঁর স্ত্রী। পরিস্থিতি বুঝে তাঁরা দ্রুত বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসেন। ফলে ধসে পড়া অংশের নীচে চাপা পড়ার মতো বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়। তবে বাড়িটির অন্য অংশও যে নিরাপদ নয়, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে দুর্ঘটনার পর।
স্থানীয়দের বক্তব্য, বাড়িটির বাকি অংশ এখনও অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। লাগাতার বৃষ্টির কারণে মাটির দেওয়াল আরও নরম হয়ে গেলে সেটিও যে কোনও সময় ভেঙে পড়তে পারে। শুধু বাড়ির বাসিন্দারাই নয়, পাশের বাড়িগুলির বাসিন্দাদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। কোনও অংশ ধসে পড়ে সংলগ্ন বাড়ির ক্ষতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তাঁরা। তাই আপাতত ওই বাড়িতে ফিরে গিয়ে বসবাস করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে বৃদ্ধ দম্পতির পক্ষে।
এক রাতের মধ্যে মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে এখন কার্যত দিশেহারা পরেশ সাঁতরা ও তাঁর পরিবার। সংসারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কোথায় রাখা যাবে, কী ভাবে আগামী কয়েক দিন কাটবে, সেই চিন্তাই এখন তাঁদের সামনে সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষার মধ্যে মাটির বাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নীচে থাকা সম্ভব নয়। সেই কারণেই স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে এসে আপাতত তাঁদের জন্য মন্দিরে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন।
স্থানীয়দের এই উদ্যোগে কিছুটা স্বস্তি পেলেও স্থায়ী সমাধান এখনও অধরা। মন্দিরের বারান্দায় সাময়িক ভাবে রাত কাটানো গেলেও দীর্ঘদিন সেখানে থাকা সম্ভব নয়। বিশেষ করে বৃদ্ধ দম্পতির বয়স এবং বৃষ্টির পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে দ্রুত প্রশাসনিক সহায়তার প্রয়োজন বলে মনে করছেন এলাকার বাসিন্দারা।
বাড়ি ভেঙে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই সকালে ঘটনাস্থলে পৌঁছন স্থানীয় শাসকদলের নেতারাও। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন তাঁরা। কী ভাবে বাড়িটি ভেঙে পড়ল এবং পরিবারের বর্তমান পরিস্থিতি কী, সে বিষয়ে খোঁজ নেন। অসহায় পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু ঘটনাস্থলে গিয়ে খোঁজ নেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রশাসনের তরফে দ্রুত ত্রিপল, প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা দরকার। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কারণ, পরেশ সাঁতরার মতো আর্থিক ভাবে দুর্বল পরিবারের কাছে বাড়ি মেরামত বা নতুন করে তৈরি করার খরচ বহন করা অত্যন্ত কঠিন।
গোঘাটের কামচে এলাকাতেই শুধু নয়, লাগাতার বর্ষণের কারণে আরামবাগ মহকুমা এবং সংলগ্ন এলাকার একাধিক কাঁচা ও মাটির বাড়ির অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় ধরে মাটির দেওয়ালে জল ঢুকলে তার ধারণক্ষমতা কমে যায়। ফলে বৃষ্টি থামার পরেও বাড়ি ধসে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়। স্থানীয়দের মতে, পুরনো ও দুর্বল মাটির বাড়িগুলিকে দ্রুত চিহ্নিত করে প্রশাসনের তরফে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে রাত থেকেই আরামবাগ মহকুমা এবং আশপাশের এলাকায় দফায় দফায় প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ভোরের দিকে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কম মনে হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফের শুরু হয় অবিরাম বৃষ্টিপাত। ফলে ইতিমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়া কাঁচা বাড়িগুলি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিচু এলাকার বাসিন্দারাও জল জমার আশঙ্কায় রয়েছেন।
বর্ষার মরসুমে গ্রামবাংলার বহু পরিবারের একমাত্র ভরসা এখনও মাটির বাড়ি। বছরের পর বছর সেই বাড়িতেই কোনও রকমে সংসার চলে। কিন্তু কয়েক দিনের লাগাতার বৃষ্টি কখনও কখনও সেই আশ্রয়টুকুকেও বিপন্ন করে তোলে। পরেশ সাঁতরার পরিবারের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছে। বড় বিপদ এড়ানো গেলেও এখন তাঁদের সামনে নতুন করে জীবন গুছিয়ে নেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য, প্রশাসনের তরফে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো গেলে অন্তত সাময়িক দুর্ভোগ কিছুটা কমানো সম্ভব। ত্রিপল, শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা এখন সবচেয়ে জরুরি। পরবর্তী সময়ে বাড়ি পুনর্নির্মাণ বা পুনর্বাসনের জন্য সরকারি সাহায্য মিলবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন।
এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নজর এখন কত দ্রুত ওই পরিবারের কাছে পৌঁছয়, সেটাই দেখার। কারণ বৃষ্টি এখনও পুরোপুরি থামেনি। ফলে বাড়িটির অবশিষ্ট অংশ যেমন বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে, তেমনই আশপাশের আরও দুর্বল মাটির বাড়িগুলি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। একটি দুর্ঘটনা বড় প্রাণহানিতে পরিণত হওয়ার আগেই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments