Last updated: September 20th, 2026 at 09:30 pm

নিউজ ডেস্ক: বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পীঠস্থান শান্তিপুর। যুগ যুগ ধরে এই জনপদের তাঁতশিল্পীদের হাতের জাদুতে বোনা শাড়ি বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে। কিন্তু এবার নদীয়া জেলার শান্তিপুরের তাঁতশিল্প সংবাদের শিরোনামে উঠে এল সম্পূর্ণ এক ভিন্ন এবং অভিনব কারণে। এবার কোনও সাধারণ সুতির শাড়ি বা চিরাচরিত ফুল-লতাপাতার নকশা নয়, আস্ত একটি হ্যান্ডলুমের খাঁটি সুতির টানাপোড়েনে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নিখুঁত এক প্রতিকৃতি। যন্ত্রের কোনও ছোঁয়া ছাড়াই, সম্পূর্ণ হস্তচালিত তাঁতের মাধ্যমে এই অনন্য শিল্পকর্মটি সৃষ্টি করেছেন শান্তিপুরের কৃতী সন্তান তথা স্বনামধন্য হ্যান্ডলুম সংস্থা ‘শিপকো’ (SHIPKO)-র অন্যতম কর্মকর্তা ও দক্ষ শিল্পী রতন বিশ্বাস। অভাবনীয় এই সৃষ্টিতে শিল্পীর মনে অপার আনন্দ ও আত্মতৃপ্তি থাকলেও, তাঁর বুকের গভীরে কোথাও যেন রয়ে গিয়েছে এক অদ্ভুত আক্ষেপ ও না-পাওয়ার যন্ত্রণা। কারণ, যে রাষ্ট্রনেতাকে ভালোবেসে তিনি এই প্রতিকৃতিটি বুনেছিলেন, এখনও পর্যন্ত সেই অনন্য শিল্পকর্মটি খোদ প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
শিল্পী রতন বিশ্বাস অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে তাঁর এই সৃষ্টি এবং আক্ষেপের পেছনের কাহিনি তুলে ধরেন। তিনি জানান, ঘটনার সূত্রপাত হয় এই বছরের শুরুতে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত হয়েছিল এক বিশাল হস্তশিল্প ও তাঁত প্রদর্শনী। সেখানে বাংলার ঐতিহ্যবাহী হ্যান্ডলুম সংস্থা হিসেবে স্টল দিয়েছিল ‘শিপকো’। প্রদর্শনী চলাকালীন তাঁদের কাছে খবর আসে যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সেই প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকবেন এবং শিপকোর স্টলে গিয়ে বাংলার তাঁতশিল্পীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন। এই অভাবনীয় খবরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন রতনবাবু। দেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁদের স্টলে আসবেন, আর তাঁকে খালি হাতে ফেরানো হবে, তা তো হতে পারে না! সেই ভাবনা থেকেই প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ উপহার দেওয়ার জন্য তিনি এই প্রতিকৃতি তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। টানা দশ দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে, নাওয়া-খাওয়া ভুলে সম্পূর্ণ হাতে খাঁটি সুতির উন্নতমানের সুতো ব্যবহার করে তিনি মোদীর এই প্রতিকৃতিটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলেন তাঁতের ফ্রেমে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, চরম সময়ের অভাব এবং প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে প্রদর্শনীতে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘটেনি। ফলে অতি যত্নে তৈরি করা সেই অমূল্য উপহারটিও তখন আর তাঁর হাতে তুলে দেওয়া যায়নি।
দিল্লিতে ব্যর্থ হওয়ার পর রতনবাবু আশা করেছিলেন, হয়তো নিজের রাজ্যেই এই উপহার তুলে দেওয়ার সুযোগ পাবেন। পরবর্তীতে লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন নদীয়া জেলায় মেগা জনসভা করতে আসেন, তখন আশায় বুক বেঁধেছিলেন শান্তিপুরের এই শিল্পী। স্থানীয় সাংসদ এবং রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে বহুবার চেষ্টা করেছিলেন যাতে অন্তত কয়েক মুহূর্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁর হাতে নিজের এই পরিশ্রমের ফসল তুলে দেওয়া যায়। কিন্তু সেখানেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নিরাপত্তা বলয় এবং অত্যন্ত নিশ্ছিদ্র ও ব্যস্ত সময়সূচি। ফলে আবারও হতাশ হয়ে ফিরতে হয় রতন বিশ্বাসকে। প্রতিকৃতিটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
তবে সম্প্রতি এই শিল্পকর্মটি ফের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শুভ জন্মদিন। সেই বিশেষ দিনটি উপলক্ষে রতনবাবু তাঁর দীর্ঘদিনের সযত্নে আগলে রাখা মোদীর ওই প্রতিকৃতির ছবি সামাজিক মাধ্যমে (সোশ্যাল মিডিয়া) প্রকাশ করেন। আর ছবি পোস্ট করার সঙ্গে সঙ্গেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। নেটিজেনরা শান্তিপুরের তাঁতশিল্পীর এই অসামান্য প্রতিভার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন। বর্তমানে সুতোর বুননে তৈরি প্রধানমন্ত্রীর এই নিখুঁত প্রতিকৃতিটি শিল্পীর নিজস্ব শোরুমেই পরম সযত্নে কাঁচের ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা রয়েছে, সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়, যেদিন এটি তার প্রকৃত প্রাপকের হাতে পৌঁছবে।
অবশ্য রতনবাবুর শৈল্পিক জীবনের ঝুলিতে এটাই প্রথম এমন কাজ নয়। তিনি জানান, হ্যান্ডলুমের সুতোর বুননে প্রতিকৃতি তৈরির এই বিশেষ শিল্পকর্মে তিনি যথেষ্ট সিদ্ধহস্ত। এর আগে তিনি সুতোর টানে অত্যন্ত নিপুণভাবে তৈরি করেছেন জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং স্বামী বিবেকানন্দের মতো যুগনায়ক ও মণীষীদের প্রতিকৃতিও। তাঁর শিল্পকর্মের খ্যাতি শুধু শান্তিপুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তা পৌঁছে গিয়েছে রাজ্যের প্রশাসনিক শীর্ষ মহলেও। রতনবাবু জানান, শান্তিপুরের প্রাক্তন বিধায়ক শুভ্রত ঘোষের মাধ্যমে তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি প্রতিকৃতিও তৈরি করেছিলেন এবং তা অত্যন্ত সফলভাবে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। সেই কাজও ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল বিভিন্ন মহলে।
বর্তমান যুগে যখন যন্ত্রচালিত পাওয়ারলুমের রমরমা, তখন হস্তচালিত তাঁতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই যখন ঘোর অন্ধকারে, তখন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে যথেষ্ট আশাবাদী রতন বিশ্বাস। পাওয়ারলুমের দাপটে হ্যান্ডলুম হারিয়ে যাবে, এমনটা তিনি মানতে নারাজ। তাঁর স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য, আধুনিক যন্ত্র হয়তো উৎপাদন বাড়াতে পারে, কিন্তু তা কখনওই মানুষের হাতের নিখুঁত নকশা, আবেগ আর সুক্ষ্ম বুননের সমকক্ষ হতে পারে না। হ্যান্ডলুমের কদর ও চাহিদা মানুষের মনে চিরকাল থাকবে। নিজে একসময় একটি জীর্ণ কুঁড়েঘর থেকে জীবনের লড়াই শুরু করেছিলেন। চরম দারিদ্র্যকে হারিয়ে আজ চার ভাইয়ের সম্মিলিত চেষ্টায় তাঁত পরিচালনা ও ব্যবসা করে একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী ও ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন রতন বিশ্বাস। তাঁর জীবনের এখন একটাই অধরা স্বপ্ন— প্রধানমন্ত্রীর জন্য তৈরি তাঁর এই অনন্য সৃষ্টি একদিন যেন সমস্ত প্রোটোকল পেরিয়ে সসম্মানে নরেন্দ্র মোদীর নিজের হাতে গিয়ে পৌঁছয়। সেই দিনের অপেক্ষাতেই প্রহর গুনছে শান্তিপুরের শিপকো এবং শিল্পী রতন।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments