
নিউজ ডেস্ক; স্কুলের ছাদে রাখা পানীয় জলের ট্যাঙ্ক। আর সেই ট্যাঙ্কের ভিতরেই বেশ কয়েক দিন ধরে পড়ে রয়েছে একটি মৃত পাখি। অভিযোগ, পাখিটি পচে যাওয়ায় গোটা এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে দুর্গন্ধ। আরও গুরুতর অভিযোগ, ওই ট্যাঙ্কের জলই ব্যবহার করা হচ্ছে পড়ুয়াদের পানীয় জল হিসেবে। এমনকি সেই জল দিয়েই মিড ডে মিল রান্না করা হচ্ছে বলেও দাবি অভিভাবকদের। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ের একটি প্রাথমিক স্কুলে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার স্কুল চত্বরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখান গ্রামবাসী ও অভিভাবকদের একাংশ।
ঘটনাটি ক্যানিং সার্কেলের গোলাদোহরা কুসুমমণি প্রাথমিক স্কুলের। স্থানীয় বাসিন্দা এবং অভিভাবকদের অভিযোগ, স্কুলের পানীয় জলের ড্রাম বা ট্যাঙ্কের মধ্যে একটি পাখি বেশ কয়েক দিন আগে মারা পড়ে যায়। কিন্তু সেটি সময়মতো পরিষ্কার করা হয়নি। ফলে মৃত পাখিটি দীর্ঘ সময় জলের মধ্যে পড়ে থাকার কারণে জল দূষিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই জল ব্যবহার করেই স্কুলের পড়ুয়ারা পানীয় জল খাচ্ছে এবং রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকেই অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ছোট ছোট পড়ুয়াদের জন্য ওই জল ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এলাকায়। তাঁদের বক্তব্য, স্কুলে পড়ুয়াদের নিরাপদ পানীয় জল এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অথচ পানীয় জলের আধারে মৃত পাখি পড়ে থাকার মতো ঘটনা কী ভাবে এত দিন নজর এড়িয়ে গেল, সেই প্রশ্নই তুলেছেন তাঁরা।
অভিভাবক তারক হালদার এবং শিবপ্রসাদ নস্কর-সহ স্থানীয় কয়েক জন জানান, তাঁরা কয়েক দিন ধরেই বিষয়টি লক্ষ্য করছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, জলের আধারের মধ্যে পাখিটি পড়ে থাকলেও দ্রুত সেটি সরিয়ে জল পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর ফলে জল ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। স্কুলের পড়ুয়ারা প্রতিদিন ওই জল ব্যবহার করছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
অভিভাবকদের আরও অভিযোগ, শুধু পানীয় জল হিসেবেই নয়, স্কুলের মিড ডে মিল রান্নার ক্ষেত্রেও ওই জল ব্যবহার করা হচ্ছে। স্কুলে প্রতিদিন বহু শিশুর জন্য খাবার রান্না হয়। সেই খাবার তৈরিতে দূষিত জল ব্যবহার করা হয়ে থাকলে তা পড়ুয়াদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
এক অভিভাবকের কথায়, বিষয়টি সামনে আসার পর তাঁরা স্কুল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, স্কুল কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিয়ে সমস্যাটির সমাধানে এগিয়ে আসেনি। অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের তরফে কার্যকর পদক্ষেপ না হওয়াতেই শেষ পর্যন্ত অভিভাবক ও গ্রামবাসীদের একাংশ স্কুলে এসে বিক্ষোভ দেখানোর সিদ্ধান্ত নেন।
ঘটনার জেরে স্কুল চত্বরে উত্তেজনার পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিভাবকেরা স্কুলের পানীয় জলের ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে ওই জল ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। জলের ট্যাঙ্ক বা ড্রাম পরিষ্কার করে জীবাণুমুক্ত করার পাশাপাশি বিকল্প নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে মিড ডে মিল রান্নার ক্ষেত্রেও নিরাপদ জল ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা প্রশাসনের তরফে পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন বলে দাবি তাঁদের।
এই ঘটনায় স্কুলের পরিকাঠামো এবং পরিচালন ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গোলাদোহরা কুসুমমণি প্রাথমিক স্কুলে মোট তিন জন শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এক জন প্যারা-টিচার। স্কুলের প্রশাসনিক ও দৈনন্দিন কাজকর্মের একটা বড় অংশ কার্যত তাঁর উপরেই নির্ভরশীল বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক গোবিন্দ মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। অসুস্থতার কারণে তিনি নিয়মিত স্কুলে আসতে পারেন না বলে জানা গিয়েছে। ফলে প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে স্কুল পরিচালনা এবং বিভিন্ন বিষয় নজরদারির দায়িত্ব কী ভাবে সামলানো হচ্ছে, সেই প্রশ্নও উঠেছে। বিশেষ করে পানীয় জলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়মিত পরিদর্শন বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা ছিল কি না, তা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্কুলে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ থাকা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন স্কুলে এসে তারা যে জল পান করছে বা খাবার খাচ্ছে, তা স্বাস্থ্যসম্মত কি না, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার। জলের আধারে মৃত পাখি পড়ে থাকার ঘটনা শুধু অপরিচ্ছন্নতার অভিযোগ নয়, বরং স্কুলের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপরও প্রশ্ন তুলে দেয়।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—মিড ডে মিল। সরকারি এই প্রকল্পের আওতায় স্কুলপড়ুয়াদের পুষ্টিকর রান্না করা খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। খাবারের গুণমানের পাশাপাশি রান্নার জল, খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণ এবং রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও নজরদারি প্রয়োজন। কোনও ভাবে দূষিত জল রান্নায় ব্যবহৃত হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ুয়াদের স্বাস্থ্যের উপর পড়তে পারে। তাই অভিভাবকেরা বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনার দাবি জানিয়েছেন।
যদিও এই ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার কারণে স্কুলে না আসায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়। কর্তৃপক্ষের তরফে মৃত পাখিটি কত দিন ধরে জলের আধারে ছিল, সেই জল কী ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং অভিযোগ সামনে আসার পরে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিভাবকদের বিক্ষোভের পর প্রশাসনের তরফে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে কি না, সে দিকেও নজর রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। জলের গুণমান পরীক্ষা করতে হবে এবং প্রয়োজনে পানীয় জলের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি স্কুলের জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছে কি না, তারও নজরদারি প্রয়োজন।
ঘটনার পর থেকেই অভিভাবকদের মধ্যে মূল উদ্বেগ একটাই—তাঁদের সন্তানরা যে জল খাচ্ছে এবং যে খাবার খাচ্ছে, তা আদৌ নিরাপদ তো? ছোট শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক ভাবে কম হওয়ায় দূষিত জল বা খাবার থেকে সংক্রমণের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে বিষয়টি নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে।
ক্যানিংয়ের এই প্রাথমিক স্কুলের ঘটনা তাই শুধু একটি স্কুলের পরিচ্ছন্নতার সমস্যা হিসেবে দেখছেন না স্থানীয়রা। তাঁদের বক্তব্য, জেলার সমস্ত স্কুলে পানীয় জলের ট্যাঙ্ক, রান্নার জল এবং মিড ডে মিলের রান্নাঘর নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বর্ষাকালে জলদূষণ ও সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ে। সেই সময়ে আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন, গোলাদোহরা কুসুমমণি প্রাথমিক স্কুলে ব্যবহৃত জল পরীক্ষা করে কী পাওয়া যায় এবং অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয়। মৃত পাখি উদ্ধারের পর জলাধারটি কী ভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে, পড়ুয়াদের জন্য বিকল্প পানীয় জলের ব্যবস্থা হয়েছে কি না এবং মিড ডে মিলের রান্নায় ওই জল ব্যবহারের অভিযোগ সত্য কি না—এই বিষয়গুলির উত্তরই আপাতত খুঁজছেন অভিভাবকেরা।
স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এখনও সামনে না এলেও, শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি যে কোনও ভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। স্কুলের পানীয় জল এবং মিড ডে মিল—দুই ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। ক্যানিংয়ের এই ঘটনায় প্রশাসন কত দ্রুত পদক্ষেপ করে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকেরা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments