Last updated: August 29th, 2026 at 11:10 am

নিউজ ডেস্ক: প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ের গায়ে বড় ও স্পষ্ট হরফে সতর্কতামূলক লেবেল বসানোর পরিকল্পনা থেকে শেষ পর্যন্ত সরে এল ভারত সরকার। শিল্পমহল ও বহুজাতিক খাদ্য প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির প্রবল আপত্তির মুখেই এই সিদ্ধান্ত বদল করতে বাধ্য হয়েছে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (FSSAI)। আন্তর্জাতিক বাজারে যে সমস্ত বহুজাতিক সংস্থা কড়া স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা করে পণ্য বিক্রি করে, ভারতে তাদেরই পণ্যে অতিরিক্ত চিনি, নুন এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একই ব্র্যান্ডের খাবার অথচ ইউরোপ বা পাশ্চাত্য দেশের সঙ্গে ভারতের সংস্করণের আকাশ-পাতাল তফাত—এই গুরুতর অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই দ্বিমুখী নীতির ফলে সাধারণ মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয় বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ পণ্যেই অতিরিক্ত পরিমাণে চিনি, ফ্যাট বা সোডিয়াম রয়েছে। ল্যান্সেটের একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস দিয়ে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৪৫ কোটি ভারতীয় স্থূলতা বা ওবেসিটির শিকার হতে পারেন। এই পরিস্থিতিতে খাবারের প্যাকেটের সামনের দিকে রঙিন বা সহজে বোধগম্য সতর্কবার্তা থাকা কতটা জরুরি, তা নিয়ে দেশজুড়ে জোরালো বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশে ইতিমধ্যে এই ধরনের ‘ট্র্যাফিক লাইট’ বা রঙের ভিত্তিতে সতর্কবার্তা চালুর ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ভারতে তা রূপায়ণের পথেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাণিজ্যিক স্বার্থ।
আন্তর্জাতিক মান এবং ভারতীয় সংস্করণের বৈষম্য নিয়ে অতীতেও সোচ্চার হয়েছেন ফুড ইনফ্লুয়েন্সাররা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ফুড ফার্মার’ হিসেবে পরিচিত রেভান্ত হিমতসিংকা একাধিক জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের পণ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন এই চাঞ্চল্যকর তফাত। উদাহরণস্বরূপ, লন্ডনে বিক্রিত এক ক্যান ফান্টায় যত ক্যালোরি বা চিনি থাকে, ভারতে বিক্রি হওয়া একই পানীয়ে তার পরিমাণ প্রায় তিন গুণ। শুধু তাই নয়, ভারতীয় ফান্টায় এমন কৃত্রিম রং ও উপাদান ব্যবহার করা হয়, যার জন্য ইউরোপের বাজারে প্যাকেটের গায়ে কড়া স্বাস্থ্য সতর্কতা ছাপানো বাধ্যতামূলক। অথচ ভারতে সেই একই তথ্য অত্যন্ত ছোট হরফে প্যাকেটের পিছনে লুকিয়ে রাখা হয়, যা সাধারণ ক্রেতার চোখ এড়িয়ে যায়। একইভাবে কিটক্যাটে কোকোর পরিমাণ বিদেশ ও দেশের বাজারের মধ্যে ফারাক তৈরি করে, কিংবা ম্যাগি ও এনার্জি ড্রিংক ক্যাটাগরির স্টিং পানীয় নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কও জনমানসে প্রশ্ন তুলেছে।
খাবারের লেবেলে স্বচ্ছতা আনার জন্য চলতি বছরের গোড়ায় সুপ্রিম কোর্ট FSSAI-কে নতুন করে এই বিষয়টি বিবেচনা করতে নির্দেশ দেয়। আদালত স্পষ্টভাবে জানায়, দেশের নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারের আরও কঠোর হওয়া উচিত। কিন্তু এর পরেই গত মার্চ মাসে খাদ্যশিল্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ে বৈঠকে বসে FSSAI। সেই বৈঠকে কোকা-কোলার মতো বৃহৎ সংস্থার আধিকারিকরা দাবি করেন, শুধুমাত্র রঙিন প্রতীক বা সতর্কবার্তা দেখে ক্রেতারা স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেবেন—এমন ধারণা অত্যন্ত সরলীকৃত। তাঁদের মতে, লেবেলে সতর্কবার্তা দিলেও তা অতিরিক্ত চিনি বা নুন খাওয়া আটকাতে পারে না, বরং মানুষের খাদ্যাভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ আনা জরুরি। শিল্পমহলের এই লবির চাপের কাছেই শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আদালতের কাছে জমা দেওয়া রিপোর্টে FSSAI জানায়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই ধরনের লেবেলিং করা বর্তমান পরিস্থিতিতে কঠিন। রঙিন সতর্কবার্তার পরিবর্তে কেবল কালো-সাদা পুষ্টিগুণ সংক্রান্ত টেবিল রাখার প্রস্তাবই বহাল রাখা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে বলেছেন যে, প্রক্রিয়াজাত খাবারে থাকা অতিরিক্ত সোডিয়াম ও রিফাইন্ড শ্যুগার পরবর্তীতে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের মতো মারণব্যাধির ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ বাণিজ্যিক মুনাফার কথা মাথায় রেখে বহুজাতিক সংস্থাগুলি বিদেশি বাজারে এক নীতি এবং ভারতীয় বাজারে সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতি অনুসরণ করে চলেছে। ইসরায়েল কিংবা লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশে প্যাকেটজাত খাবারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে ক্রেতাদের সচেতন করতে লাল রঙের বিশেষ সতর্কীকরণ চিহ্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ভারতের মতো বিশাল জনবহুল বাজারেও এই ধরনের স্বচ্ছতা জরুরি বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি যেভাবে পিছু হঠছে, তাতে জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন আরও গভীর হচ্ছে।
যদিও সরকারের এই অবস্থান বদল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আদালত। অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন রাজ্যেও এই নিয়ে কড়া পদক্ষেপের চিত্র দেখা যাচ্ছে। মহারাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) সম্প্রতি রাজ্যের সমস্ত স্কুলের ক্যান্টিনে উচ্চ ফ্যাট, চিনি ও নুনযুক্ত খাবার বিক্রির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কমিশনার তুকারাম মুন্ধের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের মধ্যবিত্ত সমাজের একটা বড় অংশের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ছে। ওজন কমাতে বা মেদ ঝরাতে আধুনিক ওষুধের বিক্রি এক ধাক্কায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি, নেসলের মতো সংস্থা ভারতে চিনি-মুক্ত সেরেল্যাক আনার ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের সাফ কথা, প্যাকেটজাত খাবারের প্যাকেটে যদি স্পষ্ট ও বড় হরফে সতর্কবার্তা না থাকে, তবে ক্রেতারা প্রতিনিয়ত অন্ধকারে থেকে যাবেন এবং বহুজাতিক সংস্থাগুলির এই বাণিজ্যিক দ্বিমুখী নীতি থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
contact@ngtvnews.com
+৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯
আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
কলকাতা - ৭০০০৯১
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments