
নিউজ ডেস্ক : বর্ষা মানেই এক দিকে স্বস্তির বৃষ্টি, অন্য দিকে বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষ করে অপরিশোধিত জল ও দূষিত খাবারের মাধ্যমে ছড়ানো বিভিন্ন জলবাহিত রোগ এই সময় মাথাচাড়া দেয়। তার মধ্যে টাইফয়েড অন্যতম। হঠাৎ জ্বর, পেটের গোলমাল কিংবা শরীর খারাপকে অনেকেই সাধারণ ভাইরাল জ্বর বলে ধরে নেন। কিন্তু দিনের পর দিন জ্বর না কমলে বিষয়টি হালকা ভাবে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ টাইফয়েড ভাইরাসজনিত অসুখ নয়। এর জন্য দায়ী Salmonella Typhi নামের একটি ব্যাকটেরিয়া।
দূষিত জল বা খাবারের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া শরীরে ঢুকতে পারে। সময়মতো রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু না হলে টাইফয়েড থেকে গুরুতর জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বর্ষায় খাবার ও পানীয় নিয়ে একটু বেশি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, শিশু ও তরুণদের মধ্যে টাইফয়েডের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য সমস্যা। ভারতে প্রতি বছর এই রোগে বহু মানুষ আক্রান্ত হন। ফলে বর্ষার মরসুমে জ্বরের সঙ্গে পেটের সমস্যা দেখা দিলে তা ভাইরাল জ্বর ধরে নিয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা না করাই ভাল।
কলকাতার আনন্দপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিনের চিকিৎসক ডঃ দিব্যেন্দু মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শ অনুযায়ী, টাইফয়েড প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিরাপদ জল, পরিষ্কার খাবার এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি।
টাইফয়েডের মূল কারণ Salmonella Typhi ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। সাধারণত সংক্রমিত ব্যক্তির মল দ্বারা দূষিত জল বা খাবারের মাধ্যমে এই জীবাণু অন্য মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যেখানে পানীয় জলের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সমস্যা রয়েছে, কিংবা খাবার তৈরি ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি ঠিক মতো মানা হয় না, সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
বর্ষায় এই ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বৃষ্টির জল, নিকাশি ব্যবস্থা এবং পানীয় জলের উৎসের মধ্যে দূষণের সম্ভাবনা তৈরি হলে জলবাহিত রোগ ছড়ানোর পরিবেশ তৈরি হয়।
তাই রাস্তার ধারের শরবত, অপরিষ্কার জলের বরফ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাবার কিংবা ঠিক মতো ধোয়া হয়নি এমন কাঁচা খাবার থেকে সতর্ক থাকা জরুরি।
১. রাস্তার খাবার, কাঁচা চাটনি ও স্যালাড
ফুচকা, চাট, শরবত কিংবা রাস্তার বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে দেওয়া কাঁচা পেঁয়াজ, স্যালাড ও চাটনি বর্ষায় বাড়তি সতর্কতার বিষয়। এগুলি কী জল দিয়ে ধোয়া হয়েছে, কী পরিবেশে রাখা হয়েছে কিংবা পরিবেশনের সময় কী ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়েছে, তা সব সময় জানা সম্ভব নয়।
তাই বর্ষাকালে রাস্তার খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। বাড়িতে পরিষ্কার পরিবেশে তৈরি তাজা খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
২. কাঁচা বা ভাল ভাবে রান্না না করা মাছ ও সামুদ্রিক খাবার
মাছ বা সামুদ্রিক খাবার ঠিক মতো সংরক্ষণ এবং রান্না না করা হলে বিভিন্ন জীবাণুর সংক্রমণের আশঙ্কা থাকতে পারে। তাই মাছ কিংবা অন্য কোনও সামুদ্রিক খাবার খাওয়ার আগে ভাল ভাবে রান্না করে নেওয়া উচিত।
অপরিষ্কার পরিবেশে রাখা কাঁচা মাছ দীর্ঘ সময় বাইরে ফেলে রাখাও ঠিক নয়।
৩. রাস্তার ধারে বিক্রি হওয়া কাটা ফল
বর্ষায় রাস্তার ধারে কেটে রাখা ফলও বিপদের কারণ হতে পারে। খোলা জায়গায় দীর্ঘ সময় পড়ে থাকা ফলের উপর ধুলো-ময়লা জমতে পারে। দূষিত জল বা অপরিষ্কার ছুরি ও পাত্রের সংস্পর্শেও জীবাণু ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে।
তাই কাটা ফল কেনার বদলে গোটা ফল কিনে বাড়িতে ভাল করে ধুয়ে খাওয়াই নিরাপদ। ফল কাটার আগে হাত ও ব্যবহার করা পাত্র পরিষ্কার রাখাও জরুরি।
৪. পাস্তুরাইজড নয় এমন দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
কাঁচা বা অপরিশোধিত দুধে বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণু থাকার সম্ভাবনা থাকে। একই ভাবে নিরাপদ প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়নি এমন কিছু দুগ্ধজাত খাবার থেকেও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই সম্ভব হলে পাস্তুরাইজড দুধ এবং নিরাপদ ভাবে প্রস্তুত ও সংরক্ষিত দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
৫. ভাল ভাবে পরিষ্কার বা রান্না না করা কাঁচা শাক-পাতা
লেটুস, পালং, ধনেপাতা, বাঁধাকপি-সহ বিভিন্ন শাক-সবজি সরাসরি কাঁচা খেলে সেগুলি ভাল ভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে কি না, সেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দূষিত জল দিয়ে ধোয়া হলে বা মাটি ও অন্যান্য দূষিত পদার্থ লেগে থাকলে জীবাণু খাবারের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
তাই কাঁচা শাক-পাতা খাওয়ার আগে পরিষ্কার জলে ভাল করে ধুতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী রান্না করেও খাওয়া যেতে পারে।
টাইফয়েড প্রতিরোধে নিরাপদ পানীয় জল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তার ধারের শরবত কিংবা এমন কোনও পানীয় না খাওয়াই ভাল, যার জল কোথা থেকে এসেছে তা জানা নেই। বাড়িতে পানীয় জলের উৎস নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
জলের বোতল নিয়মিত পরিষ্কার করা উচিত। বাইরে থেকে খাবার বা পানীয় গ্রহণের আগে এবং শৌচাগার ব্যবহারের পরে সাবান দিয়ে ভাল ভাবে হাত ধোয়া সংক্রমণ প্রতিরোধের অন্যতম সহজ উপায়।
সবজি রান্নার আগে এবং ফল খাওয়ার আগে পরিষ্কার জলে ভাল করে ধুয়ে নেওয়াও জরুরি। কেটে রাখা ফল বা সবজি দীর্ঘ সময় বাইরে রেখে না দেওয়াই ভাল।
সাধারণ ভাইরাল জ্বর এবং টাইফয়েডের উপসর্গের মধ্যে কিছুটা মিল থাকতে পারে। তাই শুধু উপসর্গ দেখে নিজে থেকে রোগ নির্ণয় করা ঠিক নয়। কয়েক দিন ধরে জ্বর থাকা, পেটের সমস্যা, দুর্বলতা বা অন্য কোনও অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে তিন দিনেও জ্বর না কমলে নিজের মতো করে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়াই নিরাপদ। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক পরীক্ষা করিয়ে টাইফয়েডের সম্ভাবনা যাচাই করতে পারেন।
টাইফয়েড প্রতিরোধে টিকাও রয়েছে। কার জন্য এবং কখন টিকা প্রয়োজন, তা বয়স ও স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা উচিত।
সব মিলিয়ে, বর্ষায় টাইফয়েড এড়ানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হল সতর্কতা। নিরাপদ জল পান, পরিষ্কার খাবার খাওয়া, রাস্তার অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়ানো এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আর জ্বরকে শুধুমাত্র ‘ভাইরাল’ ভেবে দিনের পর দিন ফেলে না রেখে প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
গুরুত্বপূর্ণ: টাইফয়েডের চিকিৎসা ও পরীক্ষার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শই চূড়ান্ত। কোনও উপসর্গ দেখে নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য ওষুধ শুরু করবেন না।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments