Homeজেলাঅনলাইনের দাপট ও মেগা মলের জৌলুসে ম্লান পুজোর বাজার! নদিয়ায় ক্রেতার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন ঋণগ্রস্ত ছোট ব্যবসায়ীরা

অনলাইনের দাপট ও মেগা মলের জৌলুসে ম্লান পুজোর বাজার! নদিয়ায় ক্রেতার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন ঋণগ্রস্ত ছোট ব্যবসায়ীরা

nadia

নিউজ ডেস্ক: শরতের নীল আকাশ, নদীর ধারে সাদা কাশের দোলা আর ভোরের বাতাসে শিউলির মন-কেমন-করা গন্ধ জানান দিচ্ছে, উমা আসছেন। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো আসতে আর হাতে গোনা মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। উৎসবের এই মরশুমে চারিদিকে সাজসাজ রব, মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। অন্যান্য বছর ঠিক এই সময়টায় নদিয়া জেলার বিভিন্ন শহরের বাজারগুলোতে পা ফেলার জায়গা থাকে না। কিন্তু এবারের ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা, নিদারুণ এবং রূঢ়। জেলার ছোট-বড় ঐতিহ্যবাহী পোশাকের দোকানগুলোতে নেই চেনা ক্রেতার ভিড়। যে দোকানগুলোতে একসময় পুজোর আগে ক্রেতাদের ভিড় সামলাতে বিক্রেতাদের হিমশিম খেতে হতো, সেখানে এখন বিরাজ করছে এক অদ্ভুত, দমবন্ধ করা খাঁ খাঁ নীরবতা। থরে থরে সাজানো নতুন জামাকাপড়ের তাকে ধীরে ধীরে জমছে ধুলো আর ছোট ব্যবসায়ীদের বুকফাটা হতাশার আস্তরণ।

কৃষ্ণনগর, রানাঘাট কিংবা শান্তিপুরের মতো ঐতিহ্যবাহী শহরগুলির বস্ত্র বিপণন কেন্দ্রগুলোর ইতিহাস বহু পুরোনো। একসময় রানাঘাটের বড়বাজার, কৃষ্ণনগরের নেদেরপাড়া বা শান্তিপুরের কাপড়ের বাজারগুলো পুজো এলেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেত। ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম, নতুন জামার গন্ধ আর হাসিখুশিতে মেতে উঠত গোটা এলাকা। কিন্তু আজ সেই চেনা কোলাহল কার্যত হারিয়ে গিয়েছে। এই করুণ পরিণতির নেপথ্যে মূলত দুটি প্রধান কারণ উঠে আসছে— বড় বড় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মেগা শপিং মলের রমরমা এবং অনলাইন কেনাকাটার প্রতি সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের প্রবল ঝোঁক। এই দুই কর্পোরেট দৈত্যের যাঁতাকলে পিষে গিয়ে আজ আক্ষরিক অর্থেই পথ হারাচ্ছেন নদিয়ার ছোট ও মাঝারি পোশাক ব্যবসায়ীরা।

আধুনিক যুগে কেনাকাটার ধারণাই সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। জেলা সদর থেকে শুরু করে মফস্বল শহরগুলোতেও এখন ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে ঝাঁ-চকচকে মেগা শপিং মল। মানুষ এখন শুধু কেনাকাটা করতে চান না, তাঁরা কেনাকাটার সঙ্গে বিনোদন খোঁজেন। মলের ভেতরে থাকা চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আরামদায়ক পরিবেশ, এসকেলেটর, মাল্টিপ্লেক্স এবং ফুড কোর্টের আকর্ষণ সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে পরিবারগুলিকে চুম্বকের মতো টেনে নিচ্ছে। উইকেন্ডের ছুটির দিনে বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের আবদারে পাড়ার চেনা গলির দোকান ছেড়ে পাড়ি দিচ্ছেন শহরের বড় মলে। ফলে, যে ক্রেতারা একসময় স্থানীয় বাজারের প্রাণ ছিলেন, তাঁরা আজ মল-মুখী। এর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সাধারণ ছোট দোকানিদের পক্ষে কোনওভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

এর পাশাপাশি দোসর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ই-কমার্স বা অনলাইন শপিংয়ের সুনামি। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে এক ক্লিকেই এখন বিশ্বের তাবড় ব্র্যান্ডের পোশাক হাজির হয়ে যাচ্ছে একেবারে বাড়ির দোরগোড়ায়। ই-কমার্স ওয়েবসাইটগুলির চোখধাঁধানো অফার, অবিশ্বাস্য ছাড়, ক্যাশব্যাক, চটকদার বিজ্ঞাপন এবং ‘পুজো স্পেশাল সেল’-এর জাদুতে মোহময় হয়ে উঠেছে তরুণ প্রজন্ম। ঘরে বসে পছন্দমতো পোশাক ট্রায়াল দেওয়া এবং পছন্দ না হলে সহজেই তা ফিরিয়ে দেওয়ার (Easy Return) যে সুবিধা অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো দিচ্ছে, তা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পক্ষে দেওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। বিশাল পুঁজির অধিকারী এই ই-কমার্স সংস্থাগুলির সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় নেমে কার্যত বিনা যুদ্ধেই আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছেন পাড়ার ছোট দোকানিরা।

সবচেয়ে মর্মান্তিক ছবিটা লুকিয়ে রয়েছে এই ব্যবসায়ীদের আর্থিক অবস্থার ভেতরে। পুজোর বাজার মানেই গ্রামীণ ও মফস্বলের ব্যবসায়ীদের কাছে সারা বছরের লাভ তুলে নেওয়ার একটি মোক্ষম সুযোগ। এই আশায় বুক বেঁধে নদিয়ার হাজার হাজার ছোট ব্যবসায়ী এবছরও ব্যাঙ্ক, সমবায় সমিতি, মাইক্রো-ফাইনান্স সংস্থা বা স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন। নিজেদের সর্বস্ব বাজি রেখে, কেউ বা স্ত্রীর গয়না বন্দক দিয়ে পুজোর নতুন স্টক তুলেছিলেন দোকানে। আশা ছিল, পুজোর বিক্রিবাট্টা দিয়ে হাসিমুখে সমস্ত পাওনা ও কিস্তি মিটিয়ে দেবেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ক্রেতার অভাবে বিক্রি কার্যত তলানিতে এসে ঠেকেছে। আগামী দিনে মহাজনের ঋণের বোঝা বা ব্যাঙ্কের ইএমআই (EMI) কীভাবে মেটাবেন, সেই চিন্তায় এখন রাতে ঘুম উড়েছে তাঁদের। ঋণের এই মরণফাঁদ অনেককেই চরম হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এই অচলাবস্থার প্রভাব কেবল দোকান মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর ফলে ব্যাহত হচ্ছে গোটা এলাকার ক্ষুদ্র অর্থনীতি। একটি কাপড়ের দোকানের ওপর নির্ভর করে থাকেন আরও অনেকে। দোকানের সেলসম্যান, গোডাউনের কর্মী, মালপত্র বহনকারী ভ্যানচালক এবং বাজারের আশপাশে থাকা ছোটখাটো চায়ের দোকান বা দর্জির দোকান— সকলেরই রোজগার আজ প্রশ্নের মুখে। বিক্রি না থাকলে এই কর্মচারীরা পুজোয় বোনাস পাবেন না, এমনকি আগামী মাসে তাঁদের বেতন জুটবে কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রবল সংশয়। পুজোর আনন্দ তাঁদের পরিবারগুলোতে পৌঁছনোর আগেই যেন মিলিয়ে যাচ্ছে।

উন্নয়ন, আধুনিকীকরণ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু সেই আধুনিকতার চাকায় পিষ্ট হয়ে যদি জেলার নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাগুলো এভাবে ধুঁকতে থাকে, তবে তা এক গভীর আর্থ-সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। চারিদিকে যখন উৎসবের রঙিন আলো ছড়িয়ে পড়ছে, শহরের মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের থিম আর আলোকসজ্জার প্রস্তুতি, ঠিক তখনই এক বুক অনিশ্চয়তা, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই আর ঘুটঘুটে অন্ধকারে দিন কাটছে নদিয়ার এই হাজারও ঐতিহ্যবাহী পোশাক ব্যবসায়ীর। তাঁদের এখন একটাই প্রার্থনা, শেষ মুহূর্তে যদি উৎসবের উন্মাদনায় অন্তত কিছু ক্রেতার দেখা মেলে, তবে হয়তো এই চরম বিপর্যয়ের হাত থেকে সাময়িকভাবে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved