
নিউজ ডেস্ক; কথায় বলে, ‘রাখে হরি মারে কে!’ প্রবল বর্ষায় নদীর ভয়াল স্রোতে তলিয়ে গিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেসে গেলেও শেষ পর্যন্ত প্রাণে বেঁচে ফিরলেন ৭০ বছরের এক আদিবাসী বৃদ্ধা। শুধু তাই নয়, নদী থেকে উদ্ধারের পর তাঁর শরীরে বড় কোনও আঘাতের চিহ্নও পাওয়া যায়নি। মঙ্গলবার বিকেলে পুরুলিয়ার পুঞ্চা এলাকার কাঁসাই নদী থেকে তাঁকে উদ্ধার করেন কয়েক জন মৎস্যজীবী। পরে পুলিশের সহযোগিতায় তাঁকে মানবাজার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসার পর প্রাথমিক ভাবে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে স্বাভাবিক ভাবেই বিস্মিত নদীপাড়ের মানুষ। তাঁদের অনেকেই মনে করছেন, এমন পরিস্থিতিতে এতটা পথ নদীর প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়েও কারও বেঁচে থাকা সত্যিই বিরল ঘটনা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, উদ্ধার হওয়া বৃদ্ধার নাম ঠান্ডামণি মান্ডি। তাঁর বাড়ি পুঞ্চার ধগড়া এলাকায়। মঙ্গলবার বিকেলে কোনও ভাবে নদীর জলে নেমে পড়েছিলেন তিনি। সেই সময় কাঁসাই নদীতে জল ছিল যথেষ্ট বেশি। বর্ষার জেরে নদীর স্রোতও ছিল প্রবল। নদীতে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই স্রোতের টানে তিনি ভেসে যেতে শুরু করেন।
পরিস্থিতি এত দ্রুত বদলে যায় যে, বৃদ্ধার পক্ষে আর নিজের চেষ্টায় নদীর স্রোত থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। প্রবল জলের টানে তিনি ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকেন। এ ভাবেই প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তিনি পুঞ্চার বাউরিডিহা নদীঘাটের কাছে পৌঁছে যান।
ঠিক সেই সময় নদীর ধারে মাছ ধরছিলেন কয়েক জন মৎস্যজীবী। তাঁদের নজরে পড়ে নদীর মাঝ বরাবর অস্বাভাবিক কিছু একটা ভেসে আসছে। প্রথমে বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি। দূর থেকে দেখে সেটিকে কোনও প্রাণী বা ভাসমান কোনও বস্তু বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটি কাছে আসতেই তাঁরা বুঝতে পারেন, নদীর জলে একজন মানুষ ভেসে যাচ্ছেন।
জলের মধ্যে বাঁচার জন্য হাত-পা ছোড়াছুড়ি করছিলেন ওই বৃদ্ধা। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তাঁকে উদ্ধারের উদ্যোগ নেন মৎস্যজীবীরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নদী সংলগ্ন ডাবর গ্রামের বাসিন্দা নেপাল বাউড়ি। টিউবের তৈরি ভেলা নিয়ে তিনি নদীতে নেমে পড়েন। প্রবল স্রোতের মধ্যেই এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধার কাছে পৌঁছন তিনি।
নেপালের কথায়, প্রথমে নদীতে দূর থেকে কিছু একটা ভেসে আসতে দেখেছিলেন তিনি। সেটি নড়াচড়া করছে বুঝতে পারলেও মানুষ বলে তাঁর মনে হয়নি। কাছে আসার পরই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। তিনি দেখেন, একজন বৃদ্ধা জলের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছেন এবং বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছেন। কোনও রকম সময় নষ্ট না করে টিউবের ভেলা নিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে যান নেপাল। শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধাকে ধরে নদীর পাড়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হন তিনি।
উদ্ধারের পর খবর দেওয়া হয় পুঞ্চা থানায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বৃদ্ধাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য মানবাজার হাসপাতালে নিয়ে যায়। নদীতে এতটা পথ ভেসে যাওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থা কেমন রয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল স্থানীয়দের। তবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক বলে জানা যায়।
চিকিৎসকদের বক্তব্য, ঘটনাটি যথেষ্ট আশ্চর্যজনক। এতটা সময় প্রবল স্রোতের মধ্যে থাকার পরও বৃদ্ধার শরীরে গুরুতর কোনও আঘাত বা বড় ধরনের শারীরিক সমস্যা ধরা পড়েনি। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
হাসপাতালে বসে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে ঠান্ডামণিও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে তিনি প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, নদীতে নামার পর হঠাৎ স্রোতের টানে তিনি ভেসে যান। এরপর কী ভাবে এতটা পথ পেরিয়ে এসেছেন, তা তাঁর নিজের কাছেও স্পষ্ট নয়। শুধু এটুকুই জানেন, প্রবল স্রোতের মধ্যে ভেসে যাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত কেউ তাঁকে উদ্ধার করেছেন।
বৃদ্ধাকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে আসেন নদী তীরবর্তী এলাকার বেশ কিছু মানুষ। তাঁদের অনেকেরই ধারণা ছিল, নদীর ওই ভয়ংকর স্রোতে ভেসে যাওয়ার পর আর হয়তো তাঁকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যাবে না। কিন্তু বাস্তবে ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো।
স্থানীয় বাসিন্দা কাজল বাউড়ির কথায়, বৃদ্ধাকে নদীতে ভেসে যাওয়ার কথা শুনে তাঁরা প্রায় ধরেই নিয়েছিলেন যে তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু পরে হাসপাতালে এসে তাঁকে জীবিত অবস্থায় দেখে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। আরও অবাক করার মতো বিষয় ছিল, চিকিৎসার পর বৃদ্ধা নিজেই হেঁটে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
বর্ষাকালে পুরুলিয়ার একাধিক নদীতে জলস্তর এবং স্রোত দ্রুত বেড়ে যায়। কাঁসাই নদীতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নদীর কাছে থাকা গ্রামগুলির মানুষের কাছে বর্ষার এই সময়টি তাই প্রতি বছরই ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে প্রবল বৃষ্টি এবং পাহাড়ি জল নামলে নদীর চরিত্র দ্রুত বদলে যেতে পারে। স্বাভাবিক জলস্রোতের জায়গায় তৈরি হয় তীব্র টান। সেই অবস্থায় নদীতে নামা বিপজ্জনক বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।
এই ঘটনার পর নদীপাড়ের বাসিন্দাদের একাংশ ফের সতর্কতার দাবি তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বর্ষার সময়ে নদীতে জল বাড়লে সাধারণ মানুষকে আরও সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে প্রবল স্রোতের সময় নদীতে নামা বা নদীর খুব কাছে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি।
তবে ঠান্ডামণি মান্ডির ঘটনায় আপাতত স্বস্তির ছবি। কয়েক কিলোমিটার নয়, প্রায় ১০ কিলোমিটার নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়ার পরও তাঁর প্রাণে বেঁচে যাওয়া এবং বড় কোনও চোট না লাগার ঘটনা স্থানীয়দের কাছে কার্যত অবিশ্বাস্য। আর সেই অসম্ভব পরিস্থিতিতে শেষ মুহূর্তে টিউবের ভেলা নিয়ে নদীতে নেমে বৃদ্ধাকে উদ্ধার করা নেপাল বাউড়ির সাহসিকতাও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এক দিকে ভয়াল নদীর স্রোত, অন্য দিকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এক বৃদ্ধা—মঙ্গলবারের এই ঘটনা তাই পুঞ্চার মানুষের মনে দীর্ঘদিন মনে থাকার মতো একটি ঘটনাই হয়ে রইল।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments