Last updated: September 10th, 2026 at 06:29 pm

শফিকুল ইসলাম ,নদিয়া-বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে, আর তার জেরে কিছুক্ষণের মধ্যেই বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ— এমনই একটি ভুয়ো বার্তার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হলেন নদিয়ার তাহেরপুরের এক বাসিন্দা। সাইবার অপরাধীদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে মাত্র পাঁচ থেকে সাত মিনিটের ব্যবধানে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে উধাও হয়ে গেল প্রায় লক্ষাধিক টাকা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাহেরপুর থানা এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়ার ভুয়ো ভয় দেখিয়ে গ্রাহকদের আতঙ্কিত করে তোলার এই কৌশল বর্তমানে ডিজিটাল প্রতারকদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত নদিয়ার তাহেরপুরের বাসিন্দা শ্যামাপ্রসাদ বিশ্বাসের ফোনে আসা একটি খুদে বার্তাকে (এসএমএস) কেন্দ্র করে। অভিযোগ, ওই বার্তায় দাবি করা হয় যে তাঁর বাড়ির বিদ্যুৎ বিল দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া পড়ে রয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে সেই বিল পরিশোধ না করলে অবিলম্বে সংযোগ কেটে দেওয়া হবে বলেও চরম হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। শ্যামাপ্রসাদবাবু সাধারণত নিয়মিতভাবে ডিজিটাল মাধ্যমে ও ইউপিআই মারফত বিদ্যুৎ বিল মিটিয়ে থাকেন। ফলে আচমকা এমন কড়া বার্তা দেখে তিনি কিছুটা বিভ্রান্ত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর কাছে একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনের ওপারে থাকা ব্যক্তি নিজেকে বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেয়। শ্যামাপ্রসাদবাবু দাবি করেন, তিনি প্রতি মাসেই নিয়ম মেনে বিল পরিশোধ করেন। কিন্তু প্রতারক চক্রের ওই সদস্য কৌশলে তাঁকে বোঝায় যে সার্ভারে কারিগরি সমস্যার কারণে লেনদেনটি আটকে রয়েছে এবং তা অবিলম্বে আপডেট না করলে বিদ্যুৎ দফতর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে ওই ব্যক্তি ফোনে শ্যামাপ্রসাদবাবুকে নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশ অনুসরণ করতে বলে।
অভিযোগকারীর দাবি, ফোনের ওপার থেকে দেওয়া নির্দেশ মেনে তিনি মোবাইলে ব্যাঙ্কিং অ্যাপ চালু করেন এবং প্রতারকের কথামতো কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। আর তার ঠিক পরেই শুরু হয় আসল বিপত্তি। শ্যামাপ্রসাদবাবু লক্ষ্য করেন, তাঁর মোবাইলে ব্যাঙ্কের তরফে একের পর এক ওটিপি ও টাকা কাটার বার্তা আসতে শুরু করেছে। কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই, মাত্র পাঁচ থেকে সাত মিনিটের ব্যবধানে ধাপে ধাপে তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে মোট ৯৯,৪০০ টাকা তুলে নেওয়া হয়। চোখের নিমেষে অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স শূন্যের কোঠায় নেমে যেতে দেখে তিনি কার্যত হতভম্ব ও বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েন।
তবে প্রতারকদের দৌরাত্ম্য কেবল ওই সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টের টাকা লুঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। শ্যামাপ্রসাদবাবুর দাবি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের টাকা হাতানোর পর চক্রটি তাঁর ক্রেডিট কার্ড থেকেও প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। কিন্তু ততক্ষণে প্রতারণার বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছিলেন তিনি। কালবিলম্ব না করে তড়িঘড়ি ব্যাঙ্কের হেল্পলাইনে যোগাযোগ করে নিজের ক্রেডিট কার্ডটি সাময়িকভাবে ‘লক’ করে দেন। ফলে দ্বিতীয় দফার বড়সড় আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে তিনি রক্ষা পান।
ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে শ্যামাপ্রসাদবাবু দ্রুত সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ দফতর এবং তাঁর ব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এর পাশাপাশি তিনি তাহেরপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। বিষয়টি জানানো হয়েছে কল্যাণী সাইবার ক্রাইম থানাতেও। স্থানীয় সাইবার ক্রাইম শাখা ও থানার আধিকারিকদের সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তবে অভিযোগ দায়ের করার বেশ কিছুদিন অতিক্রান্ত হলেও এখনও পর্যন্ত খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধার না হওয়ায় তিনি চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
এখানেই শেষ নয়, শ্যামাপ্রসাদবাবুর আরও একটি মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, প্রতারণার ঘটনার পর থেকেই তাঁর মোবাইল ফোনটির যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ কার্যত হ্যাকারদের কবলে চলে গিয়েছে। একটি নির্দিষ্ট ক্ষতিকারক অ্যাপ বা ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে ফোনটি হ্যাক করে রাখা হয়েছে বলে তাঁর আশঙ্কা। ফোনটিতে অস্বাভাবিক কার্যকলাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং তিনি এখনও স্বাভাবিকভাবে হ্যান্ডসেটটি ব্যবহার করতে পারছেন না।
সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত জাল মেসেজের সঙ্গে সাধারণত একটি লিঙ্ক পাঠানো হয় অথবা ফোনে কোনও রিমোট অ্যাক্সেস অ্যাপ ইনস্টল করিয়ে নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে গ্রাহকের পুরো ফোনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় অপরাধীদের হাতে। কোন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তরিত হয়েছে এবং প্রতারণা চক্রটির শিকড় কত দূর বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখতে তাহেরপুর থানা ও জেলা সাইবার ক্রাইম শাখা যৌথভাবে জোর তদন্ত শুরু করেছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments