Homeখেলাগিলের ‘ক্যাপ্টেন্স নক’ এবং কোহলির ‘বিরাট’ শতরান! স্পিনের ভেলকিতে ক্যারিবিয়ানদের দুরমুশ করে তিরুবনন্তপুরমে জয়ী ভারত

গিলের ‘ক্যাপ্টেন্স নক’ এবং কোহলির ‘বিরাট’ শতরান! স্পিনের ভেলকিতে ক্যারিবিয়ানদের দুরমুশ করে তিরুবনন্তপুরমে জয়ী ভারত

koheli

নিউজ ডেস্ক: সবুজ গালিচায় যেন আরও একবার লেখা হলো ভারতীয় ক্রিকেটের এক নতুন রূপকথা। অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের এক নিখুঁত ও বিধ্বংসী মেলবন্ধনের সাক্ষী থাকল কেরলের তিরুবনন্তপুরমের গ্রিনফিল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়াম। রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর এই মহারণে সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজকে রীতিমতো উড়িয়ে দিয়ে তিন ম্যাচের একদিনের আন্তর্জাতিক (ODI) সিরিজে ১-০ ব্যবধানে একচেটিয়াভাবে এগিয়ে গেল টিম ইন্ডিয়া। ক্যারিবিয়ানদের ছুঁড়ে দেওয়া আপাত-প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রান তাড়া করতে নেমে ভারত যে কেবল ম্যাচটি জিতল তা-ই নয়, বরং ৫০ বল বাকি থাকতেই ৮ উইকেটের এক বিশাল ও দাপুটে জয় ছিনিয়ে নিল। আর এই দুর্দান্ত জয়ের নেপথ্যে প্রধান দুই কারিগর হয়ে রইলেন আধুনিক ক্রিকেটের ‘চেজ মাস্টার’ বিরাট কোহলি এবং ভারতীয় দলের বর্তমান অধিনায়ক শুভমন গিল। বল হাতে কুলদীপ যাদবের স্পিন-জাদু আর ব্যাট হাতে গিল-কোহলির অনবদ্য শতরানের জুটিতে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ল ক্যারিবিয়ান শিবির।

এ দিন টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ভারতীয় অধিনায়ক শুভমন গিল। তিরুবনন্তপুরমের মেঘলা আকাশ এবং সন্ধ্যার শিশিরের কথা মাথায় রেখেই হয়তো রান তাড়া করার এই রণনীতি সাজিয়েছিল ভারতীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ শুরুটা বেশ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতেই করেছিল। ক্যারিবিয়ান ওপেনারদের আগ্রাসী মেজাজে একটা সময় মনে হচ্ছিল, বোর্ডে হয়তো ৩০০ পার করা এক বিশাল রান উঠতে চলেছে। কিন্তু মাঝের ওভারগুলোতে বল হাতে ভারতীয় স্পিন আক্রমণের অন্যতম প্রধান অস্ত্র, ‘চায়নাম্যান’ বোলার কুলদীপ যাদব আক্ষরিক অর্থেই ক্যারিবিয়ান ব্যাটারদের চারপাশে এক মায়াবী স্পিন-জাল বুনে দেন। তাঁর বলের ফ্লাইট, টার্ন এবং বিভ্রান্তিকর গুগলি বুঝতে না পেরে একের পর এক উইকেট ছুঁড়ে দিয়ে সাজঘরে ফেরেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের শক্তিশালী মিডল অর্ডারের ব্যাটাররা। অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং বুদ্ধিদীপ্ত বোলিং করে কুলদীপ নিজের নির্ধারিত কোটায় মাত্র ৪০ রান খরচ করে তুলে নেন মহামূল্যবান ৪টি উইকেট। তাঁর এই ধ্বংসাত্মক স্পেলের কারণেই ক্যারিবিয়ানদের বড় রান তোলার স্বপ্নে জল পড়ে যায়। তবুও শেষ দিকের কিছু ঝোড়ো ব্যাটিংয়ের সুবাদে ওয়েস্ট ইন্ডিজ স্কোরবোর্ডে একটি বেশ লড়াই করার মতো রান দাঁড় করায়।

তবে রান তাড়া করতে নেমে ভারতের শুরুটা খুব একটা স্বস্তিদায়ক হয়নি। ইনিংসের একেবারে গোড়াতেই একটি উইকেট হারিয়ে ভারত যখন সামান্য চাপে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্রিজে আসেন ‘কিং’ কোহলি। আর তারপর থেকেই তিরুবনন্তপুরমের দর্শকরা সাক্ষী থাকলেন এক নিখাদ ব্যাটিং মাস্টারক্লাসের। একদিকে অধিনায়ক শুভমন গিল যেমন অত্যন্ত পরিণত মস্তিষ্কে নিজের ইনিংসকে সাজাচ্ছিলেন, অন্যদিকে বিরাট কোহলি প্রথম বল থেকেই ক্যারিবিয়ান বোলারদের ওপর রীতিমতো স্টিম রোলার চালাতে শুরু করেন। মাত্র ৮৮ বল মোকাবিলা করে বিরাট তুলে নেন তাঁর অপরাজিত ১৩৯ রানের এক মহাকাব্যিক শতরান। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রিফ্লেক্স যে এতটুকুও কমেনি, বরং তিনি যে আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠেছেন, তা এই ইনিংস থেকেই স্পষ্ট। তাঁর ব্যাট থেকে বেরোনো চোখধাঁধানো কভার ড্রাইভ, কবজির মোচড়ে মারা ফ্লিক আর স্পিনারদের বিরুদ্ধে স্টেপ-আউট করে মারা বিশাল ছক্কাগুলো দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায় গোটা স্টেডিয়াম। তাঁর এই ১৩৯ রানের ইনিংসে ছিল নিখুঁত টাইমিং এবং প্রবল আগ্রাসনের এক অদ্ভুত সুন্দর রসায়ন।

বিরাটের এই তাণ্ডবের যোগ্য সঙ্গত দেন অধিনায়ক শুভমন গিল। অধিনায়ক হিসেবে নিজের দায়িত্ব এবং দলের প্রতি দায়বদ্ধতার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি খেলেন ১১০ রানের এক অনবদ্য এবং দাপুটে ‘ক্যাপ্টেন্স নক’। গিলের এই ইনিংসটি ছিল আদ্যোপান্ত ধ্রুপদী ক্রিকেটের মোড়কে সাজানো। তাড়াহুড়ো না করে, অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় তিনি বলের গুণাগুণ বিচার করে শট নির্বাচন করেছেন। অফ সাইডে তাঁর ট্রেডমার্ক কাট এবং ড্রাইভগুলো ছিল দেখার মতো। কোহলি এবং গিলের এই বিশাল ও নিরবচ্ছিন্ন শতরানের জুটিই মূলত ওয়েস্ট ইন্ডিজের হাত থেকে ম্যাচের রাশ পুরোপুরি কেড়ে নেয়। এই দুই ব্যাটারের বোঝাপড়া, উইকেটের মাঝে দ্রুত রান নেওয়ার প্রবণতা এবং বাজে বলকে বাউন্ডারির বাইরে পাঠানোর দক্ষতা ক্যারিবিয়ান বোলারদের পুরোপুরি ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়।

ম্যাচের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC) বা আইসিসি-র বিশেষ ম্যাচ বিশ্লেষণেও ভারতের এই সর্বাঙ্গীণ আধিপত্যের কথাই বারবার উঠে এসেছে। আইসিসি-র বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ স্কোরবোর্ডে একটি বেশ ভালো ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রান তুলতে সক্ষম হলেও, ভারতের সুগভীর ব্যাটিং লাইন-আপ এবং বৈচিত্র্যময় স্পিন আক্রমণের সামনে তারা শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ক্যারিবিয়ান পেসারদের কাছে কোহলি-গিল জুটিকে ভাঙার মতো কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা মারণাস্ত্র ছিল না। অন্যদিকে, ভারতীয় স্পিনাররা, বিশেষ করে কুলদীপ যাদব মাঝের ওভারগুলোতে যেভাবে রানের গতিতে লাগাম পরিয়ে উইকেট তুলে নিয়েছেন, সেটাই আসলে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। পাশাপাশি, রান তাড়া করতে নেমে কোহলির প্রবল আগ্রাসী ব্যাটিং এবং গিলের অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও দায়িত্বশীল শতরানের জুটিই ভারতের জয়ের পথকে এতটা সহজ ও মসৃণ করে দিয়েছে। এই দাপুটে জয়ের ফলে সিরিজে আপাতত চালকের আসনে ভারত। আগামী ম্যাচে এই আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করেই যে সিরিজ পকেটে পুরতে চাইবে শুভমন গিলের দল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved