Homeজেলানিষিদ্ধ পল্লিতে ব্ল্যাকমেল করে ৭০ হাজার টাকা ছিনতাই! শান্তিপুরে পুলিশের জালে মহিলা, উদ্ধার নগদ ৬৮ হাজার

নিষিদ্ধ পল্লিতে ব্ল্যাকমেল করে ৭০ হাজার টাকা ছিনতাই! শান্তিপুরে পুলিশের জালে মহিলা, উদ্ধার নগদ ৬৮ হাজার

note

নিউজ ডেস্ক: নদিয়া জেলার শান্তিপুরে এক চাঞ্চল্যকর ছিনতাইয়ের ঘটনার কিনারা করল পুলিশ। শহরের বুকে অবস্থিত নিষিদ্ধ পল্লি বা যৌনপল্লিতে গিয়ে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার শিকার হলেন এক সাধারণ ব্যক্তি। ভয় দেখিয়ে, সামাজিকভাবে কালিমালিপ্ত করার ব্ল্যাকমেল করে এবং রীতিমতো প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তাঁর কাছ থেকে বলপূর্বক ৭০ হাজার টাকা ছিনতাই করার অভিযোগ উঠল এক মহিলার বিরুদ্ধে। তবে পুলিশের তৎপরতায় শেষ রক্ষা হলো না অভিযুক্তের। অভিযোগ দায়ের হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ক্ষিপ্র অভিযান চালিয়ে মূল অভিযুক্ত মহিলাকে গ্রেফতার করল শান্তিপুর থানার পুলিশ। শুধু গ্রেফতারিই নয়, পুলিশের কড়া জেরার মুখে ভেঙে পড়ে অপরাধ স্বীকার করার পর, অভিযুক্তের গোপন ডেরা থেকে খোয়া যাওয়া অর্থের সিংহভাগ অর্থাৎ নগদ ৬৮ হাজার টাকা উদ্ধার করতেও সক্ষম হয়েছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। পুলিশি হেফাজতের মেয়াদ শেষে ধৃত মহিলাকে রানাঘাট মহকুমা আদালতে পেশ করা হলে, বিচারক তাকে বিচারবিভাগীয় বা জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

সমাজতত্ত্ববিদ এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত নিষিদ্ধ পল্লি বা যৌনপল্লিতে ঘটা কোনও অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হতে চরম কুণ্ঠাবোধ করেন। একটি সাধারণ ছুৎমার্গ এবং লোকলজ্জার ভয় তাঁদের গ্রাস করে রাখে। আর মানুষের এই দুর্বলতা বা সামাজিক লজ্জার সুযোগটিকেই প্রধান হাতিয়ার করে ওই সমস্ত এলাকায় গজিয়ে ওঠে নানা অসাধু অপরাধ চক্র। ব্ল্যাকমেল, তোলাবাজি বা জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের ঘটনা এই ধরনের এলাকায় মাঝে মাঝেই ঘটে বলে কানাঘুষো শোনা যায়। দুর্বৃত্তরা ভালো করেই জানে যে, ভুক্তভোগী ব্যক্তি সম্মান হারানোর ভয়ে কিছুতেই থানা বা পুলিশের চৌকাঠ মাড়াবেন না। কিন্তু শান্তিপুরের এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই চিরাচরিত ধারণাকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছে। জানা গিয়েছে, ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তি কোনও এক কারণে শান্তিপুরের ওই যৌনপল্লিতে গিয়েছিলেন। আর সেখানেই তিনি ওই অভিযুক্ত মহিলার খপ্পরে পড়েন। মহিলা ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা ওই ব্যক্তিকে আটকে রেখে তাঁর সামাজিক পরিচিতি নষ্ট করে দেওয়ার ভয় দেখায় এবং বলপূর্বক তাঁর কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়।

এই চরম মানসিক ও আর্থিক বিপর্যয়ের পর ভুক্তভোগী ব্যক্তি প্রথমে ভয় পেলেও, পরে অসীম সাহস সঞ্চয় করে সরাসরি শান্তিপুর থানার পুলিশের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি গোটা ঘটনাটি বিন্দুমাত্র গোপন না করে বিস্তারিত জানিয়ে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সামাজিক লজ্জার তোয়াক্কা না করে অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এই পদক্ষেপই তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই শান্তিপুর থানার পুলিশ গোটা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে। তদন্তকারী শীর্ষ আধিকারিকরা বুঝতে পারেন, দ্রুত পদক্ষেপ না করলে অভিযুক্ত প্রমাণ লোপাট করে দিতে পারে বা ছিনতাই হওয়া টাকা হাতবদল করে অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলতে পারে। সেই মতো আর কালবিলম্ব না করে একটি বিশেষ পুলিশ বাহিনী গঠন করে দ্রুত ওই নির্দিষ্ট এলাকায় অভিযান চালানো হয়। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে এবং সোর্সের দেওয়া নিখুঁত তথ্যের ভিত্তিতে মূল অভিযুক্ত মহিলাকে অত্যন্ত সন্তর্পণে চিহ্নিত করে হাতেনাতে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় শান্তিপুর থানার পুলিশ।

এরপর শুরু হয় আসল আইনি লড়াই এবং পুলিশের পেশাদারি দক্ষতার পরীক্ষা। অপরাধের মূল সূত্রপাত কীভাবে হলো, এর নেপথ্যে আরও বড় কোনও চক্র বা অন্য কারও ইন্ধন রয়েছে কি না এবং সবচেয়ে বড় কথা, খোয়া যাওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে পুলিশ প্রথমে অভিযুক্তকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানায় আদালতে। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করলে, ওই মহিলাকে পুলিশি হেফাজতে (পুলিশ রিমান্ড) এনে শুরু হয় ম্যারাথন জেরা। পুলিশের জেরার মুখে প্রথমদিকে অভিযুক্ত নানা রকম টালবাহানা করার চেষ্টা করে এবং তদন্তের অভিমুখ ঘুরিয়ে দেওয়ার ফন্দি আঁটে। কিন্তু দুঁদে তদন্তকারীদের বিজ্ঞানসম্মত, ধারাবাহিক এবং কড়া জিজ্ঞাসাবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে সে। নিজের দোষ পুরোপুরি কবুল করে নেয় অভিযুক্ত মহিলা। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ তার গোপন আস্তানা এবং সম্ভাব্য ডেরাগুলিতে তল্লাশি চালায়। আর সেখান থেকেই উদ্ধার হয় ছিনতাই হওয়া ৭০ হাজার টাকার মধ্যে নগদ ৬৮ হাজার টাকা। এত অল্প সময়ের মধ্যে খোয়া যাওয়া অর্থের প্রায় সম্পূর্ণটাই উদ্ধার করতে পারা শান্তিপুর পুলিশের এক বড়সড় সাফল্য হিসেবেই দেখছে ওয়াকিবহাল মহল।

পূর্বে মঞ্জুর হওয়া পুলিশি হেফাজতের মেয়াদ শেষ হওয়ায় কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ধৃত মহিলাকে পুনরায় রানাঘাট মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়। মামলার তদন্তকারী আধিকারিকরা আদালতে নতুন তথ্যপ্রমাণ এবং উদ্ধার হওয়া টাকার বিস্তারিত সিজার লিস্ট (Seizure List) জমা দেন। যেহেতু মূল অর্থ উদ্ধার হয়ে গিয়েছে এবং অভিযুক্তকে জেরার কাজ প্রাথমিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তাই নতুন করে আর পুলিশি হেফাজতের প্রয়োজন ছিল না। তবে অভিযুক্ত মহিলা যাতে জামিন পেয়ে বাইরে বেরিয়ে প্রমাণ নষ্ট করতে না পারে, সাক্ষীদের প্রভাবিত করতে না পারে বা ভুক্তভোগী ব্যক্তিকে পুনরায় হুমকি দিতে না পারে, সেই কারণগুলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে অভিযুক্তের বিচারবিভাগীয় বা জেল হেফাজতের (Jail Custody) আবেদন জানায় শান্তিপুর থানার পুলিশ।

রানাঘাট মহকুমা আদালতের বিচারক উভয় পক্ষের আইনজীবীদের সওয়াল জবাব এবং কেস ডায়েরি (Case Diary) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার পর পুলিশের আবেদন মঞ্জুর করেন এবং অভিযুক্ত মহিলাকে জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই ঘটনা সমাজের সামনে একটি অত্যন্ত কড়া ও ইতিবাচক বার্তা তুলে ধরেছে। অপরাধ যেখানেই ঘটুক না কেন, অপরাধী যত বড় ব্ল্যাকমেলারই হোক না কেন, সাধারণ মানুষ যদি ভয় না পেয়ে সরাসরি আইনের আশ্রয় নেন, তবে পুলিশের পক্ষে অপরাধীদের কঠোর সাজা দেওয়া এবং চুরি বা ছিনতাই হওয়া জিনিস উদ্ধার করা সম্পূর্ণ সম্ভব। শান্তিপুর পুলিশের এই ক্ষিপ্র ও সফল পদক্ষেপে এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রশাসনযন্ত্রের প্রতি আস্থার বার্তা আগামী দিনে আরও সুদৃঢ় হলো।

No Comments

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved