Homeরাজ্যগাইডলাইন নেই, থমকে ২০০ কোটির বালির গ্রেডেশন ব্যবসা! কাজ হারালেন ১০ হাজারের বেশি

গাইডলাইন নেই, থমকে ২০০ কোটির বালির গ্রেডেশন ব্যবসা! কাজ হারালেন ১০ হাজারের বেশি

নিউজ ডেস্ক; বালি মানেই শুধু নির্মাণকাজে ব্যবহৃত সাধারণ নদীর বালি—এই ধারণার বাইরে রয়েছে আরও একটি বড় শিল্প। নির্দিষ্ট মাপ ও
resizeplus_6f430f978ab14342f0c898cbe1be9766

নিউজ ডেস্ক; বালি মানেই শুধু নির্মাণকাজে ব্যবহৃত সাধারণ নদীর বালি—এই ধারণার বাইরে রয়েছে আরও একটি বড় শিল্প। নির্দিষ্ট মাপ ও গুণমান অনুযায়ী বালিকে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হয় ‘গ্রেডেড স্যান্ড’, যার প্রয়োজন পড়ে সেমিকন্ডাক্টর থেকে শুরু করে কাচ, রং, টাইলস, ওয়াল পুট্টি, জল পরিশোধন এবং সৌর প্যানেল তৈরির মতো একাধিক শিল্পে। কিন্তু পশ্চিম বর্ধমান জেলায় সেই সম্ভাবনাময় ব্যবসাই কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। অভিযোগ, রাজ্যে বালির গ্রেডেশন ব্যবসা পরিচালনার জন্য এখনও স্পষ্ট কোনও রূপরেখা বা গাইডলাইন তৈরি হয়নি। তার জেরেই প্রায় তিন মাস ধরে বন্ধ প্রায় ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক, যাঁদের বড় অংশ মহিলা বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।

এখন রাজ্যের নতুন সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, গ্রেডেশন করা বালিকে পৃথক শিল্পপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক এবং এই ব্যবসা পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট নিয়মকানুন তৈরি করা হোক। তাঁদের বক্তব্য, প্রয়োজনীয় নীতিগত স্বীকৃতি এবং প্রশাসনিক স্পষ্টতা থাকলে এই শিল্পে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।

বালির সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টরের সম্পর্ক ঠিক কোথায়? বিষয়টি প্রথমে কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হলেও শিল্পক্ষেত্রে তার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। বালির অন্যতম উপাদান সিলিকন ডাইঅক্সাইড। একাধিক জটিল রাসায়নিক ও ভৌত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই উপাদানকে অতি বিশুদ্ধ সিলিকনে রূপান্তর করা যায়। আর সেই সিলিকনই আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।

শুধু সেমিকন্ডাক্টর শিল্প নয়, বিভিন্ন ধরনের রং তৈরিতেও নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের সিলিকা বালির প্রয়োজন হয়। বাজারে যে সব রঙে দানাদার বা খসখসে ধরনের টেক্সচার দেখা যায়, সেখানে বালি বা কোয়ার্টজ কণার ব্যবহার রয়েছে। শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী বালির কণার আকার, গঠন এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

রাইস মিল, টাইলস কারখানা, ওয়াল পুট্টি, ড্যামপ্রুফিং সামগ্রী, কাচ শিল্প, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট এবং সোলার প্যানেল তৈরির কারখানাতেও নির্দিষ্ট মানের বালির প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, সাধারণ নির্মাণ বালির সঙ্গে শিল্পে ব্যবহৃত গ্রেডেড স্যান্ডের পার্থক্য রয়েছে।

সাধারণত নদী থেকে তুলে আনা বালিকে সরাসরি শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় না। প্রথমে তা শুকিয়ে ঝরঝরে করা হয়। এর পর বিভিন্ন মাপের চালুনি, স্ক্রিন এবং ভাইব্রেটিং মেশিনের সাহায্যে বালিকে আলাদা আলাদা কণার মাপ অনুযায়ী ভাগ করা হয়। প্রয়োজন অনুসারে নির্দিষ্ট গ্রেডের বালি প্রস্তুত করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াকেই মূলত বালির গ্রেডেশন বলা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রেডেড স্যান্ডের বিশাল চাহিদা রয়েছে। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে এই ব্যবসার বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার। সেই বাজারের তুলনায় ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে এই শিল্প এখনও সম্ভাবনার জায়গায় রয়েছে বলেই তাঁদের দাবি।

পশ্চিম বর্ধমানের ক্ষেত্রে অবশ্য সেই সম্ভাবনাই এখন অনিশ্চয়তার মুখে। জেলার পাণ্ডবেশ্বর বিধানসভার লাউদোহা ব্লকের গৌরবাজারে ২০০৮ সালে বালির গ্রেডেশন ব্যবসা শুরু করেছিলেন পীযূষ দত্ত। বর্তমানে তাঁর ভাই সজলকান্তি দত্ত সেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাঁর দাবি, ব্যবসা চালানোর জন্য তাঁদের নিজস্ব গ্রেডেশন মেশিনের পাশাপাশি মান পরীক্ষা করার জন্য ল্যাবরেটরিও রয়েছে।

সজলকান্তির কথায়, এক সময় তাঁদের ব্যবসার বার্ষিক পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। বিভিন্ন ভেন্ডারের কাছ থেকে গ্রেডেড বালির চাহিদা আসত। কিন্তু গত প্রায় তিন মাস ধরে সেই ব্যবসা সম্পূর্ণ বন্ধ। ফলে শুধু তাঁদের সংস্থা নয়, সরাসরি এবং পরোক্ষ ভাবে যুক্ত বহু শ্রমিকও সমস্যায় পড়েছেন।

তাঁর অভিযোগ, তিনি বালি কারবারিদের কাছ থেকে বৈধ পথে বালি কিনে মজুত করতেন। ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্রও রয়েছে বলে তাঁর দাবি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বালি পরিবহণের সময় পুলিশের তরফে গাড়ি আটকানো এবং টাকা চাওয়ার মতো সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। একই সঙ্গে, ‘বালির আবার গ্রেডেশন কী’—এই ধরনের প্রশ্নও করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

সজলকান্তির বক্তব্য, প্রশাসনিক ভাবে এই ব্যবসার চরিত্র সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় বার বার সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছিল। সেই পরিস্থিতিতেই ব্যবসা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাঁর দাবি, বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় বালি সরবরাহ করতে পারছেন না। ভেন্ডাররা বালি চাইছেন, কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই কলকাতার একটি কনসালটেন্সি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন সজলকান্তি। সংস্থাটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিন্দোল গোস্বামীর বক্তব্য, বিষয়টি নিয়ে পশ্চিম বর্ধমানের জেলাশাসক এবং আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে তাঁরা কথা বলেছেন। পাশাপাশি বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং এমএসএমই দফতরের মন্ত্রীকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

ব্যবসায়ীদের মূল দাবি, বালির গ্রেডেশনকে আলাদা শিল্পপ্রক্রিয়া হিসেবে প্রশাসনিক স্বীকৃতি দেওয়া হোক। কোন উৎস থেকে বালি কেনা যাবে, কী ভাবে তা মজুত করা যাবে, কোন ধরনের মেশিন ব্যবহার করা যাবে, গ্রেডেড স্যান্ডের মান কী ভাবে যাচাই হবে এবং পরিবহণের ক্ষেত্রে কী কী নথি প্রয়োজন—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকলে সমস্যা অনেকটাই মিটবে বলে তাঁদের আশা।

অন্য দিকে, পুলিশের বক্তব্যে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন ভাবে উঠে এসেছে। আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনার প্রণব কুমার জানিয়েছেন, এটি তুলনামূলক ভাবে নতুন ধরনের শিল্প। তাই বালির উৎস এবং তার বৈধতা যাচাই করাই পুলিশের অন্যতম দায়িত্ব। তাঁর বক্তব্য, ব্যবসায়ীরা কোথা থেকে বালি কিনছেন এবং সেই বালি বৈধ ভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে কি না—তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, ব্যবসায়ীদের একাংশ যেখানে নীতিগত স্বীকৃতি ও পৃথক গাইডলাইনের অভাবকে প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখছেন, সেখানে পুলিশের নজর মূলত কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত বালির উৎস এবং তার বৈধতার নথির দিকে। দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে এই ফারাকই আপাতত সমস্যার মূল জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বালির বেআইনি উত্তোলন ও পরিবহণ নিয়ে রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক নজরদারি রয়েছে। ফলে শিল্পের প্রয়োজনে বালি ব্যবহার করা হলেও সেই বালি বৈধ উৎস থেকে এসেছে কি না, তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। ব্যবসায়ীদেরও বক্তব্য, তাঁরা বৈধ ভাবে সংগৃহীত বালি কিনেই গ্রেডেশন করতে চান। কিন্তু সেই ব্যবসার জন্য আলাদা নীতিমালা না থাকায় তাঁদের কাজ করতে গিয়ে বার বার প্রশাসনিক প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে পশ্চিম বর্ধমানে একদিকে বিনিয়োগ থমকে রয়েছে, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থানও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মহিলা শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাঁদের পরিবারের উপরও এর প্রভাব পড়ছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।

শিল্পমহলের বক্তব্য, সেমিকন্ডাক্টর, সৌরশক্তি, কাচ, নির্মাণসামগ্রী এবং জল পরিশোধনের মতো একাধিক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানের সিলিকা ও গ্রেডেড স্যান্ডের চাহিদা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। সেই বাজার ধরতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন স্পষ্ট সরকারি নীতি। শুধু ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া বা অনুমতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না।

তাই এখন নজর রাজ্য সরকারের দিকে। ব্যবসায়ীরা চাইছেন, দ্রুত একটি সুস্পষ্ট গাইডলাইন তৈরি করে এই শিল্পকে নিয়মের আওতায় আনা হোক। তাতে এক দিকে যেমন বালির বৈধ উৎস নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্য দিকে শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গ্রেডেড স্যান্ড উৎপাদনও চালু রাখা যাবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং কয়েকশো কোটি টাকার সম্ভাব্য শিল্পবাজারও পুনরায় সচল হতে পারে।

বালিকে ঘিরে বেআইনি কারবার ঠেকানো এবং শিল্পের প্রয়োজন মেটানো—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পশ্চিম বর্ধমানে তিন মাস ধরে বন্ধ থাকা ব্যবসা সেই নীতিগত শূন্যতার কথাই সামনে এনে দিয়েছে। নতুন সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার উপরই আপাতত তাকিয়ে ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পমহল।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved