
নিউজ ডেস্ক : কূটনীতির মঞ্চে কখনও উপহার হয়ে ওঠে সংস্কৃতির প্রতিনিধি, কখনও আবার ইতিহাসের কোনও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের স্মারক। ভারত ও উজবেকিস্তানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবার সেই জায়গা নিল দাবা। উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মির্জিয়োয়েভকে এমনই এক অভিনব উপহার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি—২০২৫ সালের ফিডে বিশ্বকাপ ফাইনালে উজবেক গ্র্যান্ডমাস্টার জাভোখির সিনদারভের হাতে লেখা মূল স্কোরশিট। গোয়ায় অনুষ্ঠিত সেই ঐতিহাসিক ফাইনালে যে চালগুলি লিখে সিনদারভ বিশ্বকাপের ট্রফি জিতেছিলেন, সেই নথিই এবার পৌঁছে গেল তাঁর দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে।
স্রেফ একটি দাবার স্কোরশিট নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উজবেকিস্তানের দাবা ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়। ২০২৫ সালের ফিডে বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিলেন উজবেকিস্তানের তরুণ তারকা সিনদারভ এবং চিনের গ্র্যান্ডমাস্টার ওয়েই ই। দুই ক্লাসিক্যাল ম্যাচের পর দু’জনেরই স্কোর সমান ছিল। ফলে ম্যাচের নিষ্পত্তির জন্য যেতে হয় টাইব্রেকারে। সেখানেই বাজিমাত করেন সিনদারভ। ১.৫-০.৫ ব্যবধানে ওয়েই ই-কে হারিয়ে বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নেন তিনি।
এই জয় শুধু একটি ট্রফি জয়ের ঘটনা ছিল না। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জিতে সিনদারভ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ফিডে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে যান। তাঁর এই অসাধারণ সাফল্য তাঁকে সরাসরি ২০২৬ সালের ক্যান্ডিডেটস টুর্নামেন্টের দৌড়ে নিয়ে যায়। সেখান থেকেই শুরু হয় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার আরও বড় স্বপ্নের পথচলা।
আর সেই স্বপ্নও বাস্তবে রূপ নেয় ২০২৬ সালে। সাইপ্রাসে অনুষ্ঠিত ফিডে ক্যান্ডিডেটস টুর্নামেন্টে এক রাউন্ড বাকি থাকতেই শিরোপা নিশ্চিত করেন সিনদারভ। অ্যানিশ গিরির সঙ্গে তাঁর ম্যাচ ড্র হওয়ার পরই নিশ্চিত হয়ে যায় তাঁর প্রথম স্থান। ফলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের মঞ্চে ভারতের ডি গুকেশকে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার অর্জন করেন এই উজবেক গ্র্যান্ডমাস্টার।
সিনদারভের উত্থানের গতি সত্যিই নজরকাড়া। মাত্র ১২ বছর বয়সেই গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার নজির গড়েছিলেন তিনি। এরপর ২০২২ সালে চেন্নাইয়ে আয়োজিত দাবা অলিম্পিয়াডে উজবেকিস্তানের সোনা জয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক দাবার মঞ্চে তাঁর অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। ফিডের তথ্য অনুযায়ী, উজবেকিস্তানের নতুন প্রজন্মের দাবাড়ুদের মধ্যে সিনদারভ অন্যতম উজ্জ্বল মুখ।
এই কারণেই মোদির হাতে তুলে দেওয়া উপহারের গুরুত্ব অন্যরকম। গোয়ার সেই ফাইনালে সিনদারভ যে চালগুলি লিখেছিলেন, তার মূল হাতে লেখা স্কোরশিট সংরক্ষণ করা হয়েছে একটি বিশেষ লেদারেট কভারের মধ্যে। তার সঙ্গে রাখা হয়েছে বিশ্বকাপ হাতে সিনদারভের একটি ছবি। ফলে এটি নিছক কাগজে লেখা কয়েকটি দাবার চাল নয়—উজবেক দাবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাম্প্রতিক সাফল্যের একটি বাস্তব স্মারক।
ভারত-উজবেক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই উপহারের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। দাবা দুই দেশেরই ঐতিহ্য ও আধুনিক ক্রীড়া-সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িত। ফলে রাষ্ট্রীয় উপহারের তালিকায় সিনদারভের ঐতিহাসিক ম্যাচের স্কোরশিট বেছে নেওয়া নিঃসন্দেহে একটি প্রতীকী বার্তা বহন করছে। অল ইন্ডিয়া চেস ফেডারেশনের তরফেও এই ঘটনাকে ‘চেস ডিপ্লোম্যাসি’-র একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়েছে।
তবে শুধু দাবাই নয়, উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে দেওয়া মোদির অন্যান্য উপহারেও ফুটে উঠেছে ভারতের শিল্প, সংস্কৃতি ও কারুশিল্পের বৈচিত্র্য। সেই তালিকায় রয়েছে চন্দন কাঠের তৈরি শততন্ত্রী বীণা বা সন্তুর। বহু তারের এই বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের যোগ রয়েছে।
এর পাশাপাশি মির্জিয়োয়েভকে উপহার দেওয়া হয়েছে কাংড়ার দুই ধরনের প্রিমিয়াম চা—ফার্স্ট ফ্লাশ ব্ল্যাক টি এবং গ্রিন টি। বিশেষ ভাবে খোদাই করা কাঠের বাক্সের মধ্যে সেই চা সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ক্রীড়া থেকে সঙ্গীত, চা থেকে কারুশিল্প—ভারতের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয়কে উপহারের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
উজবেক প্রেসিডেন্টের পরিবারের জন্যও ছিল বিশেষ উপহার। তাঁর স্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে বেনারসি রেশমের শাল, যার সঙ্গে ছিল মার্বেল খচিত একটি বাক্স। প্রেসিডেন্টের কন্যার জন্য ছিল ফুলের নকশা করা একটি রুপোর ব্রোচ। একই ভাবে উজবেকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে ফুল ও পাতার নকশা খোদাই করা মার্বেলের একটি আলংকারিক প্লেট।
সব মিলিয়ে মোদির এই উপহারের তালিকা নিছক সৌজন্য বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সিনদারভের হাতে লেখা স্কোরশিট যেন দুই দেশের মধ্যে দাবার সূত্রে তৈরি হওয়া এক বিশেষ বন্ধনের প্রতীক। এক দিকে গোয়ার মাটিতে উজবেক তারকার ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়, অন্য দিকে সেই জয়ের স্মৃতি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে পৌঁছে গেল উজবেক প্রেসিডেন্টের কাছে।
দাবার বোর্ডে যে লড়াই শুরু হয়েছিল সিনদারভ ও ওয়েই ই-র মধ্যে, তার প্রতিধ্বনি এখন কূটনীতির মঞ্চেও। আর সেই কারণেই মোদির এই উপহারকে শুধু স্মারক নয়, ভারত-উজবেকিস্তানের সম্পর্কের এক অভিনব ‘চেস ডিপ্লোম্যাসি’ বললেও অত্যুক্তি হয় না।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments