
নিউজ ডেস্ক : জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অনেকেরই মন ফিরে যেতে চায় ফেলে আসা দিনগুলিতে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানের ব্যস্ততার চেয়ে স্মৃতির পাতায় জমে থাকা মুখগুলিই যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময় যাঁদের সঙ্গে দিনের পর দিন কেটেছে, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া হয়েছে, সময়ের স্রোতে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও স্মৃতির ভিতর থেকে সেই মানুষগুলি হারিয়ে যান না। উত্তরপাড়ার এমনই এক প্রবীণ বাসিন্দার বহু বছরের অপেক্ষার অবসান হল হ্যাম রেডিয়োর সদস্যদের উদ্যোগে। প্রায় পাঁচ দশক পর পুরনো সহপাঠী এবং তাঁর দিদির সঙ্গে ফের যোগাযোগ তৈরি হল ৭৩ বছরের সত্যজিৎ সরকারের।
উত্তরপাড়ার একটি স্পোর্টিং ক্লাবের পাশের বাড়িতে একাই থাকেন সত্যজিৎবাবু। একসময় মাঠে দাপিয়ে ফুটবল খেলেছেন। পরে রেলের চাকরিতে কর্মজীবন কাটিয়ে অবসর নিয়েছেন। জীবনের নানা ওঠাপড়া পেরিয়ে এখন তাঁর সঙ্গী মূলত পুরনো দিনের স্মৃতি। বয়সের ভারে থেমে থাকা জীবনের ফাঁকে ফাঁকে বার বার ফিরে আসছিল সেই কলেজজীবন। ফিরে আসছিল কয়েকটি পরিচিত মুখ, কয়েকটি ঘটনা এবং এমন কিছু সম্পর্ক, যার সঙ্গে প্রায় অর্ধশতক ধরে কোনও যোগাযোগ নেই।
সালটা ১৯৭২। হাওড়ার লালবাবা কলেজের ছাত্রজীবন। সেই সময় ছাত্র পরিষদের নেতা হিসেবে সক্রিয় ছিলেন সত্যজিৎ সরকার। কলেজের দিনগুলিতে বহু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তাঁর। তাঁদের মধ্যেই ছিলেন সহপাঠী আশিস ঘোষ এবং আশিসবাবুর দিদি সর্বাণী। পড়াশোনার ক্ষেত্রে একসময় তাঁদের কাছ থেকেও সাহায্য পেয়েছিলেন সত্যজিৎবাবু। কলেজের সেই দিনগুলি তখন হয়তো ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। কে জানত, সময়ের সঙ্গে সেই পরিচিত মুখগুলিই একদিন হয়ে উঠবে বহু দূরের স্মৃতি!
কলেজ শেষ হয়েছে। জীবনের পথ বদলেছে। কর্মজীবন, সংসার এবং নানা দায়িত্বের মধ্যে প্রত্যেকে নিজের মতো করে এগিয়ে গিয়েছেন। সেই ব্যস্ততার মধ্যেই কোথাও হারিয়ে গিয়েছে পুরনো যোগাযোগ। বছর পেরিয়ে দশক হয়েছে। প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ বছর ধরে আশিস ঘোষ এবং তাঁর দিদি সর্বাণীর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ ছিল না সত্যজিৎবাবুর। ফোন নম্বর নেই, ঠিকানা নেই—ছিল শুধু নাম এবং বহু পুরনো স্মৃতি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সেই স্মৃতিই যেন আরও বেশি করে টানতে শুরু করে তাঁকে। একা বসে অতীতের কথা ভাবতে ভাবতে মনে হচ্ছিল, এত বছর পরে কি আর তাঁদের খুঁজে পাওয়া সম্ভব? যোগাযোগের সব পুরনো রাস্তা যখন বন্ধ, তখন নতুন প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়ার কথা ভাবেন তিনি। সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ করেন ‘পশ্চিমবঙ্গ রেডিয়ো ক্লাব’-এর সদস্যদের সঙ্গে। হ্যাম রেডিয়োর পরিচিতি মূলত দূর-দূরান্তের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির সঙ্গে জড়িত। সত্যজিৎবাবুর ক্ষেত্রে সেই যোগাযোগের মাধ্যমই হয়ে উঠল হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক খোঁজার আশার জায়গা।
প্রবীণ মানুষটির আকুলতার কথা জানতে পেরে বিষয়টিকে নিছক একটি খোঁজখবরের ঘটনা হিসেবে দেখেননি ক্লাবের সদস্যরা। সম্পাদক অম্বরীশ নাগ বিশ্বাসের নেতৃত্বে শুরু হয় অনুসন্ধান। হাতে ছিল কয়েক দশক আগের নাম, কলেজের স্মৃতি এবং কিছু টুকরো তথ্য। এত পুরনো তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে খুঁজে বার করা যে সহজ নয়, তা জানতেন তাঁরা। তবুও চেষ্টা থামেনি।
একদিকে পুরনো পরিচয়ের সূত্র, অন্য দিকে সম্ভাব্য ঠিকানা—এ ভাবেই এগোতে থাকে খোঁজ। বহু বছর আগের একটি সম্পর্কের সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালানো হয়। শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টাই সাফল্যের মুখ দেখে। ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের সদস্য সোনা রজকের অনুসন্ধানে কলকাতার টবিন রোড এলাকা থেকে খোঁজ মেলে আশিস ঘোষ এবং তাঁর দিদি সর্বাণীর।
প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরে হারিয়ে যাওয়া দুই পরিচিত মানুষের সন্ধান পাওয়া সত্যজিৎবাবুর কাছে নিঃসন্দেহে আবেগের মুহূর্ত। যে দুই মানুষকে এতদিন শুধু স্মৃতির পাতায় দেখতে পেয়েছেন, তাঁদের বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যেন জীবনের পুরনো একটি অধ্যায়ের দরজা আবার খুলে যাওয়ার মতো। কলেজের সেই দিনগুলির কত কথা যে জমে রয়েছে—কত ঘটনা, কত হাসি, কত না বলা কথা—সেগুলিই হয়তো ফের একবার আলোচনায় আসবে।
এই ঘটনা আরও একবার মনে করিয়ে দিল, সময় সম্পর্কের দূরত্ব বাড়াতে পারে, কিন্তু স্মৃতিকে সবসময় মুছে দিতে পারে না। পাঁচ দশক আগে তৈরি হওয়া একটি পরিচয়ও কোনও একাকী মানুষের জীবনের শেষ পর্বে এসে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, সত্যজিৎবাবুর গল্প তারই প্রমাণ। জীবনের ব্যস্ত সময়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের অনেক সময় খুঁজে পাওয়ার ইচ্ছেটাও হারিয়ে যায়। কিন্তু ইচ্ছেটা যদি থেকে যায়, কোনও না কোনও পথ হয়তো খুলে যায়।
সত্যজিৎবাবুর ক্ষেত্রেও সেই পথ তৈরি হয়েছে প্রযুক্তি এবং মানুষের উদ্যোগের মিলনে। সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে হ্যাম রেডিয়ো ক্লাবের সদস্যদের কাছে পৌঁছনো থেকে শুরু করে টবিন রোডে আশিস ঘোষ ও সর্বাণীর সন্ধান পাওয়া—পুরো ঘটনাটিই যেন একটি দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ অধ্যায়। একসময় কলেজের করিডরে পাশাপাশি চলা মানুষগুলি পাঁচ দশক পরে আবার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেলেন।
জীবনের শেষবেলায় ফিরে দেখা অতীত তাই শুধু নস্টালজিয়া নয়, কখনও কখনও তা হয়ে ওঠে নতুন করে পুরনো সম্পর্ক ফিরে পাওয়ার গল্প। উত্তরপাড়ার ৭৩ বছরের সত্যজিৎ সরকারের জীবনে হ্যাম রেডিয়োর হাত ধরে তেমনই একটি অসম্ভব মনে হওয়া দরজা খুলে গেল। হারিয়ে যাওয়া সহপাঠীর খোঁজ মিলল, ফিরে এল পাঁচ দশক আগের কলেজজীবনের স্মৃতি—আর সেই সঙ্গে হয়তো ফিরল জীবনের একটি পুরনো, অথচ অমূল্য অধ্যায়ের উষ্ণতাও।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments