Homeপূর্ব মেদিনীপুরকোলাঘাটট্রেনের ধাক্কায় বান্ধবীর মৃত্যু, আতঙ্কে জয়িতা! চিকিৎসকের পরামর্শে এখনও জানানো হয়নি সোমার মৃত্যুসংবাদ

ট্রেনের ধাক্কায় বান্ধবীর মৃত্যু, আতঙ্কে জয়িতা! চিকিৎসকের পরামর্শে এখনও জানানো হয়নি সোমার মৃত্যুসংবাদ

Screenshot 2026-08-28 152555_edited

নিউজ ডেস্ক; চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ঘটনার স্মৃতি এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে নবম শ্রেণির ছাত্রী জয়িতা খাটুয়াকে। গত মঙ্গলবার স্কুলে যাওয়ার পথে ট্রেনের ধাক্কায় ছিটকে পড়ে তার প্রিয় বান্ধবী সোমা জানা। সেই দৃশ্য নিজের চোখে দেখার পরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল জয়িতা। দুর্ঘটনায় নিজেও মাথা ও হাতে চোট পেয়েছে সে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি জয়িতা। কারণ, চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে এখনও জানানো হয়নি যে তার ছোটবেলার সঙ্গী, স্কুলের সহপাঠী এবং প্রিয় বান্ধবী সোমা আর বেঁচে নেই।

পূর্ব মেদিনীপুরের ভোগপুর কেনারাম মেমোরিয়াল হাইস্কুলের নবম শ্রেণির দুই ছাত্রী সোমা ও জয়িতার বন্ধুত্ব ছিল ছোটবেলা থেকেই। দু’জনের বাড়িও পাশাপাশি। দেড়িয়াচক গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বাঙালপুর গ্রামে পাশাপাশি বাড়িতে বড় হয়েছে তারা। স্কুলে যাওয়া, টিউশন পড়তে যাওয়া কিংবা পাড়ার নানা কাজে বেরোনো—প্রায় সব ক্ষেত্রেই একসঙ্গেই দেখা যেত তাদের। দীর্ঘদিনের সেই অভ্যাসেই মঙ্গলবার সকালেও দু’জনে পাশাপাশি স্কুলের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল।

কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে উঠল ভয়াবহ। রেললাইনের পাশের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় আচমকাই পিছন দিক থেকে চলে আসে পাঁশকুড়া লোকাল। মুহূর্তের মধ্যে ট্রেনের ধাক্কায় দু’জন ছিটকে পড়ে। দুর্ঘটনার অভিঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে ঘটনাস্থলেই গুরুতর জখম হয় সোমা। সিমেন্টের রেল স্লিপারে মাথা আঘাত করায় তার নাক ও কান দিয়ে রক্তপাত শুরু হয়। অন্যদিকে কিছুটা দূরে ছিটকে পড়েছিল জয়িতা। চোখের সামনে বান্ধবীর সেই ভয়াবহ অবস্থা দেখে আতঙ্কিত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সে।

দুর্ঘটনায় জয়িতার মাথার একটি অংশ ফুলে যায়। কনুইতেও আঘাত লাগে। পরে চিকিৎসা করিয়ে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ হলেও মানসিকভাবে এখনও প্রবল আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে কিশোরীটি। দুর্ঘটনার দু’দিন পরেও তার চোখে-মুখে ভয় স্পষ্ট। আপাতত বন্ধ রয়েছে তার স্কুলে যাওয়া এবং টিউশন। পরিবারের সদস্যরা চেষ্টা করছেন, ধীরে ধীরে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে।

তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেই রয়েছে আরও একটি কঠিন বাস্তবতা। জয়িতা এখনও জানে না যে দুর্ঘটনায় তার প্রিয় বান্ধবী সোমার মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শেই পরিবারের পক্ষ থেকে আপাতত তাকে সেই খবর দেওয়া হয়নি। আশঙ্কা, সত্যিটা আচমকা জানতে পারলে তার মানসিক অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে। তাই মেয়ের মানসিক সুস্থতাকেই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বাবা-মা পঞ্চানন ও রমা খাটুয়া।

জয়িতার বাবা পঞ্চানন খাটুয়া পেশায় হোসিয়ারি শ্রমিক। মা রমা খাটুয়া বিড়ি শ্রমিক। তাঁদের আরও একটি ছোট মেয়ে রয়েছে, সে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। সীমিত আয়ের সংসার হলেও মেয়ের চিকিৎসা ও মানসিক সুস্থতার জন্য কোনওরকম আপস করতে চাইছেন না তাঁরা। দুর্ঘটনার পর থেকে বাবা-মা দু’জনেই মেয়েকে বেশি সময় দিচ্ছেন। বৃহস্পতিবারও জয়িতাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

পঞ্চাননের কথায়, চিকিৎসার পর জয়িতা আগের তুলনায় কিছুটা ভালো রয়েছে। কিন্তু এখনও তাকে সোমার মৃত্যুর কথা জানানো হয়নি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, আপাতত মেয়েকে সময় দেওয়া হচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা মনে করছেন, শারীরিক ক্ষত সেরে ওঠার পাশাপাশি ভয়াবহ ঘটনার মানসিক অভিঘাত কাটিয়ে ওঠাটাও সমান জরুরি।

মা রমা খাটুয়ার কথায়, মেয়েকে ফিরে পাওয়াই তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়। ভবিষ্যতে জয়িতাকে আর একা স্কুলে পাঠাতে চান না তিনি। মেয়ের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন হলে নিজের কাজও ছেড়ে দেবেন বলে জানিয়েছেন রমা। তাঁর সিদ্ধান্ত, জয়িতা সুস্থ হয়ে স্কুলে ফিরলে তিনি নিজেই মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেবেন এবং ছুটির পর নিজেই তাকে বাড়িতে নিয়ে আসবেন। মেয়ের মনে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা পুরোপুরি কাটতে সময় লাগবে বলেই মনে করছে পরিবার।

জয়িতার পাশে দাঁড়িয়েছেন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও। দুর্ঘটনার পর থেকে তাঁরা নিয়মিত তার খোঁজখবর নিচ্ছেন। শিক্ষকরা বাড়িতে গিয়ে জয়িতার সঙ্গে কথা বলছেন। প্রতিবেশীরাও তার বাড়িতে এসে সাহস জোগানোর চেষ্টা করছেন। সকলেরই লক্ষ্য, ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনার স্মৃতি থেকে ধীরে ধীরে তাকে বের করে আনা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো।

এদিকে সোমা জানার মৃত্যুর ঘটনায় রেললাইনের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ওই এলাকায় রেললাইনের পাশ দিয়ে প্রতিদিন বহু মানুষ যাতায়াত করেন। নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয়দের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই রেললাইন সংলগ্ন রাস্তা ব্যবহার করতে হচ্ছে। সোমার মৃত্যুর পরেও পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।

এই পরিস্থিতিতে ভোগপুরে অবিলম্বে আন্ডারপাস ও নিরাপদ রাস্তা তৈরির দাবি উঠেছে। এলাকার বাসিন্দারা এ দিন মেচেদা আরপিএফের ওসি, পাঁশকুড়া জিআরপি থানা এবং রেলের পাঁশকুড়া ডিভিশনের এডিইএন-এর কাছে স্মারকলিপি জমা দেন। তাঁদের বক্তব্য, শুধু দুর্ঘটনার পরে শোকপ্রকাশ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। রেললাইন পারাপারের ঝুঁকি কমাতে স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

স্থানীয় নাগরিকদের পক্ষে নারায়ণচন্দ্র নায়কের অভিযোগ, সোমার মৃত্যুর পরেও রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় মানুষের চলাচলের পরিস্থিতি বদলায়নি। এখনও অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেললাইনের গা ঘেঁষে যাতায়াত করছেন এবং রেললাইন পার হচ্ছেন। তাই ভবিষ্যতে যাতে আর কোনও পরিবারের সন্তানকে এমন দুর্ঘটনার শিকার হতে না হয়, সে জন্য দ্রুত আন্ডারপাস তৈরির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

একদিকে প্রিয় বান্ধবীকে হারানোর শোক, অন্যদিকে সেই সত্য এখনও না-জানা এক কিশোরীর আতঙ্ক—ভোগপুরের এই ঘটনায় একসঙ্গে সামনে এসেছে দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এবং নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা। জয়িতা কবে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আবার স্কুলে ফিরবে, কবে তাকে সোমার মৃত্যুর সত্যিটা জানানো সম্ভব হবে, সেই অপেক্ষায় পরিবার। একই সঙ্গে স্থানীয়দের দাবি, সোমার মৃত্যু যেন শুধুই একটি দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান হয়ে না থাকে। রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া হোক।

No Comments

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved