
নিউজ ডেস্ক: সাফল্যের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন জাতীয় সঙ্গীত বাজে, তখন পদকজয়ীর চোখে যে জল চিকচিক করে, তার পেছনে লুকিয়ে থাকে হাজারো রাতের না-ঘুমানোর গল্প, রক্তজল করা পরিশ্রম আর না-পাওয়া যন্ত্রণার এক দীর্ঘ উপাখ্যান। এশিয়ান গেমসের (Asian Games) মতো বিশ্বমানের মেগা ক্রীড়া মঞ্চে ভারতের জাতীয় পতাকাকে সর্বোচ্চ শিখরে তুলে ধরে কাবাডিতে (Kabaddi) সোনার পদক ছিনিয়ে এনেছেন নদীয়ার রানাঘাটের মেয়ে পিঙ্কি রায়। আর এই পদক জয়ের সঙ্গে সঙ্গেই রচিত হয়েছে এক অদম্য জেদ, ইস্পাতকঠিন মানসিকতা আর সীমাহীন লড়াইয়ের এক জ্বলন্ত ইতিহাস। চরম দারিদ্র্য, ব্যক্তিগত স্তরের একের পর এক ট্র্যাজেডি এবং মারাত্মক চোট-আঘাতের মতো পাহাড়প্রমাণ বাধাকে কার্যত হেলায় হারিয়ে আজ তিনি গোটা দেশের গর্ব। পদক জয়ের পর দিল্লি বিমানবন্দরে পা রেখেই আবেগাপ্লুত পিঙ্কি ফোনে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে বলেন, “এই সোনা জয় আমার প্রয়াত বাবা-মা ও পুরো পরিবারের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল। আজ সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে নিজেকে সত্যিই ধন্য মনে হচ্ছে।” আগামী সোমবার তিনি পা রাখছেন তিলোত্তমা কলকাতায়, আর ঘরের মেয়েকে রাজকীয় অভ্যর্থনায় বরণ করে নিতে এখন রীতিমতো মুখিয়ে রয়েছে নদীয়া সহ গোটা বাংলা।
পিঙ্কির এই অবিশ্বাস্য উত্থান কোনও রূপকথার গল্প নয়, বরং এটি জীবনের প্রতিটি বাঁকে হার না মানার এক রূঢ় বাস্তব। সালটা ১৯৯৯। পিঙ্কির বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। সেই অবুঝ বয়সেই মাথার ওপর থেকে পিতৃস্নেহের মজবুত ছাদটুকু চিরতরে হারিয়ে যায়। বাবা চণ্ডী রায়ের অকাল প্রয়াণ গোটা পরিবারকে এক চরম আর্থিক ও মানসিক খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছিল। এরপর থেকে মা ঝুমা রায় এবং দিদি রুমা রায়ের হাত ধরে সীমাহীন প্রতিকূলতা ও অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে তাঁর বেড়ে ওঠা। সমাজে একজন সাধারণ ঘরের মেয়ের পক্ষে কাবাডির মতো একটি কায়িক ও রুক্ষ খেলায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা কতটা কঠিন, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। কিন্তু পিঙ্কির চোখে ছিল বিশ্বজয়ের স্বপ্ন।
২০০৮-০৯ সাল নাগাদ তাঁর ক্রীড়া জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করে। রানাঘাটের তৎকালীন ক্রীড়া শিক্ষিকা স্মরিতা চৌধুরীর জহুরির চোখ প্রথম চিনে নিয়েছিল এই লাজুক কিশোরীর ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে। তাঁর হাত ধরেই কাবাডির মূল স্রোতে প্রবেশ। এরপর প্রথম কোচ অভয় বিশ্বাস ও পিঙ্কি দাসের কড়া শাসনে তাঁর ভিত মজবুত হয়। পরবর্তীকালে চন্দননগরের স্বনামধন্য কোচ তন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের বৈজ্ঞানিক ও কঠোর অনুশীলনে নিজেকে তিল তিল করে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে গড়ে তোলেন তিনি। তাঁর এই কঠোর পরিশ্রমের প্রথম বড় স্বীকৃতি আসে ২০১৩ সালে। দীর্ঘ ৩৪ বছরের খরা কাটিয়ে পিঙ্কির অনবদ্য পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই সেবার বিচ কাবাডিতে (Beach Kabaddi) রূপো জিতে নিয়েছিল রাজ্য দল। সেই সাফল্যের ওপর ভর করেই ২০১৬ সালে ভারতীয় রেলে (Indian Railways) চাকরি পান তিনি। রেলের দলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই জাতীয় স্তরের হেভিওয়েট তারকাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অনুশীলনের সুযোগ পান, যা তাঁর খেলার কৌশল ও মানসিকতাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
কিন্তু খ্যাতির আলো যখন তাঁর ওপর পড়তে শুরু করেছে, ঠিক তখনই ভাগ্য যেন তাঁর সঙ্গে এক নিষ্ঠুর খেলায় মেতে ওঠে। ২০১৭ সালে তাঁর জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে বড় আঘাত— মাতৃহারা হন পিঙ্কি। যে মায়ের ঘামে আর চোখের জলে তাঁর কাবাডির পাঠ শুরু হয়েছিল, সেই মা-ই সাফল্যের চূড়ান্ত রূপ দেখার আগেই চিরবিদায় নেন। মায়ের মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে কার্যত পঙ্গু করে দিয়েছিল। কিন্তু লড়াই যার রক্তে, সে তো আর সহজে হাল ছাড়ার পাত্রী নয়। শোক সামলে তিনি ফের যখন ম্যাটে নামলেন, তখন ২০১৯ সালে সাউথ এশিয়ান গেমসের (South Asian Games) আগে হাঁটুতে মারাত্মক চোট পান। কাবাডির মতো বডি-কন্ট্যাক্ট গেমে হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া বা অস্ত্রোপচার মানে একজন খেলোয়াড়ের কেরিয়ার প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া। বাধ্য হয়েই সেই বছর গেমস থেকে ছিটকে যান তিনি। এখানেই শেষ নয়, ২০২৪ সালের বিশ্বকাপের দল চূড়ান্ত হওয়ার সময়ও তাঁকে হতাশার অন্ধকারে ডুবিয়ে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। একের পর এক এমন বিপর্যয়ে যে কোনও সাধারণ খেলোয়াড় হয়তো খেলাটাই ছেড়ে দিতেন।
কিন্তু পিঙ্কি তো সাধারণ নন। ছাইখাঁদ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্র তিনি খুব ভালো করেই জানতেন। এই চরম হতাশার দিনগুলোতে তাঁর পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন দিদি রুমা রায় এবং অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত কাবাডি তারকা তথা তাঁর প্রাণের বন্ধু ঋতু নেগী। তাঁদের নিরন্তর উৎসাহ, মানসিক সমর্থন এবং নিজের ভেতরের নাছোড়বান্দা জেদকে সম্বল করে পিঙ্কি আবার ম্যাটে ফিরে আসেন। সমস্ত বঞ্চনা, চোট এবং অবহেলার জবাব তিনি দিয়েছেন এশিয়ান গেমসের ফাইনালে বিপক্ষ দলকে কার্যত গুঁড়িয়ে দিয়ে। আজ তাঁর গলায় ঝুলছে সেই বহুকাঙ্ক্ষিত সোনার মেডেল। এই সোনা কেবল একটি পদক নয়, এটি রানাঘাটের এক অখ্যাত গলি থেকে উঠে আসা এক অনাথ মেয়ের বিশ্বজয়ের শংসাপত্র। সোমবার ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরবে। তাই রানাঘাটের পাড়ায় পাড়ায় এখন শুধুই উৎসবের প্রস্তুতি। একসময় যাঁরা পিঙ্কির কাবাডি খেলা নিয়ে ভ্রু কুঁচকেছিলেন, আজ তাঁরাই ফুলের মালা হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বাংলার এই সোনার মেয়েকে স্বাগত জানাতে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments