Homeখেলাচাঁদের হাট হাঁসখালিতে! ব্যারেটো-নবী-সংগ্রামের জাদুতে মাতোয়ারা ২ লক্ষের ‘এমএলএ কাপ’

চাঁদের হাট হাঁসখালিতে! ব্যারেটো-নবী-সংগ্রামের জাদুতে মাতোয়ারা ২ লক্ষের ‘এমএলএ কাপ’

নিউজ ডেস্ক: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর সেই পার্বণের অন্যতম এক অবিচ্ছেদ্য এবং আবেগঘন অঙ্গ হলো ফুটবল। কথায় বলে, বাঙালির পায়ের রক্তে নাকি ফুটবলেরই বাস। শীতের মিঠে রোদ হোক
resizeplusq

নিউজ ডেস্ক: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর সেই পার্বণের অন্যতম এক অবিচ্ছেদ্য এবং আবেগঘন অঙ্গ হলো ফুটবল। কথায় বলে, বাঙালির পায়ের রক্তে নাকি ফুটবলেরই বাস। শীতের মিঠে রোদ হোক বা বর্ষার কাদা-মাখা মাঠ, একটা আস্ত ফুটবল আর দু’দিকে দুটো বাঁশের পোস্ট পেলেই বাঙালির উন্মাদনার আর কোনও বাঁধ থাকে না। আর সেই খেলা যদি হয় ফ্লাডলাইটের মায়াবী আলোয়, নৈশকালীন টুর্নামেন্টের মোড়কে, তবে তো উন্মাদনা পৌঁছয় এক অন্য শিখরে। ঠিক এমন এক ফুটবল জ্বরেই এখন কাঁপছে নদীয়া জেলার হাঁসখালি। স্থানীয় যুবসমাজকে মাঠমুখী করতে এবং খেলার প্রতি নতুন প্রজন্মের ঝোঁক বাড়াতে হাঁসখালিতে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজিত হচ্ছে মেগা ‘এমএলএ কাপ’ (MLA Cup) ফুটবল টুর্নামেন্ট। আর এই টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষ ও ক্রীড়াপ্রেমীদের ভিড়ে এখন কার্যত তিল ধারণের জায়গা নেই মাঠ প্রাঙ্গণে।

টুর্নামেন্টের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, আকর্ষণীয় পুরস্কার এবং তারকাদের উপস্থিতি নিয়ে মাঠ থেকেই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন এই বিশাল ক্রীড়াযজ্ঞের মূল কাণ্ডারী তথা হাঁসখালি বিধানসভার বিধায়ক সুকান্ত বিশ্বাস। অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত বিধায়ক জানিয়েছেন, আধুনিক সময়ে যখন যুবসমাজ দিনের বেশিরভাগ সময়টাই মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম বা সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রিনে মুখ গুঁজে কাটিয়ে দিচ্ছে, তখন তাদের পুনরায় সবুজ ঘাসের মাঠে ফিরিয়ে আনাটাই ছিল এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। খেলাধুলা কেবল শারীরিক বিকাশই ঘটায় না, বরং যুবসমাজকে নেশা বা অসামাজিক কাজের অন্ধকার জগত থেকেও দূরে রাখে। সেই সুস্থ সমাজ গঠনের সংকল্প নিয়েই এই ‘এমএলএ কাপ’-এর সূচনা করা হয়েছে।

টুর্নামেন্টের ক্রীড়াসূচি এবং বিন্যাস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে বিধায়ক সুকান্ত বিশ্বাস জানান, এবারের প্রতিযোগিতায় মোট ৮টি আমন্ত্রিত দল অংশগ্রহণ করেছে। নকআউট বা বিদায় পর্বের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই টুর্নামেন্ট। তবে এটি প্রথাগত ১১ জনের ফুল-কোর্ট ফুটবল নয়, বরং দর্শকদের টানটান উত্তেজনা উপহার দিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘শর্টবার’ বা ছোট মাঠের ফুটবলের আয়োজন করা হয়েছে। শর্টবার ফুটবলের মূল আকর্ষণই হলো এর প্রবল গতি এবং খেলোয়াড়দের তীক্ষ্ণ স্কিল, যা দর্শকদের এক মুহূর্তের জন্যও চোখ ফেরাতে দেয় না। এদিন প্রথম ম্যাচ শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই গ্যালারি ও মাঠের চারপাশ দর্শকে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। আশেপাশের গ্রাম এবং দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী মানুষ ভিড় জমান এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চাক্ষুষ করার জন্য।

তবে এই টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এর বিপুল পরিমাণ আর্থিক পুরস্কার। গ্রামীণ বা স্থানীয় স্তরের ফুটবলে এমন চমকপ্রদ প্রাইজ মানি সাধারণত খুব একটা চোখে পড়ে না। আয়োজকদের তরফে ঘোষণা করা হয়েছে, প্রতিযোগিতায় যে দল সেরার শিরোপা বা চ্যাম্পিয়ন ট্রফি ছিনিয়ে নেবে, তাদের হাতে নগদ ২ লক্ষ টাকার বিশাল আর্থিক পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। পাশাপাশি, রানার্স-আপ বা দ্বিতীয় স্থানাধিকারী দলও খালি হাতে ফিরবে না; তাদের জন্য থাকছে নগদ ১ লক্ষ টাকার আকর্ষণীয় পুরস্কার। এছাড়াও খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যকে স্বীকৃতি জানাতে এবং উৎসাহিত করতে প্রতিটি ম্যাচে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ এবং পুরো টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের জন্য ‘ম্যান অব দ্য সিরিজ’-এর মতো একাধিক দামি পুরস্কারের ব্যবস্থাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। এমন বড় অঙ্কের পুরস্কার থাকায় প্রতিটি দলই নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিচ্ছে মাঠে।

এই টুর্নামেন্টের জাঁকজমক কেবল আর্থিক পুরস্কারেই আটকে নেই; প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় পর্বে থাকছে এক বিশাল চমক, যা নিয়ে গোটা হাঁসখালি ও রানাঘাট মহকুমা জুড়ে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে। ময়দানের নস্টালজিয়াকে সরাসরি গ্রামীণ মাঠে তুলে আনতে এই টুর্নামেন্টে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকছেন একাধিক হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিত্ব এবং জাতীয় স্তরের কিংবদন্তি ক্রীড়াতারকারা। আয়োজকদের তরফে জানানো হয়েছে, বাংলার ফুটবলের স্বর্ণযুগের অন্যতম দুই স্তম্ভ— প্রখ্যাত গোলরক্ষক তথা ভারতীয় দলের প্রাক্তন অধিনায়ক সংগ্রাম মুখার্জি এবং ময়দানের ‘সব্যসাচী’ ফুটবলার সৈয়দ রহিম নবী এই টুর্নামেন্টের মঞ্চ আলো করে উপস্থিত থাকবেন। আর দর্শকদের উন্মাদনাকে চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিতে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে মোহনবাগানের ঘরের ছেলে তথা ভারতীয় ফুটবলের একসময়ের ত্রাস, কিংবদন্তি ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার হোসে রামিরেজ ব্যারেটোর। ব্যারেটো, নবী এবং সংগ্রামকে নিজেদের পাড়ার মাঠে চোখের সামনে দেখতে পাওয়ার সুযোগ পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই আবেগে ভাসছেন নদীয়ার আপামর ফুটবলপ্রেমীরা।

তবে এই আয়োজন কেবল ক্রীড়াজগতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ‘এমএলএ কাপ’-এর এই জমকালো আসর কার্যত পরিণত হয়েছে এক বিরাট সামাজিক ও প্রশাসনিক মিলনমেলায়। টুর্নামেন্টের মেগা ফাইনালে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলিতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন নদীয়া জেলার বিভিন্ন কেন্দ্রের বিধায়ক, একাধিক দপ্তরের মন্ত্রী, স্থানীয় সাংসদ এবং শাসক দলের শীর্ষ সাংগঠনিক নেতৃত্বরা। রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের পাশাপাশি এই বিপুল আয়োজনের প্রশাসনিক নিরাপত্তার দিকটি সুনিশ্চিত করতে এবং খেলোয়াড়দের উৎসাহ জোগাতে দর্শকাসনে উপস্থিত থাকবেন জেলা শাসক (DM), মহকুমা শাসক (SDO) এবং সংশ্লিষ্ট ব্লকের সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক (BDO)-এর মতো শীর্ষস্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও।

রাত যত গভীর হচ্ছে, ফ্লাডলাইটের আলোয় ফুটবলের উত্তেজনা ততই যেন তীব্র আকার ধারণ করছে। বাঁশির আওয়াজ, রেফারির কড়া নজর, আর গোলের পর দর্শকদের বাঁধভাঙা উল্লাস— সব মিলিয়ে হাঁসখালির এই মাঠটি যেন এক টুকরো যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে পরিণত হয়েছে। টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে মাঠের বাইরে বসেছে রকমারি খাবারের স্টল। বাদাম, ঝালমুড়ি, চা আর চপ-ঘুগনির দোকানে বিক্রিবাটা তুঙ্গে, যা স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মুখেও হাসি ফুটিয়েছে। সব মিলিয়ে, কেবল একটি খেলা নয়, হাঁসখালির এই ‘এমএলএ কাপ’ প্রকৃত অর্থেই একটি শারদোৎসবের মতো সার্বিক উৎসবের মেজাজ তৈরি করেছে গোটা এলাকায়।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved