Homeদেশআইফোন নয়, কুণালের মৃত্যুর নেপথ্যে অন্য কারণ? মহারাষ্ট্রের ঘটনায় নতুন তথ্য

আইফোন নয়, কুণালের মৃত্যুর নেপথ্যে অন্য কারণ? মহারাষ্ট্রের ঘটনায় নতুন তথ্য

নিউজ ডেস্ক: মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে একই পরিবারের তিন সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন মোড়। ১৮ বছরের কুণাল চন্দগুড়ে, তাঁর বাবা
পণের দাবিতে (6)

নিউজ ডেস্ক: মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে একই পরিবারের তিন সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন মোড়। ১৮ বছরের কুণাল চন্দগুড়ে, তাঁর বাবা মুরলীধর চন্দগুড়ে এবং মা সঙ্গীতা চন্দগুড়ের মৃত্যু ঘিরে প্রথম দিকে যে কারণটি সামনে এসেছিল, তদন্তে তার সঙ্গে পুরোপুরি মিল পাওয়া যাচ্ছে না বলেই জানিয়েছে পুলিশ। বিশেষ করে কুণালের কাছে আইফোন চাওয়া এবং তা নিয়ে পরিবারের সঙ্গে অশান্তির বিষয়টিকে মৃত্যুর একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছে না তদন্তকারীরা।

ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের তিসগাঁও এলাকার খাবদিয়া পাহাড়ে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই স্থানীয় স্তরে নানা ধরনের দাবি এবং জল্পনা ছড়িয়েছে। কিন্তু পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে সেই জল্পনার বাইরে উঠে আসছে পরিবারের দীর্ঘদিনের টানাপড়েন, আর্থিক বিষয় নিয়ে অশান্তি এবং কুণালের মানসিক চাপের প্রসঙ্গ। ডিসিপি রত্নাকর নাভাল জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত এমন কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি, যার ভিত্তিতে বলা যায় যে শুধুমাত্র আইফোন না পাওয়ার কারণেই কুণাল এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

ঘটনার দিন পাহাড়ের কাছে পৌঁছে কুণালকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন তাঁর বাবা-মা, স্থানীয় কয়েকজন এবং পঞ্চায়েতের প্রতিনিধিরাও। কুণালকে সেখান থেকে সরে আসার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ছেলেকে নিরাপদে সরিয়ে আনার চেষ্টা করতে গিয়ে তাঁর বাবা মুরলীধরও দুর্ঘটনাবশত গভীর খাদে পড়ে যান। এরপর স্ত্রী সঙ্গীতাও ঘটনাস্থলে ছুটে যান। শেষ পর্যন্ত তিনজনেরই মৃত্যু হয়।

আইফোন নিয়ে যে দাবি, তা কি সত্যি?

ঘটনার পর প্রথম যে তথ্যটি সামনে আসে, তাতে বলা হয়েছিল, আইফোন কেনা নিয়ে বাবা-ছেলের মধ্যে অশান্তি হয়েছিল। সেই বিষয় থেকেই কুণাল মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলে একটি দাবি ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তদন্ত যত এগিয়েছে, সেই ব্যাখ্যাকে আর একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না।

ডিসিপি রত্নাকর নাভালের বক্তব্য অনুযায়ী, জরুরি নম্বরে খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। স্থানীয় মানুষজনও সেখানে ছিলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে দমকল এবং অ্যাম্বুল্যান্সও ডাকা হয়েছিল। কুণালকে বোঝানোর জন্য চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

পুলিশের বক্তব্য, তরুণটি যথেষ্ট মানসিক চাপে ছিলেন বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে। তবে সেই চাপের নির্দিষ্ট কারণ কী, তা এখনও নিশ্চিত ভাবে বলা যাচ্ছে না। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও একটি ঘটনাকে মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছে না পুলিশ।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তথা প্রাক্তন সরপঞ্চ সঞ্জয় যাদবও আইফোন সংক্রান্ত দাবির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তাঁর দাবি, কুণালের কাছে আগে থেকেই একটি আইফোন ছিল। পাহাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়ও কুণালকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু কোনও অনুরোধেই সাড়া দেননি ওই তরুণ।

পরিবারের অশান্তির ইতিহাস

তদন্তে কুণালের পারিবারিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আত্মীয়দের দাবি, চন্দগুড়ে পরিবারে বেশ কিছু বছর ধরেই নানা কারণে অশান্তি চলছিল। কুণালের বাবা মুরলীধর পেশায় ট্রাকচালক ছিলেন। কাজের প্রয়োজনে তাঁকে প্রায়ই বাড়ির বাইরে থাকতে হত। ফলে পরিবারের সঙ্গে তাঁর সময় কাটানোও তুলনামূলক ভাবে কম ছিল।

পরিবারের আরও একটি বড় ধাক্কা এসেছিল প্রায় ছয় বছর আগে। কুণালের দাদা অসুস্থতার কারণে মারা যান। আত্মীয়দের বক্তব্য, সেই ঘটনার পর থেকেই পরিবারের পরিবেশে পরিবর্তন আসে এবং নানা বিষয়ে অশান্তি বাড়তে থাকে।

ঘটনার কয়েক দিন আগে মুরলীধর বাড়িতে ফিরেছিলেন। তার পরেই বাবা ও ছেলের মধ্যে কোনও একটি বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছিল বলে দাবি করেছেন আত্মীয়রা। কুণালের সঙ্গে তাঁর বাবার সম্পর্কও সবসময় স্বাভাবিক ছিল না বলে তাঁদের বক্তব্য।

টাকা-পয়সা নিয়েও অশান্তির দাবি

শুধু মোবাইল ফোন বা আইফোন নয়, টাকা-পয়সা নিয়েও বাবা-ছেলের মধ্যে আগে থেকে মতবিরোধ ছিল বলে জানা যাচ্ছে। কুণাল পর্যাপ্ত হাতখরচ না পাওয়া নিয়ে বাবার সঙ্গে অসন্তোষ প্রকাশ করতেন বলে আত্মীয়দের একাংশের দাবি। মোবাইল ফোনের কিস্তি বা বকেয়া টাকা নিয়েও তাঁদের মধ্যে একাধিক বার কথা কাটাকাটি হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।

ঘটনার দিন ফের বাবা-ছেলের মধ্যে অশান্তি হয়। তার পরেই কুণাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। পরে তিনি পাহাড়ের দিকে চলে গিয়েছেন জানতে পেরে তাঁর বাবা-মাও সেখানে পৌঁছন। সেখানে গিয়ে তাঁরা ছেলেকে বাড়ি ফিরে আসার জন্য বোঝাতে থাকেন।

মা সঙ্গীতাও ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। এমনকি বাবার সঙ্গে কোনও সমস্যা থাকলে আলাদা ভাবে থাকার ব্যবস্থা করার কথাও তাঁকে বলা হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষ এবং পঞ্চায়েতের প্রতিনিধিরাও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন।

তদন্তে এখন কোন দিকগুলি গুরুত্বপূর্ণ?

এই ঘটনায় এখন পুলিশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ঠিক কী কারণে কুণাল এতটা মানসিক চাপে ছিলেন। আইফোনের প্রসঙ্গটি সামনে এলেও সেটিই যে মূল কারণ নয়, পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে তা স্পষ্ট। পরিবারের পুরনো অশান্তি, আর্থিক টানাপড়েন, বাবা-ছেলের সম্পর্ক এবং ঘটনার আগের কয়েক দিনের পরিস্থিতি—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে এই ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রত্যুত্তর দেওয়ার মতো পরিবারের কেউ আর জীবিত নেই। ফলে তদন্তকারীদের কাছে প্রত্যক্ষ তথ্যের ঘাটতিও রয়েছে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের উপর অনেকটাই নির্ভর করতে হচ্ছে পুলিশকে।

কুণালের পড়াশোনার ক্ষেত্রেও তিনি মেধাবী ছিলেন বলে পরিবারের তরফে জানা গিয়েছে। দশম শ্রেণির পরীক্ষায় তাঁর ভালো ফল ছিল। ফলে এমন একজন তরুণ কী কারণে আচমকা এতটা মানসিক চাপে চলে গেলেন, সেই প্রশ্নই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পুলিশের তরফে এখনও ঘটনার চূড়ান্ত কারণ জানানো হয়নি। তাই আইফোনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া প্রাথমিক গল্পের বদলে পরিবারের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং কুণালের মানসিক অবস্থার দিকেই এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তদন্তকারীরা। তদন্ত সম্পূর্ণ হলে তবেই এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রকৃত নেপথ্য কারণ স্পষ্ট হবে।

No Comments

তাজা খবর