Homeদেশ২৭২ কোটিতে ১১ কিমি বাইপাস রেললাইন! আদ্রা–জয়চণ্ডী পাহাড়ে বাড়বে পণ্য পরিবহণের গতি

২৭২ কোটিতে ১১ কিমি বাইপাস রেললাইন! আদ্রা–জয়চণ্ডী পাহাড়ে বাড়বে পণ্য পরিবহণের গতি

নিউজ ডেস্ক; পণ্যবাহী ট্রেনের চলাচল আরও দ্রুত করা এবং ব্যস্ত রেলপথে যানজট কমানোর লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপ দক্ষিণ-পূর্ব রেলের। আদ্রা থেকে
resizeplus_Screenshot 2026-09-02 161029_edited

নিউজ ডেস্ক; পণ্যবাহী ট্রেনের চলাচল আরও দ্রুত করা এবং ব্যস্ত রেলপথে যানজট কমানোর লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপ দক্ষিণ-পূর্ব রেলের। আদ্রা থেকে জয়চণ্ডী পাহাড়ের মধ্যে প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বাইপাস রেললাইন তৈরির প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে রেলবোর্ড। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ২৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষের আশা, নতুন এই লাইন চালু হলে আদ্রা–জয়চণ্ডী পাহাড়–সাঁকা করিডরে পণ্য পরিবহণের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যস্ত মূল লাইনের উপর চাপও কিছুটা কমবে।

দক্ষিণ-পূর্ব রেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহণ করিডর হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে এই অঞ্চল। শিল্পাঞ্চল ও খনিজসম্পদ সমৃদ্ধ এলাকাগুলির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের যোগাযোগে এই রেলপথের ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে লৌহ আকরিক, খনিজ, সিমেন্ট এবং অন্যান্য শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল পরিবহণে এই করিডর গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে গেলে শুধু ট্রেনের সময়সূচি পরিবর্তন করলেই হবে না, প্রয়োজন রেল পরিকাঠামোর সম্প্রসারণ। সেই প্রয়োজন মেটাতেই প্রস্তাবিত বাইপাস লাইনকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছে রেল।

রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রস্তাবিত নতুন লাইনটি তৃতীয় লাইনের সঙ্গে দ্বিমুখী সংযোগ তৈরি করবে। অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী দুই দিকেই ট্রেন চলাচলের সুবিধা পাওয়া যাবে। এর ফলে বর্তমানে যে রেলপথে একাধিক পরিষেবা এবং পণ্যবাহী ট্রেনের চলাচল সামলাতে হয়, সেখানে অতিরিক্ত ট্রেন পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে। রেলের হিসাব অনুযায়ী, নতুন পরিকাঠামো ব্যবহার করে প্রতিদিন অতিরিক্ত ছ’টি পণ্যবাহী রেক চালানো সম্ভব হতে পারে।

শুধু দৈনিক ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো নয়, প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে সামগ্রিক পণ্য পরিবহণ ক্ষমতা বৃদ্ধি। রেলের হিসাব অনুযায়ী, বাইপাস রেললাইনটি সম্পূর্ণ ভাবে চালু হলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৮.৮৮ মিলিয়ন টন বা ৮৮.৮ লক্ষ টন পণ্য পরিবহণের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে শিল্পাঞ্চল থেকে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল এবং উৎপাদিত পণ্য দেশের অন্য প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে রেল আরও বেশি ভূমিকা নিতে পারবে।

বর্তমানে আদ্রা–জয়চণ্ডী পাহাড়–সাঁকা করিডরের মোট রেলপথ ধারণক্ষমতার প্রায় ৭১ শতাংশ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে বলে রেলের তরফে জানানো হয়েছে। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি রয়েছে আরও একটি সমস্যা—বিভিন্ন জায়গায় থাকা সারফেস ক্রসিং। একই স্তরে রাস্তা ও রেলপথের সংযোগ থাকার কারণে অনেক সময় ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রেনের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ে গতি এবং সময়ানুবর্তিতায়।

ভারী পণ্য নিয়ে চলা মালগাড়ির ক্ষেত্রে সামান্য বিলম্বও পরবর্তী পরিষেবাগুলির উপর প্রভাব ফেলতে পারে। একটি ট্রেনকে ক্রসিং পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হলে পিছনে থাকা অন্য ট্রেনগুলিকেও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ফলে একটি ছোট সমস্যা ধীরে ধীরে বড় অপারেশনাল চাপ তৈরি করতে পারে। প্রস্তাবিত বাইপাস রেললাইন সেই চাপ কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেই মনে করছে রেল কর্তৃপক্ষ।

নতুন লাইন তৈরি হলে মূল করিডরের উপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। অতিরিক্ত পণ্যবাহী রেককে বিকল্প রেলপথ দিয়ে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় মূল লাইনে ট্রেনের চাপ কমবে। তার ফলে শুধু মালগাড়ি নয়, সামগ্রিক রেল চলাচল পরিচালনাতেও সুবিধা হতে পারে। রেলের কাছে এটি তাই শুধুমাত্র একটি নতুন ১১ কিলোমিটার লাইন তৈরির প্রকল্প নয়, বরং গোটা করিডরের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা।

বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, দেশের শিল্প উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঁচামাল পরিবহণের প্রয়োজনও বাড়ছে। খনিজ, লৌহ আকরিক, কয়লা, সিমেন্ট-সহ ভারী পণ্য দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহণের ক্ষেত্রে রেল তুলনামূলক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সড়কপথের উপর অতিরিক্ত চাপ কমাতেও রেলপথে পণ্য পরিবহণের ক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। সেই দিক থেকে আদ্রা–জয়চণ্ডী পাহাড় বাইপাস প্রকল্পের গুরুত্ব রয়েছে।

লৌহ আকরিক পরিবহণের ক্ষেত্রেও নতুন লাইনটি বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে। শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় কাঁচামাল পৌঁছে দেওয়া এবং উৎপাদিত পণ্য অন্যত্র পাঠানোর জন্য নির্ভরযোগ্য পরিবহণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। রেলের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন বাইপাস চালু হলে লৌহ আকরিকের চাহিদা এবং তার পরিবহণ—দুই ক্ষেত্রেই সুবিধা তৈরি হবে। একই সঙ্গে খনিজ ও সিমেন্ট পরিবহণের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সক্ষমতা পাওয়া যাবে।

প্রকল্পটিকে এনার্জি, খনিজ এবং সিমেন্ট করিডরের বৃহত্তর পরিকাঠামোগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এই ধরনের করিডরের মূল লক্ষ্য হল শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য ভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেওয়া। উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বাজার বা বন্দর পর্যন্ত পণ্য পরিবহণের সময় কমানো গেলে শিল্প সংস্থাগুলির লজিস্টিক খরচ কমানোর সুযোগও তৈরি হয়। ফলে রেল পরিকাঠামোর এই সম্প্রসারণ পরোক্ষ ভাবে শিল্প অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

আদ্রা ডিভিশন দক্ষিণ-পূর্ব রেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অঞ্চলের রেলপথ দিয়ে নিয়মিত ভাবে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহণ করা হয়। শিল্প ও খনিজ নির্ভর এই এলাকার অর্থনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে রেল পরিষেবার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। তাই নতুন লাইন নির্মাণের অনুমোদনকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকাঠামোগত উন্নয়নের দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

২৭২ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরে শুধু অতিরিক্ত ট্রেন চালানো নয়, রেল চলাচলের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় আরও নমনীয়তা আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। কোনও একটি অংশে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে বিকল্প সংযোগ ব্যবহার করে ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে। এর ফলে রক্ষণাবেক্ষণের সময়ও ট্রেন চলাচল সামলানোর ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।

তবে প্রকল্পের বাস্তব সুবিধা পেতে হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করা এবং নতুন লাইনের সঙ্গে বিদ্যমান রেল পরিকাঠামোর সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাইপাসের পাশাপাশি সংযোগকারী লাইন, সিগন্যালিং এবং অন্যান্য রেল পরিকাঠামোর কাজও পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে হবে। তবেই প্রতিদিন অতিরিক্ত ছ’টি রেক এবং বছরে ৮.৮৮ মিলিয়ন টন অতিরিক্ত পণ্য পরিবহণের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবে কার্যকর করা সম্ভব হবে।

রেলবোর্ডের অনুমোদনের ফলে আপাতত প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ এগোল দক্ষিণ-পূর্ব রেল। আগামী দিনে নির্মাণকাজ শুরু হলে আদ্রা থেকে জয়চণ্ডী পাহাড় পর্যন্ত রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন পরিকাঠামো যুক্ত হবে। তার সুফল শুধু ওই নির্দিষ্ট ১১ কিলোমিটার অংশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং গোটা করিডরের পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থাতেই তার প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, ২৭২ কোটি টাকার এই বাইপাস প্রকল্প দক্ষিণ-পূর্ব রেলের পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। রেললাইনের উপর চাপ কমানো, সারফেস ক্রসিংয়ের কারণে সৃষ্ট গতি-সংক্রান্ত সমস্যা কাটানো এবং অতিরিক্ত পণ্যবাহী রেক চালানোর সুযোগ—এই তিনটি ক্ষেত্রেই প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বছরে প্রায় ৮৮.৮ লক্ষ টন অতিরিক্ত পণ্য পরিবহণের সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলে শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রেল যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে বলেই আশা করছে রেল।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved