Homeকলকাতাডেকার্স লেন থেকে শিয়ালদহ—বদলাবে কলকাতার স্ট্রিট ফুডের চেনা ছবি? ফুটপাত দখল, নোংরা পরিবেশে কড়া পদক্ষেপের পথে প্রশাসন

ডেকার্স লেন থেকে শিয়ালদহ—বদলাবে কলকাতার স্ট্রিট ফুডের চেনা ছবি? ফুটপাত দখল, নোংরা পরিবেশে কড়া পদক্ষেপের পথে প্রশাসন

নিউজ ডেস্ক : কলকাতার রাস্তার খাবার মানেই এক অন্যরকম আবেগ। ব্যস্ত শহরের মাঝে ফুটপাতের ধারে দাঁড়িয়ে গরম কড়াই থেকে উঠে
Untitled Design (5)

নিউজ ডেস্ক : কলকাতার রাস্তার খাবার মানেই এক অন্যরকম আবেগ। ব্যস্ত শহরের মাঝে ফুটপাতের ধারে দাঁড়িয়ে গরম কড়াই থেকে উঠে আসা ধোঁয়া, মশলার গন্ধ আর পকেটসই দামে পেট ভরানোর সুযোগ—এই সবকিছুর মিলিত আকর্ষণেই বছরের পর বছর ধরে জনপ্রিয় কলকাতার স্ট্রিট ফুড। ডেকার্স লেনের নানা পদ থেকে শুরু করে অফিসপাড়ার দ্রুত খাবার, শিয়ালদহের স্টেশন চত্বরের হরেক রকমের দোকান—শহরের খাদ্য সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই ছোট ছোট খাবারের দোকানগুলি।

কিন্তু সেই পরিচিত ছবিতেই এবার বদলের ইঙ্গিত। স্বাদ এবং কম দামের পাশাপাশি খাবারের স্বাস্থ্যকর মান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং ফুটপাত দখলের মতো একাধিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শহরের বেশ কয়েকটি ব্যস্ত এলাকায় এই সমস্যাগুলি নতুন করে সামনে আসায় প্রশাসনের তরফে কড়া পদক্ষেপের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা যাচ্ছে।

বিশেষ করে ডেকার্স লেন, বি বি ডি বাগ এবং শিয়ালদহ—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় রাস্তার খাবারের দোকানকে ঘিরে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও খাবার তৈরির জায়গার আশপাশে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও আবার ফুটপাতের বড় অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের সমস্যায় পড়ার অভিযোগ। ফলে প্রশাসনের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী স্ট্রিট ফুডের সংস্কৃতি বজায় রাখা, অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

ডেকার্স লেনের ক্ষেত্রে অভিযোগের তালিকায় রয়েছে অস্থায়ী দোকান, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং অগ্নিনিরাপত্তা। শহরের অত্যন্ত ব্যস্ত এই খাবারের গলিতে বহু মানুষ প্রতিদিন খাবার খেতে আসেন। সরু জায়গার মধ্যেই রান্না, গ্যাসের ব্যবহার এবং ক্রেতাদের ভিড় থাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রান্নার সময় আগুন বা গ্যাস সংক্রান্ত কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে সরু গলির মধ্যে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

শুধু আগুনের ঝুঁকি নয়, খাবার তৈরির পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ, কোথাও খোলা নর্দমার পাশে রান্না হচ্ছে। তেলের কড়াই ফুটছে রাস্তার ধারে। ব্যবহৃত তেল কতটা স্বাস্থ্যসম্মত, খাবারে ব্যবহৃত কাঁচামালের গুণমানই বা কেমন—সেই প্রশ্নও উঠছে। একই সঙ্গে খাবারের উচ্ছিষ্ট কিংবা প্লাস্টিক সরাসরি নর্দমায় ফেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে নর্দমা আটকে যাওয়ার পাশাপাশি দুর্গন্ধ এবং মশার উপদ্রব বাড়তে পারে।

বি বি ডি বাগের পরিস্থিতিও প্রশাসনের নজরে এসেছে। কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অফিসপাড়া হওয়ায় প্রতিদিন এই এলাকায় বিপুল সংখ্যক কর্মী ও পথচারীর যাতায়াত। অভিযোগ, খাবারের অস্থায়ী দোকান এবং রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে ফুটপাতের একটা বড় অংশ কার্যত ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক পথচারীকে ফুটপাত ছেড়ে মূল রাস্তায় নেমে হাঁটতে হচ্ছে। ব্যস্ত সময়ে এই পরিস্থিতি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে।

শিয়ালদহের ছবিটাও খুব একটা আলাদা নয়। স্টেশন এবং উড়ালপুল সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত। সেখানে ফুটপাতের ধারে খাবারের দোকানের পাশাপাশি কাঁচা মাছ-মাংস, খোলা খাবার এবং সবজির বর্জ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। খাবারের উচ্ছিষ্ট এবং পচনশীল বর্জ্য সঠিক ভাবে সংগ্রহ ও নিষ্পত্তি না হলে শুধু পরিবেশই নোংরা হয় না, তা জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করতে পারে।

এই সমস্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই কলকাতা পুরসভা এবং প্রশাসনের তরফে এবার আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গিয়েছে। প্রশাসনের লক্ষ্য, রাস্তার খাবারের ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং খাবারের দোকানগুলি যাতে নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে পরিচালিত হয় এবং পথচারীদের চলাচল ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনও আপস না হয়, সেই ব্যবস্থাই তৈরি করা।

এই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে ফুটপাত দখল করে তৈরি হওয়া স্থায়ী বেআইনি কাঠামো সরানো। একই সঙ্গে অস্থায়ী দোকানের পরিবর্তে চলনযোগ্য হুইল-কার্ট ব্যবহারে জোর দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে প্রয়োজনে দোকানের অবস্থান পরিবর্তন করা সম্ভব হবে এবং ফুটপাতের উপর স্থায়ী কাঠামো তৈরির প্রবণতাও কমানো যেতে পারে।

কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় নো-ভেন্ডিং জোন চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ যেখানে পথচারীদের চাপ অত্যন্ত বেশি অথবা যান চলাচলের ক্ষেত্রে বিশেষ ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে রাস্তার ধারে খাবারের দোকান বসানো যাবে না। আবার উপযুক্ত জায়গায় পরিকল্পিত ভাবে খাবারের দোকান রাখার ব্যবস্থা করা হতে পারে।

এর পাশাপাশি উঠে আসছে ‘মডেল ফুড স্ট্রিট’-এর ভাবনাও। নির্দিষ্ট জায়গায় খাবারের দোকানগুলিকে সংগঠিত করে সেখানে জল সরবরাহ, বর্জ্য সংগ্রহ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং রান্নার নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলির উপর নজর দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যবসা করতে পারবেন, তেমনই ক্রেতারাও তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার খাওয়ার সুযোগ পাবেন।

খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিক্রেতাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে FSSAI-এর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ব্যবহার করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত খাদ্য নিরাপত্তা পরিদর্শনের মাধ্যমে খাবারের গুণমান, ব্যবহৃত উপকরণ, রান্নার পরিবেশ এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি পরীক্ষা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে এই পরিবর্তনের পথে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে ভারসাম্য রক্ষা। কলকাতার স্ট্রিট ফুড শুধু খাবারের ব্যবসা নয়, শহরের সংস্কৃতি এবং নাগরিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বহু ছোট ব্যবসায়ী এই পেশার উপর নির্ভরশীল। ফলে প্রশাসনের পদক্ষেপ এমন হওয়া প্রয়োজন যাতে স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তার নিয়ম কার্যকর হয়, আবার ছোট ব্যবসায়ীদের জীবিকাতেও অযথা আঘাত না আসে।

কলকাতার মানুষের কাছেও তাই প্রত্যাশাটা স্পষ্ট—রাস্তার খাবারের সেই পরিচিত স্বাদ, গন্ধ এবং সস্তা দামের আকর্ষণ যেন হারিয়ে না যায়। কিন্তু সেই খাবার খেতে গিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বা ফুটপাতে চলাচলের সমস্যা তৈরি হোক, সেটাও কেউ চান না।

প্রশাসনের প্রস্তাবিত পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার। যদি নির্দিষ্ট জায়গায় পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ রান্নার ব্যবস্থা, যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা যায়, তবে কলকাতার স্ট্রিট ফুডের চেহারা বদলালেও তার প্রাণটা হারাবে না।

অর্থাৎ লক্ষ্য স্ট্রিট ফুডকে সরিয়ে দেওয়া নয়—বরং ‘স্বাদ থাকবে, কিন্তু স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে আপস নয়’। কলকাতার চেনা রাস্তার খাবার আগামী দিনে সেই নতুন নিয়মেই নিজের জায়গা ধরে রাখতে পারে কি না, এখন নজর সেদিকেই।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved