Last updated: September 20th, 2026 at 09:47 pm

নিউজ ডেস্ক: ভালোবাসার পূর্ণতা না পাওয়ার জ্বালা এবং অভিমান যে কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, আরও একবার তার মর্মান্তিক এবং শিউরে ওঠার মতো প্রমাণ মিলল নদীয়া জেলার শান্তিপুরে। প্রেমের সম্পর্কে পরিবারের স্বীকৃতি না মেলা এবং তা নিয়ে লাগাতার অশান্তির জেরে চরম পথ বেছে নিল এক তরুণ যুগল। প্রথমে অভিমানে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মঘাতী হলেন প্রেমিকা। আর সেই বুকফাটা দুঃসংবাদ ফোনে শোনার পর মুহূর্তের মধ্যেই আত্মহননের পথ বেছে নিলেন প্রেমিকও। প্রেমিকার মৃত্যুর খবর পেয়ে বাড়ির পাশের এক বাঁশবাগানে গলায় গামছার ফাঁস লাগিয়ে আত্মঘাতী হলেন তিনি। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি তরতাজা প্রাণের অকাল মৃত্যুতে নদীয়ার শান্তিপুর এবং ফুলিয়া এলাকায় আছড়ে পড়েছে শোকের সুনামি। ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই এলাকাতেই রীতিমতো ব্যাপক চাঞ্চল্য ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ দুটি মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই জোড়া আত্মহত্যার নেপথ্যে রয়েছে এক করুণ ও ব্যর্থ প্রেমের আখ্যান। শান্তিপুর ব্লকের ফুলিয়া এলাকার বাসিন্দা বছর কুড়ির এক যুবক আকাশ দেবনাথের সঙ্গে বেশ কিছুদিন আগে পরিচয় হয় শান্তিপুর পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শিল্পা সরকারের। বয়সের ধর্মেই এই সাধারণ পরিচয় খুব দ্রুত এক গভীর প্রণয়ঘটিত সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। দু’জনের মধ্যেই তৈরি হয় এক নিবিড় মানসিক টান। তাঁরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের এই ভালোবাসার স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজের চেনা বাস্তব। তাঁদের এই সম্পর্কের কথা খুব বেশি দিন গোপন থাকেনি। বিষয়টি জানাজানি হতেই তীব্র আপত্তি ওঠে মেয়ের পরিবারের তরফ থেকে। শিল্পার পরিবার কোনওভাবেই ফুলিয়ার বাসিন্দা আকাশের সঙ্গে এই সম্পর্ক মেনে নিতে রাজি ছিল না।
পরিবারের এই চূড়ান্ত অসম্মতি থেকেই সূত্রপাত হয় পারিবারিক অশান্তির। জানা গিয়েছে, সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার জন্য শিল্পার ওপর পরিবারের পক্ষ থেকে প্রবল চাপ সৃষ্টি করা হতে থাকে। কেবল বারণ করাই নয়, গত কয়েক দিন ধরে মেয়েটিকে এই সম্পর্কের জেরে লাগাতার বকাঝকা এবং মানসিক গঞ্জনা সহ্য করতে হচ্ছিল বলে অভিযোগ। গত দু’দিন ধরে এই অশান্তি এক চরম আকার ধারণ করে। মেয়ের পরিবার একাধিক বিষয়ে তাঁকে ভর্ৎসনা করে এবং আকাশের সঙ্গে সমস্ত রকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য কড়া নির্দেশ দেয়। একদিকে নিজের পরিবারের সম্মান ও চাপ, অন্যদিকে ভালোবাসার মানুষের প্রতি টান— এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন শিল্পা। প্রবল অভিমান, হতাশা এবং মুক্তির কোনও পথ না দেখতে পেয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহননের মতো এক ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন ওই তরুণী।
গতকাল অর্থাৎ ঘটনার দিন দুপুর নাগাদ পরিস্থিতি এক মর্মান্তিক মোড় নেয়। চরম পথ বেছে নেওয়ার ঠিক আগে শিল্পা তাঁর প্রেমিক আকাশকে মোবাইল ফোনে একটি শেষ এসএমএস (SMS) পাঠান। সেই বার্তায় লেখা ছিল কেবল কয়েকটি শব্দ— “ভালো থেকো।” এরপর নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মঘাতী হন শিল্পা। দীর্ঘক্ষণ মেয়ের কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ হয়। দরজা ভেঙে তাঁরা দেখতে পান, ঘরের ভেতরে ঝুলছে শিল্পার নিথর দেহ। চোখের সামনে তরতাজা মেয়ের এমন পরিণতি দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। মুহূর্তে শান্তিপুরের এক নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন।
অন্যদিকে, প্রেমিকার কাছ থেকে এমন বিদায়বেলার বার্তা পেয়ে তীব্র উৎকণ্ঠায় ভুগতে শুরু করেছিলেন আকাশ। তিনি বারবার শিল্পার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। অবশেষে কোনও উপায় না পেয়ে তিনি সরাসরি শিল্পার পরিবারের এক সদস্যকে ফোন করেন। আর সেই ফোনের মাধ্যমেই তাঁর কানে পৌঁছয় জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দুঃসংবাদটি। তাঁকে জানানো হয়, শিল্পা আর বেঁচে নেই, সে আত্মহত্যা করেছে। ভালোবাসার মানুষের চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার এই খবর আকাশের কাছে ছিল এক অশনিসংকেত। শিল্পা ছাড়া তাঁর নিজের জীবনও যে অর্থহীন, সেই ভাবনা থেকেই নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
প্রেমিকার মৃত্যুর খবর শোনার পর এক মুহূর্তও আর অপেক্ষা করেননি আকাশ। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে, তীব্র শোক ও যন্ত্রণায় তিনি ছুটে যান নিজের বাড়ির ঠিক পাশেই থাকা একটি নির্জন বাঁশবাগানে। সেখানে নিজের সঙ্গে থাকা একটি গামছা দিয়ে বাঁশগাছের ডালে ফাঁস লাগিয়ে আত্মঘাতী হন ওই যুবক। কিছুক্ষণ পর ফুলিয়ার স্থানীয় বাসিন্দারা বাঁশবাগানের ভেতরে আকাশের ঝুলন্ত মৃতদেহ দেখতে পেয়ে আঁতকে ওঠেন। খবর দেওয়া হয় আকাশের পরিবারকে। নিমেষের মধ্যে ফুলিয়া এলাকাতেও শোকের ছায়া নেমে আসে।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় শান্তিপুর থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী। পুলিশ মৃতদেহ দুটি উদ্ধার করে প্রাথমিক সুরতহাল (ইনকোয়েস্ট) সম্পন্ন করার পর ময়নাতদন্তের জন্য রানাঘাট পুলিশ মর্গে পাঠিয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, প্রেমের সম্পর্কে টানাপোড়েন এবং পরিবারের আপত্তির জেরেই এই জোড়া আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। তবে এর পেছনে অন্য কোনও প্ররোচনা বা কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ দুটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেই কথা বলছে এবং মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড ও মেসেজ পরীক্ষা করে দেখছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনা বর্তমান সমাজের সামনে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরেছে। মনোবিদ ও সমাজকর্মীদের মতে, কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণীদের বয়ঃসন্ধিকালের আবেগ অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়। প্রেমের সম্পর্কে বাধা এলে তারা অনেক সময়ই হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে পরিবারের উচিত ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা করা, বকাঝকা বা মানসিক চাপ সৃষ্টি না করে তাদের মানসিক অবস্থার কথা বোঝার চেষ্টা করা। একটি বকাঝকা বা জেদ যে দুটি তরতাজা প্রাণ এভাবে কেড়ে নিতে পারে, তা হয়তো দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি দুই পরিবার। আজ কেবলই শূন্যতা আর হাহাকার ঘিরে রয়েছে শান্তিপুর ও ফুলিয়ার ওই দুটি বাড়িতে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments