Homeপূর্ব মেদিনীপুরদিঘাদিঘার হোটেলে নিম্নমানের খাবারের অভিযোগ, ২০টিতে হানা দিয়ে ১২টিকে আইনি নোটিস

দিঘার হোটেলে নিম্নমানের খাবারের অভিযোগ, ২০টিতে হানা দিয়ে ১২টিকে আইনি নোটিস

নিউজ ডেস্ক; পর্যটন মরসুমে দিঘায় খাবারের মান নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠল। নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের অভিযোগে সৈকত শহরের ১২টি হোটেল ও
resizeplus_Screenshot 2026-09-02 163231_edited

নিউজ ডেস্ক; পর্যটন মরসুমে দিঘায় খাবারের মান নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠল। নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের অভিযোগে সৈকত শহরের ১২টি হোটেল ও রেস্তোরাঁকে আইনি নোটিস ধরাল পূর্ব মেদিনীপুর জেলা খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর। মঙ্গলবার দিঘার মোট ২০টি হোটেল-রেস্তোরাঁয় একযোগে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। অভিযানে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে পর্যটনকেন্দ্রে।

১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্য জুড়ে খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহ শুরু হয়েছে। সেই কর্মসূচির প্রথম দিনেই দিঘা এবং জগন্নাথ মন্দির সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ নজরদারি চালায় জেলা প্রশাসন ও খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর। পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য দিঘায় প্রতিদিনই বহু মানুষ আসেন। সৈকতে ঘোরাঘুরির পাশাপাশি তাঁদের বড় অংশ স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং খাবারের দোকানের উপর নির্ভর করেন। ফলে খাবারের গুণমান ও স্বাস্থ্যবিধি ঠিক রাখা নিয়ে প্রশাসনের তরফে বরাবরই সতর্কতা থাকে।

কিন্তু মঙ্গলবারের অভিযানে যে ছবির সামনে এসেছে, তাতে সেই সতর্কতার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের আধিকারিকদের অভিযোগ, বেশ কিছু হোটেল ও রেস্তোরাঁয় নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের পাশাপাশি রান্না ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও নিয়ম মানা হচ্ছিল না। বিশেষ করে বিরিয়ানির মান নিয়ে অভিযোগ সামনে আসে। খাবারে ব্যবহারের অনুমোদিত ফুড কালারের পরিবর্তে রাসায়নিক রং ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে।

শুধু বিরিয়ানির রং নিয়েই নয়, রান্না করা মাছ ও মাংস কত দিন ধরে সংরক্ষণ করে রাখা হচ্ছে, তা নিয়েও অভিযানে প্রশ্ন ওঠে। কয়েক দিন আগে রান্না করা খাবার নতুন করে পরিবেশন করার অভিযোগ পেয়েছেন আধিকারিকেরা। এমনকি খাবার বাসি বা পুরনো—তা যাতে ক্রেতাদের চোখে সহজে ধরা না পড়ে, সে জন্য ‘ফুড সেন্ট’ ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। খাবারে কৃত্রিম গন্ধ তৈরি করতে এই ধরনের উপাদান ব্যবহারের অভিযোগে প্রশাসনের আধিকারিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।

খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের বক্তব্য, খাবার দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করে তা নতুন করে পরিবেশন করা হলে খাদ্যদূষণের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মাছ, মাংস বা রান্না করা খাবার সঠিক তাপমাত্রায় এবং নির্ধারিত নিয়মে সংরক্ষণ না করা হলে তাতে জীবাণু বৃদ্ধি পেতে পারে। পর্যটকদের মধ্যে শিশু, বয়স্ক এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় থাকা মানুষও থাকেন। ফলে নিম্নমানের বা অনিরাপদ খাবার তাঁদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

মঙ্গলবারের অভিযানে জেলা প্রশাসনের একাধিক দপ্তরের আধিকারিকেরা উপস্থিত ছিলেন। অভিযানে নেতৃত্ব দেন পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাশাসক নিরঞ্জন কুমার। সঙ্গে ছিলেন কাঁথির মহকুমাশাসক প্রতীক অশোক ধুমাল, বিডিও, ক্রেতা সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিক, ব্লক স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মী এবং নন্দীগ্রাম স্বাস্থ্য জেলার খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকেরা। জেলা পুলিশের প্রতিনিধিরাও অভিযানে অংশ নেন।

দিঘার একাধিক হোটেল ও রেস্তোরাঁয় ঢুকে রান্নাঘর, খাবার সংরক্ষণের জায়গা এবং ব্যবহৃত খাদ্য উপকরণ খতিয়ে দেখা হয়। রান্না করা খাবার কতক্ষণ ধরে রাখা হচ্ছে, খাবারে কী ধরনের রং বা অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে এবং খাদ্যসামগ্রীর মান ঠিক রয়েছে কি না—এই সব বিষয় খতিয়ে দেখেন আধিকারিকেরা। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও খাদ্য সংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলা হচ্ছে কি না, তাও পরীক্ষা করা হয়।

নন্দীগ্রাম স্বাস্থ্য জেলার খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিক বিশ্বজিৎ মান্না জানিয়েছেন, দিঘার ২০টি হোটেল-রেস্তোরাঁয় অভিযান চালানো হয়েছে। তার মধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ১২টি হোটেল-রেস্তোরাঁকে আইনি নোটিস দেওয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, আগামী দিনেও দিঘায় এই ধরনের অভিযান চালানো হবে।

প্রশাসনের এই পদক্ষেপে স্পষ্ট, শুধুমাত্র খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে এক দিনের অভিযান করেই নজরদারি থামছে না। এর আগেও দিঘার বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁয় একাধিক বার অভিযান হয়েছে। নিয়ম না মানার অভিযোগে নোটিস, জরিমানা এবং খাবারের নমুনা সংগ্রহের মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মঙ্গলবারের অভিযানে ফের একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় প্রশাসনের আধিকারিকেরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।

দিঘায় শুধু স্থানীয় পর্যটকরাই নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ বেড়াতে আসেন। সৈকত শহরের হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের উপর পর্যটকদের নির্ভরতা তাই যথেষ্ট বেশি। কোনও পর্যটক খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট পর্যটকের উপরেই পড়ে না, গোটা পর্যটনকেন্দ্রের ভাবমূর্তিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রশাসনের তরফে খাদ্য ব্যবসায়ীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

এ দিন শুধু দিঘাতেই অভিযান সীমাবদ্ধ ছিল না। পূর্ব মেদিনীপুরের এগরা শহরেও একাধিক রেস্তোরাঁ, গোডাউন এবং বেকারিতে হানা দেয় খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর। সেখানেও খাদ্যসামগ্রীর গুণমান এবং মেয়াদ সংক্রান্ত বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হয়। অভিযানে বেশ কিছু খাদ্যসামগ্রী বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

এগরায় দু’টি রেস্তোরাঁ এবং একটি চানাচুর কারখানাকে নোটিস দেওয়া হয়েছে। অভিযানের সময় মেয়াদ উত্তীর্ণ চকলেট, বিস্কুট, চানাচুর-সহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী উদ্ধার করে বাজেয়াপ্ত করা হয়। মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার পরও এই ধরনের খাদ্যসামগ্রী কী ভাবে মজুত ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

প্রশাসনের এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হল বাজারে বিক্রি হওয়া খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ করা এবং ক্রেতাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখা। খাদ্য ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কাঁচামাল সংগ্রহ, সংরক্ষণ, রান্না ও পরিবেশন করার কথা। কিন্তু সেই নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করা হতে পারে।

দিঘায় ২০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৫টি থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এখন পরীক্ষাগারের রিপোর্টের দিকে নজর থাকবে। নমুনায় নিষিদ্ধ রাসায়নিক, ক্ষতিকর উপাদান বা নির্ধারিত মানের বাইরে কোনও কিছু পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট হোটেল বা রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ফলে আইনি নোটিস পাওয়া ১২টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকটাই নির্ভর করবে পরীক্ষার রিপোর্টের উপর।

প্রশাসনের তরফে ইতিমধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, নজরদারি আগামী দিনেও চলবে। অর্থাৎ খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহের কর্মসূচি শেষ হয়ে গেলেও দিঘা ও আশপাশের এলাকায় অভিযান অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রে খাবারের মান নিয়ে যাতে কোনও আপস না করা হয়, সেই বার্তাই দিতে চাইছে জেলা প্রশাসন।

সব মিলিয়ে, দিঘার ১২টি হোটেল-রেস্তোরাঁয় আইনি নোটিস এবং ১৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে খাবারের নমুনা সংগ্রহের ঘটনা পর্যটনকেন্দ্রের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এক দিকে পর্যটকদের খাবারের গুণমান নিয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন, অন্য দিকে ব্যবসায়ীদেরও নিয়ম মেনে খাদ্য পরিবেশন করতে হবে। পরীক্ষাগারের রিপোর্টে কী উঠে আসে এবং তার ভিত্তিতে প্রশাসন পরবর্তী সময়ে কী ব্যবস্থা নেয়, এখন সেদিকেই নজর।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved