
নিউজ ডেস্ক : চলন্ত ট্রেনে অসাবধানতাবশত ফেলে আসা ব্যাগে ছিল পরিবারের সঞ্চিত সোনার গয়না, গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং নগদ টাকা। ট্রেন স্টেশন ছেড়ে এগিয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি বুঝতে পেরে কার্যত মাথায় হাত পড়েছিল পরভিনা খাতুনের। কিন্তু সময় নষ্ট না করে রেল মদদ পোর্টালে অভিযোগ জানাতেই দ্রুত নড়েচড়ে বসে পূর্ব রেল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চলন্ত ট্রেনের কামরা থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার হল সেই ব্যাগ। পরে প্রায় ৬ লক্ষ ১০ হাজার টাকা মূল্যের সামগ্রী যাচাই করে মালিকের হাতে ফিরিয়ে দিল রেল সুরক্ষা বাহিনী বা RPF।
ঘটনাটি ঘটেছে পূর্ব রেলের আওতাধীন আগ্রদ্বীপ রেলওয়ে স্টেশনকে কেন্দ্র করে। জানা গিয়েছে, কাটোয়া-ব্যান্ডেল লোকালে সফর করছিলেন পরভিনা খাতুন। আগ্রদ্বীপ স্টেশনে ট্রেন থেকে নামার পরই তাঁর খেয়াল হয়, বাদামি রঙের হ্যান্ডব্যাগটি তিনি ট্রেনের দরজার কাছে ফেলে এসেছেন। ততক্ষণে ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে এগিয়ে গিয়েছে। ব্যাগটির ভিতরে কী ছিল, তা মনে পড়তেই স্বাভাবিক ভাবেই উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
কারণ ওই ব্যাগে ছিল পরিবারের মূল্যবান সোনার অলঙ্কার। পাশাপাশি ছিল গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত নথিপত্র, পাসবই এবং নগদ অর্থ। ফলে ব্যাগটি ফিরে পাওয়া তাঁর কাছে অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে কোনও রকম দেরি না করে রেল মদদ পোর্টালের মাধ্যমে জরুরি অভিযোগ জানান পরভিনা।
অভিযোগ পৌঁছয় নবদ্বীপ ধাম RPF পোস্টে। এরপর শুরু হয় দ্রুত তৎপরতা। পূর্ব রেলের জেনারেল ম্যানেজার গীতিকা পাণ্ডের নেতৃত্বে এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা আধিকারিকদের তত্ত্বাবধানে অভিযোগটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। চলন্ত ট্রেনের কামরায় ব্যাগটি পড়ে রয়েছে—এই তথ্য হাতে আসার পর মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ট্রেনটি পরবর্তী কোথায় পৌঁছবে এবং তার আগেই কী ভাবে ব্যাগটি উদ্ধার করা যায়।
রেলের তরফে জানানো হয়েছে, ট্রেন নম্বর ৩৭৭৪৮ DN দুপুর ২টা ৩৭ মিনিট নাগাদ নবদ্বীপ ধাম স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ঢোকে। ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে আসার সঙ্গে সঙ্গেই নবদ্বীপ ধাম RPF পোস্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর পি. কে. দাস এবং কনস্টেবল সঞ্জয় ঘোষ দ্রুত নির্দিষ্ট কামরায় উঠে পড়েন। যাত্রীদের ভিড় এবং চলন্ত ট্রেনের পরিস্থিতির মধ্যে তাঁরা কামরাটি খুঁজে দেখেন।
শেষ পর্যন্ত তাঁদের তল্লাশিতে মিলেও যায় সেই বাদামি হ্যান্ডব্যাগ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ব্যাগটি অক্ষত অবস্থাতেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়। দ্রুত পদক্ষেপ না করলে ব্যাগটি অন্য কোনও জায়গায় চলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সেই আশঙ্কা এড়িয়ে RPF কর্মীরা ব্যাগটি নিজেদের হেফাজতে নেন।
এর পরেও অবশ্য প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। ব্যাগের প্রকৃত মালিক কে, তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় যাচাই করা হয়। বিকেল সাড়ে ৩টে নাগাদ পরভিনা খাতুন তাঁর মাকে সঙ্গে নিয়ে নবদ্বীপ ধাম RPF পোস্টে পৌঁছন। দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর সেখানে নিজের ব্যাগ দেখতে পেয়ে স্বস্তি ফেরে তাঁর মুখে।
রেলের তরফে জানানো হয়েছে, যথাযথ পরিচয় ও মালিকানা যাচাইয়ের পর পরভিনার উপস্থিতিতেই ব্যাগটি খোলা হয়। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে তা ভিডিয়ো করা হয়েছিল বলেও জানানো হয়েছে। ব্যাগ খুলে দেখা যায়, তার ভিতরে একাধিক সোনার অলঙ্কার-সহ গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং নগদ টাকা রয়েছে।
উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর তালিকায় ছিল দুই জোড়া সোনার কানের দুল, দুটি সোনার আংটি, তিনটি নাকের নথ, একটি সোনার চেন এবং এক জোড়া সোনার চুড়ি। এর পাশাপাশি ছিল ব্যাঙ্কের পাসবই, গ্যাস সংযোগ সংক্রান্ত নথিপত্র এবং নগদ অর্থ। রেলের হিসাব অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া সমস্ত সামগ্রীর মোট মূল্য প্রায় ৬ লক্ষ ১০ হাজার টাকা।
শেষ পর্যন্ত নবদ্বীপ ধাম RPF পোস্ট কমান্ডারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে যাবতীয় সামগ্রী নিরাপদে পরভিনা খাতুনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর নিজের মূল্যবান জিনিসপত্র ফিরে পেয়ে স্বাভাবিক ভাবেই স্বস্তি প্রকাশ করেন তিনি। একটি ভুলের কারণে যে বড়সড় আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, দ্রুত রেল পুলিশের তৎপরতায় তা এড়ানো গেল।
পূর্ব রেলের তরফে এই ঘটনাকে ‘অপারেশন আমানত’-এর অধীনে যাত্রীদের হারিয়ে যাওয়া বা ফেলে আসা মূল্যবান সামগ্রী উদ্ধারের ক্ষেত্রে RPF-এর তৎপরতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, যাত্রীদের সম্পত্তি সুরক্ষা এবং রেল পরিষেবাকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে এই ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দলের দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করে পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক শিবরাম মাঝি জানান, ‘অপারেশন আমানত’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে পূর্ব রেল যাত্রীদের সম্পত্তি সুরক্ষা এবং প্রতিদিন দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য পরিষেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বজায় রাখছে।
পাশাপাশি RPF-এর তরফে জানানো হয়েছে, পূর্ব রেলের জেনারেল ম্যানেজার গীতিকা পাণ্ডের নির্দেশনায় এবং IG-cum-Principal Chief Security Commissioner অমিয় নন্দন সিনহার তত্ত্বাবধানে ‘অপারেশন আমানত’-এর মাধ্যমে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও তাঁদের সম্পত্তি রক্ষায় কাজ চলছে।
এই ঘটনা যাত্রীদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে গেল। ট্রেন থেকে নামার সময় ব্যাগ, মোবাইল, নথি বা অন্য কোনও মূল্যবান সামগ্রী সঙ্গে রয়েছে কি না, তা একবার দেখে নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে দরজার কাছে বা সিটের নীচে রাখা ব্যাগ অনেক সময় তাড়াহুড়োয় চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। তবে কোনও কারণে জিনিসপত্র ট্রেনে ফেলে এলেও আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত রেল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পরভিনা খাতুনের ক্ষেত্রে সেই দ্রুত পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত বড় বিপদ এড়াতে সাহায্য করেছে। অভিযোগ জানানোর পর RPF-এর তৎপরতা, চলন্ত ট্রেনের নির্দিষ্ট কামরা চিহ্নিত করে তল্লাশি এবং পরে নিয়ম মেনে সামগ্রী ফেরত—সব মিলিয়ে যাত্রী সহায়তার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত তৈরি হল। পাঁচ-ছয় লক্ষ টাকার সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার পর তাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন পরভিনা। আর ‘অপারেশন আমানত’-এর মাধ্যমে ফের এক বার সামনে এল রেল পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপের ছবি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments