Homeঅন্যান্যমস্তিষ্কের রহস্য ভেদে ‘আলোর সুইচ’-এর খোঁজ, নিউরোসায়েন্সে যুগান্তকারী অবদানে তিন বিজ্ঞানীকে মেডিসিনে নোবেল

মস্তিষ্কের রহস্য ভেদে ‘আলোর সুইচ’-এর খোঁজ, নিউরোসায়েন্সে যুগান্তকারী অবদানে তিন বিজ্ঞানীকে মেডিসিনে নোবেল

eisamay_2026-10-05_xukzni79_nobel-in-medicine

নিউজ ডেস্ক: স্টকহোম, সুইডেন মস্তিষ্কের জটিল রহস্য বুঝতে বিজ্ঞানীরা যেন হাতে পেলেন এক নতুন ‘আলোর সুইচ’। আলো ব্যবহার করে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে চালু বা বন্ধ করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অপ্টোজেনেটিক্স-এর পথপ্রদর্শক গবেষণার জন্য ২০২৬ সালের ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন বিজ্ঞানী—কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগেম্যান এবং জর্জ নাগেল। নোবেল কমিটির ঘোষণা অনুযায়ী, তাঁদের গবেষণা জীবন্ত মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষ কী ভাবে স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, তা বোঝার নতুন দরজা খুলেছে।

সোমবার সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট থেকে এই বছরের মেডিসিন নোবেল ঘোষণা করা হয়। পুরস্কারের স্বীকৃতির কেন্দ্রে রয়েছে light-gated ion channels এবং optogenetics। সহজ করে বললে, আলো ব্যবহার করে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ তৈরি করেছেন এই বিজ্ঞানীরা। এর ফলে আগে যেখানে বিজ্ঞানীরা মূলত মস্তিষ্কের কোন অংশ সক্রিয় হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করতেন, সেখানে এখন নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে সক্রিয় করে তার ফলাফলও পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।

এই গবেষণার শুরুটা অবশ্য মস্তিষ্ক দিয়ে হয়নি। পিটার হেগেম্যান ও জর্জ নাগেল এক ধরনের এককোষী শৈবাল Chlamydomonas নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আলো-সংবেদনশীল একটি বিশেষ প্রোটিনের সন্ধান পান। সেই প্রোটিনের নাম channelrhodopsin। নীল আলো পড়লে প্রোটিনটির মধ্যে থাকা একটি চ্যানেল খুলে যায় এবং কোষের মধ্যে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এই প্রোটিন অন্য কোষেও বসানো গেলে সেই কোষকে আলো-সংবেদনশীল করে তোলা সম্ভব।

এর পর গবেষণাটিকে স্নায়ুবিজ্ঞানের নতুন পর্যায়ে নিয়ে যান কার্ল ডেইসেরথ। তিনি channelrhodopsin-এর জিন স্নায়ুকোষে প্রবেশ করিয়ে দেখান, নীল আলো ব্যবহার করে ওই কোষের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ২০০৫ সালে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশিত হয়। পরে জীবন্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কেও আলো দিয়ে এই ‘সুইচ’ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। সেই প্রযুক্তিই পরে পরিচিতি পায় অপ্টোজেনেটিক্স নামে।

এই প্রযুক্তির গুরুত্ব এখানেই যে, মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ বা স্নায়বিক সার্কিটের কার্যকলাপ অত্যন্ত নির্ভুল ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তার প্রভাব দেখা যায়। ফলে স্মৃতি তৈরি, অনুভূতি, আচরণ এবং বিভিন্ন স্নায়বিক ও মানসিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত নিউরাল সার্কিট নিয়ে গবেষণা অনেক বেশি নির্দিষ্ট হয়েছে। নোবেল কমিটির মতে, এই পদ্ধতি নিউরোসায়েন্সে নতুন যুগের সূচনা করেছে।

শুধু গবেষণাগারেই নয়, চিকিৎসাক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দৃষ্টিশক্তি হারানোর কিছু ক্ষেত্রে আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন ব্যবহার করে দৃষ্টি ফেরানোর সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। ফলে এককোষী শৈবালের আলো অনুভব করার ক্ষমতা থেকে শুরু হওয়া গবেষণা আজ মানুষের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র বোঝার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

তিন বিজ্ঞানীর এই সম্মিলিত আবিষ্কার দেখিয়েছে, মস্তিষ্কের অদৃশ্য বৈদ্যুতিক কার্যকলাপকে কী ভাবে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে তার রহস্য আরও গভীর ভাবে অনুসন্ধান করা যায়। সেই কারণেই ২০২৬ সালের মেডিসিন নোবেলের এই স্বীকৃতিকে নিউরোসায়েন্সের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

No Comments

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved