
নিউজ ডেস্ক: মানবদেহ এবং চারপাশের পরিবেশ—এই দুইয়ের সুস্থতা যে একে অপরের পরিপূরক, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বারবার সেই অমোঘ সত্যটিই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম সংকটের দিনে দাঁড়িয়ে কেবল রোগের চিকিৎসা করাই নয়, বরং রোগ প্রতিরোধের জন্য একটি সুস্থ ও দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলাও আগামী দিনের চিকিৎসকদের অন্যতম প্রধান সামাজিক দায়িত্ব। সেই সুগভীর সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যকে সামনে রেখেই নদিয়া জেলার চাকদহে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করল জেএমএন (JMN) মেডিক্যাল কলেজ। সোমবার এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে স্বাস্থ্য, পরিবেশ সচেতনতা এবং ভবিষ্যৎ চিকিৎসা শিক্ষার রূপরেখা নিয়ে এক বর্ণাঢ্য ও মেগা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। আর এই বিপুল আয়োজনের সবচেয়ে বড় চমক ও ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ছিল কলেজ প্রাঙ্গণে একটি আস্ত নতুন ইউনিভার্সিটির বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন (শিলান্যাস)। আধুনিক শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও পরিবেশ রক্ষার এই অভিনব ত্রিবেণী সঙ্গম চাকদহ তথা সমগ্র নদিয়া জেলার মুকুটে এক নতুন পালক যুক্ত করল।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় এক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, সময়োপযোগী এবং প্রাণোচ্ছল কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। বর্তমান বিশ্বে ‘সাসটেইনেবিলিটি’ (Sustainability) বা টেকসই উন্নয়নের যে ধারণা প্রবলভাবে চর্চিত হচ্ছে, তাকে আক্ষরিক অর্থে পাঠ্যবইয়ের পাতা থেকে মাঠে ময়দানে নামিয়ে আনতে এদিন সকালে আয়োজন করা হয়েছিল এক বিশেষ ম্যারাথন— ‘পরিবেশের জন্য দৌড় ২০২৬’ (Run for Environment 2026)। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ঠিক দশটা। জেএমএন মেডিক্যাল কলেজের মূল ফটক থেকে সবুজ পতাকা নেড়ে এই পরিবেশ সচেতনতামূলক দৌড়ের শুভ সূচনা করা হয়। চিকিৎসাবিদ্যার শয়ে শয়ে পড়ুয়া অত্যন্ত উৎসাহ, উদ্দীপনা এবং পরিবেশ রক্ষার দৃঢ় শপথ নিয়ে এই দৌড়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। দৌড়টি কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে চাকদহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিমুরালি মোড় পর্যন্ত যায় এবং সেখান থেকে ঘুরে পুনরায় কলেজ প্রাঙ্গণেই এসে সমাপ্ত হয়। আগামী দিনের হবু চিকিৎসকদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখে রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষও রীতিমতো উৎসাহিত বোধ করেন। পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখার বার্তা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এই দৌড় এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
এই দিনটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য কেবল দৌড় বা সচেতনতা শিবিরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এদিন জেএমএন মেডিক্যাল কলেজের ইতিহাসে একটি সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। কলেজের পরিকাঠামো, গবেষণা এবং শিক্ষার মানকে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে এদিন আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নতুন ইউনিভার্সিটির শিলান্যাস করা হয়। এই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টি আগামী দিনে কেবল নদিয়া বা পশ্চিমবঙ্গ নয়, সমগ্র পূর্ব ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞান পঠনপাঠনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পীঠস্থান হয়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন উদ্যোক্তারা। আধুনিক ল্যাবরেটরি, উন্নত মানের গবেষণা কেন্দ্র এবং অত্যাধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির নিবিড় মেলবন্ধনে এই বিশ্ববিদ্যালয় আগামী দিনের চিকিৎসকদের বিশ্বমানের শিক্ষার সুযোগ করে দেবে। গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় এমন একটি মেগা পরিকাঠামো গড়ে ওঠার ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষও যে উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবার সুবিধা পাবেন, সে বিষয়ে একপ্রকার নিশ্চিত ওয়াকিবহাল মহল।
সকালের এই উন্মাদনা এবং ঐতিহাসিক শিলান্যাস পর্ব মেটার পর, দিনের দ্বিতীয়ার্ধে আয়োজিত হয় এক অত্যন্ত উচ্চমানের ও মননশীল ‘একাডেমিক কনক্লেভ’ বা আলোচনা সভা। দুপুর ঠিক দুটো থেকে বিকেল সাড়ে চারটে পর্যন্ত টানা আড়াই ঘণ্টা ধরে চলা এই আলোচনা চক্রের মূল বিষয়বস্তু বা থিম ছিল অত্যন্ত সুচিন্তিত— “জ্ঞান থেকে প্রভাব: টেকসই স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং ভবিষ্যৎ-প্রস্তুত চিকিৎসা শিক্ষার নির্মাণ” (Knowledge to Impact: Building Sustainable Healthcare and Future-Ready Medical Education)। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান কেবল থিওরি বা পাঠ্যবইয়ের গণ্ডিতে আটকে নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক সার্জারি থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নতুন নতুন অজানা ভাইরাসের মোকাবিলা— আগামী দিনের চিকিৎসকদের সবকিছুর জন্যই প্রস্তুত থাকতে হবে। আর সেই ‘ভবিষ্যৎ-প্রস্তুত’ শিক্ষা কীভাবে দেওয়া সম্ভব এবং বর্তমান স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে কীভাবে আরও পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করে তোলা যায়, সেই বিষয়েই এই কনক্লেভে বিস্তারিত এবং গবেষণামূলক আলোচনা হয়।
এই মেগা একাডেমিক কনক্লেভের গাম্ভীর্য এবং উৎকর্ষতা এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায় প্রধান অতিথি এবং প্রধান বক্তার উপস্থিতিতে। নর্ডিক দেশগুলির চিকিৎসা ব্যবস্থা গোটা বিশ্বে সর্বজনবিদিত ও প্রশংসিত। সেই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানভাণ্ডারকে নদিয়ার পড়ুয়াদের সামনে তুলে ধরতে সুদূর নরওয়ে থেকে এই অনুষ্ঠানে উড়ে এসেছিলেন অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Oslo) মেডিসিন বিভাগের বিশিষ্ট এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অধ্যাপক, প্রফেসর (ড.) অসীম কুমার দত্তরায়। তাঁর মতো একজন বিশ্বমানের গবেষক ও অধ্যাপকের বক্তব্য শুনতে পেয়ে স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত ছিলেন কলেজের ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে অধ্যাপকমণ্ডলী। ড. দত্তরায় তাঁর অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ বক্তব্যে তুলে ধরেন কীভাবে উন্নত দেশগুলি পরিবেশ সচেতনতার সঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে নিয়েছে এবং ভারতীয় চিকিৎসা ব্যবস্থায় তার কতটা বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব। একটি সাধারণ পাঠ্যক্রম কীভাবে সমাজ জীবনে সুদূরপ্রসারী ‘প্রভাব’ ফেলতে পারে, তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করেন তিনি।
ড. অসীম কুমার দত্তরায়ের পাশাপাশি এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেএমএন মেডিক্যাল কলেজের অন্যতম কর্ণধার শীলা সিং বোস সহ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জগতের একাধিক বিশিষ্ট ও সম্মানীয় ব্যক্তিবর্গ। কর্ণধার শীলা সিং বোস তাঁর বক্তব্যে এই নতুন ইউনিভার্সিটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সমাজ গঠনে চিকিৎসকদের অবিচল দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁর সুনিপুণ পরিচালনায় গোটা অনুষ্ঠানটি এক সুশৃঙ্খল মাত্রা পায়। সার্বিকভাবে, উন্নত চিকিৎসা শিক্ষার প্রসার, পরিবেশ রক্ষার প্রবল তাগিদ এবং আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞদের মহামিলনে চাকদহের জেএমএন মেডিক্যাল কলেজের সোমবারের এই বহুমুখী কর্মসূচি আক্ষরিক অর্থেই এক ঐতিহাসিক এবং অভাবনীয় সাফল্য মণ্ডিত হয়ে রইল নদিয়ার বুকে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments