
নিউজ ডেস্ক: ভারতের মহাকাশ গবেষণার পরিসরে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। এত দিন কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি থেকে শুরু করে উৎক্ষেপণ যান নির্মাণ—মহাকাশ কর্মসূচির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব মূলত সামলেছে ISRO। কিন্তু কেন্দ্রের নতুন নীতিতে ধীরে ধীরে সেই ছবিই বদলাতে চলেছে। সাধারণ ধরনের স্যাটেলাইট এবং নির্দিষ্ট উৎক্ষেপণ যান তৈরির দায়িত্ব বেসরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার পথে এগোচ্ছে সরকার। ফলে মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে ইসরোর ভূমিকা আরও বেশি করে গবেষণা, উন্নত প্রযুক্তি এবং জটিল বৈজ্ঞানিক অভিযানের দিকে কেন্দ্রীভূত হতে পারে।
এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। একাংশের মতে, মহাকাশ ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতা বাড়লে ভারতের মহাকাশ অর্থনীতি দ্রুত বিস্তৃত হতে পারে। অন্য দিকে, ইসরোর প্রাক্তন বিজ্ঞানী ও গবেষকদের একাংশের আশঙ্কা, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখতে না পারলে ভবিষ্যতে এই পরিবর্তন উল্টো চাপ তৈরি করতে পারে দেশের ঐতিহ্যবাহী মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপর।
ইন-স্পেসের চেয়ারম্যান পবন গোয়েন্কার বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরোর কাজের ধরন ইতিমধ্যেই বদলাতে শুরু করেছে। তাঁর যুক্তি, সাধারণ ধরনের উপগ্রহ বা প্রচলিত উৎক্ষেপণ যান তৈরির কাজে ইসরোর বিপুল বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো দীর্ঘদিন ধরে ব্যস্ত থাকলে জটিল গবেষণা এবং নতুন প্রযুক্তি তৈরির ক্ষেত্রে সময় ও সম্পদের চাপ তৈরি হতে পারে।
সেই কারণেই সাধারণ উৎপাদনমূলক কাজ ধীরে ধীরে শিল্পক্ষেত্রে ছেড়ে দিয়ে ইসরোকে আরও উন্নত মহাকাশ গবেষণায় মন দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অর্থাৎ, ইসরোর ভূমিকা কমিয়ে দেওয়া নয়, বরং দায়িত্বের চরিত্র বদল করাই এই নীতির অন্যতম উদ্দেশ্য—এমনটাই কেন্দ্রীয় মহলের বক্তব্য।
এই পরিকল্পনার প্রথম বড় উদাহরণ হিসেবে উঠে আসছে স্মল স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল বা SSLV। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর প্রযুক্তি ও উৎপাদনের অধিকার হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়েছে।
SSLV-এর পর আরও বড় পরিবর্তনের দিকে নজর রয়েছে। পবন গোয়েন্কার বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে PSLV এবং LVM-3-এর প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থাতেও বেসরকারি সংস্থাকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষ করে LVM-3 ভারতের অন্যতম শক্তিশালী উৎক্ষেপণ যান। ফলে এর মতো প্রযুক্তির উৎপাদন ব্যবস্থায় বেসরকারি সংস্থার প্রবেশ নিঃসন্দেহে দেশের মহাকাশ শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে।
সরকারি পরিকল্পনার পক্ষে যুক্তি হল, ইসরো যদি নিয়মিত উৎপাদনের দায়িত্ব থেকে ধীরে ধীরে সরে আসে, তা হলে সংস্থার বিজ্ঞানীরা আরও বেশি সময় দিতে পারবেন উন্নত প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক অভিযান, মহাকাশভিত্তিক পরিকাঠামো এবং ভবিষ্যতের উচ্চাভিলাষী মিশনে।
তবে এই মডেলের বাস্তব প্রয়োগ কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্নও থাকছে। কারণ PSLV বা LVM-3-এর মতো উৎক্ষেপণ যানের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত নির্ভুলতা, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইন-স্পেসের তরফে দাবি করা হয়েছে, ইসরো ইতিমধ্যেই একাধিক বেসরকারি সংস্থাকে বহু প্রযুক্তি হস্তান্তর করেছে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১২০টি প্রযুক্তি বিভিন্ন সংস্থার কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হয়েছে।
শুধু প্রযুক্তি নয়, মহাকাশ উৎক্ষেপণ পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেও বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একটি উৎক্ষেপণ কেন্দ্র বেসরকারি শিল্পের হাতে দেওয়ার বিষয়ে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত হতে পারে বলেও দাবি করা হয়েছে।
এই নীতির মূল লক্ষ্য তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে—সরকারি চাহিদা, শিল্পক্ষেত্রে মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় সংস্থার সম্প্রসারণ। সরকারি চাহিদাকে এখানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ প্রথম দিকে বেসরকারি সংস্থাগুলির জন্য সবচেয়ে বড় ক্রেতা হতে পারে কেন্দ্রই।
মহাকাশ ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থার প্রবেশ শুধু বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট বা উৎক্ষেপণ যানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে এই অংশগ্রহণ বাড়ছে।
সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বেসরকারি সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই বেশ কিছু স্যাটেলাইট তৈরির বরাত পেয়েছে। অন্য দিকে, নির্দিষ্ট বৃহৎ কর্মসূচির আওতায় ইসরোর উপরও একাধিক স্যাটেলাইট নির্মাণের দায়িত্ব রয়েছে।
এর ফলে আগামী দিনে ভারতীয় মহাকাশ শিল্পে সরকারি এবং বেসরকারি—দুই ধরনের সংস্থার সমান্তরাল উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হতে পারে।

বিশ্বের মহাকাশ শিল্পে সরকারি সংস্থা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ মডেল এখন আর নতুন নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাসা বহু ক্ষেত্রে জটিল বৈজ্ঞানিক গবেষণা, গভীর মহাকাশ অভিযান এবং নতুন প্রযুক্তির দিকে মন দিয়েছে। অন্য দিকে, পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, যোগাযোগ পরিষেবা এবং বাণিজ্যিক মহাকাশ প্রযুক্তিতে বেসরকারি সংস্থাগুলির ভূমিকা দ্রুত বেড়েছে।
স্পেসএক্স-এর মতো সংস্থার উত্থান সেই পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ। উৎক্ষেপণ পরিষেবা থেকে শুরু করে স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ইন্টারনেট—বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেসরকারি মহাকাশ সংস্থা নিজেদের জায়গা তৈরি করেছে।
ভারতেও সেই ধরনের একটি বাণিজ্যিক মহাকাশ অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। কেন্দ্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় মহাকাশ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কয়েক গুণ বাড়ানোর লক্ষ্য রাখা হয়েছে। সেই লক্ষ্যে শুধু সরকারি অর্থের উপর নির্ভর না করে বেসরকারি পুঁজি আকর্ষণ করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এখানেই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বেসরকারি সংস্থার দ্রুত বৃদ্ধি ইসরোর জন্য সুযোগ, না কি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ?
সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইসরো থেকে প্রায় ৭০০ বিজ্ঞানী ইস্তফা দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থায় বিপুল সংখ্যক শূন্যপদ পূরণের প্রক্রিয়া চলছে বলেও উল্লেখ রয়েছে।
প্রাক্তন বিজ্ঞানীদের একাংশের বক্তব্য, বেসরকারি সংস্থাগুলিতে তুলনামূলক বেশি বেতন, দ্রুত পদোন্নতি এবং আকর্ষণীয় গবেষণার সুযোগ থাকায় প্রতিভাবান বিজ্ঞানীদের একটা অংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানের বদলে বেসরকারি ক্ষেত্রে চলে যেতে পারেন।
ইসরোর প্রাক্তন চেয়ারম্যান এস সোমনাথও সংস্থার বেতন কাঠামো নিয়ে অতীতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বলে সরবরাহ করা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের প্রথম সারির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিভাবান তরুণদের আকৃষ্ট করতে সরকারি বেতন কাঠামো অনেক সময় যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক নয়।
ফলে শুধু নতুন নিয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অভিজ্ঞ বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের দীর্ঘমেয়াদি ভাবে ধরে রাখাই হতে পারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ভারতে ইতিমধ্যেই একাধিক মহাকাশ স্টার্টআপ নিজেদের জায়গা তৈরি করতে শুরু করেছে। স্কাইরুট অ্যারোস্পেস, অগ্নিকুল কসমস, পিক্সেল, বেলাট্রিক্স অ্যারোস্পেস, ধ্রুব স্পেস এবং দিগন্তরার মতো সংস্থাগুলি ভারতীয় মহাকাশ শিল্পে বেসরকারি উদ্যোগের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
বেসরকারি সংস্থাগুলির পক্ষে কাজের গতি এবং বিনিয়োগ সংগ্রহের সুবিধা থাকলেও ইসরোর অন্যতম শক্তি হল দীর্ঘদিনের গবেষণা-অভিজ্ঞতা, বিশাল প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো এবং জটিল মহাকাশ অভিযানের অভিজ্ঞতা।
তাই আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধুমাত্র সরকারি বনাম বেসরকারি সংস্থার লড়াই হবে না। বরং প্রশ্ন হবে—দুই ক্ষেত্র কতটা কার্যকর ভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির সামনে এখন একাধিক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। ভবিষ্যতে মানব মহাকাশযাত্রা, নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন এবং আরও জটিল বৈজ্ঞানিক অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে। এই ধরনের মিশনে ইসরোর নেতৃত্ব এবং অভিজ্ঞতা এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে সাধারণ স্যাটেলাইট বা প্রচলিত রকেট তৈরির কাজ বেসরকারি হাতে চলে গেলেও ইসরোর গবেষণার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হতে পারে। বরং সফল ভাবে দায়িত্ব ভাগ করা গেলে সরকারি মহাকাশ সংস্থা আরও বড় বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য পূরণে মন দিতে পারবে।
তবে সেই পরিবর্তনের পথে দক্ষ বিজ্ঞানী ধরে রাখা, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হবে বড় পরীক্ষা।
অতএব, বেসরকারি সংস্থার হাতে মহাকাশের দরজা খুলে দেওয়া মানেই ইসরোর ‘কপাল পোড়া’—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছনোর সময় আসেনি। বরং আগামী কয়েক বছরেই স্পষ্ট হবে, এই নীতি ইসরোর ক্ষমতা কমায়, নাকি তাকে আরও জটিল এবং উচ্চাভিলাষী মহাকাশ গবেষণার জন্য প্রস্তুত করে। শেষ পর্যন্ত ভারতের মহাকাশ দৌড়ে জয়ী হওয়ার জন্য সরকারি দক্ষতা এবং বেসরকারি গতির সমন্বয়ই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments