
নিউজ ডেস্ক : এক দিকে নেপালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছবি, অন্য দিকে টানা বৃষ্টিতে অসমের গুয়াহাটিতেও বাড়ছে ভূমিধসের আশঙ্কা। মঙ্গলবার শহরের একাধিক এলাকায় পরপর ধসের ঘটনায় প্রাণ গেল চার জনের। তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের তিন সদস্য রয়েছেন। আরও কয়েক জন আহত হয়েছেন। প্রবল বৃষ্টির জেরে গুয়াহাটির পাহাড়ি ও ঢালু এলাকাগুলিতে পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে বলে স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে খবর।
মঙ্গলবার গুয়াহাটির নিজারাপাড়া এবং সাতগাঁও এলাকায় পৃথক ভাবে ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। নিজারাপাড়ার ঘটনায় একটি পরিবারের উপর নেমে আসে বিপর্যয়। ধসের মাটি ও ধ্বংসাবশেষের নীচে চাপা পড়ে একই পরিবারের তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পরিবারের কর্তা, তাঁর স্ত্রী এবং ১১ বছরের মেয়ে। গুরুতর আহত হয়েছেন তাঁদের ১৯ বছরের ছেলে। তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়ায়। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছন দমকলকর্মী, পুলিশ এবং জরুরি পরিষেবার কর্মীরা। তাঁদের সঙ্গে উদ্ধারকাজে হাত লাগান স্থানীয় বাসিন্দারাও। ধসের নীচে কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে দীর্ঘ সময় ধরে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলে। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকেই উদ্ধার করা হয় মৃতদের দেহ।
নিজারাপাড়ার ঘটনায় মৃতদের মধ্যে রয়েছেন ৫০ বছরের নাগেন রাজবংশী, তাঁর ৩৮ বছরের স্ত্রী সোনু রাজবংশী এবং তাঁদের ১১ বছরের মেয়ে। একই ঘটনায় তাঁদের ১৯ বছরের ছেলে বিপ্লব রাজবংশী গুরুতর আহত হয়েছেন।
প্রবল বৃষ্টির মধ্যে আচমকাই ধস নামায় পরিবারটি বিপদের মুখে পড়ে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে মাটি ও ধ্বংসাবশেষের নীচে চাপা পড়ে যায় বাড়ির একটি অংশ। খবর পেয়ে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। স্থানীয়দের সহায়তায় শুরু হয় ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ।
দুর্ঘটনার পর আহত বিপ্লবকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর শারীরিক পরিস্থিতির উপর চিকিৎসকেরা নজর রাখছেন।
একই দিনে গুয়াহাটির সাতগাঁও এলাকাতেও পৃথক ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। সেখানেও প্রাণহানির খবর মিলেছে। ধসের ঘটনায় ৬৫ বছর বয়সি এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ফলে মঙ্গলবার গুয়াহাটিতে ভূমিধসের দু’টি পৃথক ঘটনায় মোট চার জনের মৃত্যু হল। একটি ঘটনায় একই পরিবারের তিন জন এবং অন্য ঘটনায় এক বৃদ্ধার মৃত্যু পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
অসম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি বা ASDMA-র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাজ্যজুড়ে ভূমিধসের ঘটনায় মোট পাঁচ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চার জন কামরূপ মেট্রো জেলার বাসিন্দা। অন্য এক জন হাইলাকান্দি জেলার বাসিন্দা বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।
টানা বৃষ্টির কারণে রাজ্যের একাধিক জায়গায় মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় পাহাড়ি ঢাল এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গুয়াহাটির পাহাড়ঘেরা এলাকাগুলিতে পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে প্রশাসন।
বর্ষার সময়ে গুয়াহাটির পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস নতুন কোনও ঘটনা নয়। তবে একটানা ভারী বৃষ্টি হলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। পাহাড়ের ঢালে মাটির ভিতরে জল ঢুকে মাটি আলগা হয়ে যাওয়ার ফলে আচমকা বড় অংশ ভেঙে নীচে নেমে আসতে পারে। বাড়িঘর, রাস্তা কিংবা বসতিপূর্ণ এলাকায় এমন ধস নামলে বিপদের মাত্রা আরও বাড়ে।
মঙ্গলবারের পরপর ধসের ঘটনায় সেই আশঙ্কাই নতুন করে সামনে এসেছে। ইতিমধ্যেই প্রশাসনের তরফে উদ্ধার ও ত্রাণের কাজ চালানো হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানা গিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, প্রবল বৃষ্টির সময়ে পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী পরিবারগুলির মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব বাড়ি পাহাড়ের নীচে বা ধসপ্রবণ অঞ্চলের কাছাকাছি রয়েছে, সেগুলির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যেই প্রতিবেশী দেশ নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রবল বৃষ্টির জেরে একাধিক জায়গায় হড়পা বান ও ধসের ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর সামনে এসেছে। বহু মানুষ নিখোঁজ এবং উদ্ধারকাজ এখনও চলছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
নেপালের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির ছবি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। তার মধ্যেই গুয়াহাটিতে একের পর এক ভূমিধসের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
তবে দুই দেশের পরিস্থিতি সরাসরি একই ঘটনার অংশ নয়। গুয়াহাটিতে মঙ্গলবারের ধসের মূল কারণ হিসেবে স্থানীয় ভাবে প্রবল ও দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টির কথাই সামনে এসেছে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে ভারী বৃষ্টির সময়ে অসমের বেশ কিছু এলাকা এমনিতেই ধসের ঝুঁকিতে থাকে।
গুয়াহাটিতে ধসের খবর পাওয়ার পরই প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। দমকল, পুলিশ, জরুরি পরিষেবা কর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকাজে যোগ দেন। ধ্বংসস্তূপের নীচে আর কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে তল্লাশি চালানো হয়।
প্রশাসনের তরফে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রবল বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে নতুন করে কোথাও ধস নামতে পারে কি না, সেই বিষয়েও সতর্ক রয়েছে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলি।
মঙ্গলবারের ঘটনায় চার জনের মৃত্যু ইতিমধ্যেই শহরজুড়ে শোকের পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশেষ করে একই পরিবারের তিন জনের মৃত্যু স্থানীয় বাসিন্দাদের নাড়া দিয়েছে। একটি পরিবারের আনন্দের ঘর মুহূর্তে পরিণত হয়েছে শোকের জায়গায়।
প্রকৃতির এই আচমকা রুদ্ররূপ ফের মনে করিয়ে দিল, পাহাড়ি ও ধসপ্রবণ এলাকায় ভারী বৃষ্টির সময়ে সামান্য অসতর্কতাও কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি পরিস্থিতি কেমন থাকে এবং প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে কতটা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে, এখন সে দিকেই নজর।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments