Last updated: September 20th, 2026 at 09:12 pm

নিউজ ডেস্ক: শিক্ষার আঙিনায় একটি প্রতিষ্ঠানের ৫০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন পথচলা কেবল একটি সময়ের খতিয়ান নয়, বরং তা হাজার হাজার শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার এক জীবন্ত দলিল। শিক্ষাপ্রসারের সেই সুদীর্ঘ ও গৌরবময় অর্ধশতক পার করে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল নদীয়া জেলার রানাঘাট শহরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘নিবেদিত শিশুতীর্থ কে.জি. স্কুল’। ভগিনী নিবেদিতার আদর্শকে পাথেয় করে যে বিদ্যালয়ের পথচলা শুরু হয়েছিল, তা আজ পঞ্চাশটি বসন্ত পেরিয়ে এক পরিণত মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এই স্মরণীয় ৫০ বছর পূর্তি বা সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে সম্প্রতি রানাঘাটের ঐতিহ্যমণ্ডিত নজরুল মঞ্চে এক বর্ণাঢ্য ও প্রাণোচ্ছল বর্ষপূর্তি উৎসবের আয়োজন করা হয়। যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল অতীত ও বর্তমান, প্রবীণ ও নবীন। স্মৃতির সরণি বেয়ে প্রাক্তনীদের ফিরে আসা আর বর্তমান প্রজন্মের কলকাকলিতে নজরুল মঞ্চের পরিবেশ হয়ে উঠেছিল আক্ষরিক অর্থেই এক মিলনমেলা।
একটি শিশুর জীবনে প্রাক-প্রাথমিক বা কিন্ডারগার্টেন (কে.জি.) শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। এখান থেকেই একটি শিশুর অক্ষর পরিচয় ঘটে, সামাজিকতার প্রথম পাঠ শুরু হয়। গত পাঁচ দশক ধরে রানাঘাট ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার অজস্র শিশুর জীবনের সেই শক্ত ভিত গড়ে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছে নিবেদিত শিশুতীর্থ। এদিন সুবর্ণ জয়ন্তীর এই বিশেষ অনুষ্ঠানের শুরুতেই এক পবিত্র ও ভাবগম্ভীর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে এই মেগা অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক শুভ সূচনা করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের বিশিষ্ট সন্ন্যাসী শ্রদ্ধেয় শাশ্বত দাস মহারাজ। প্রদীপের স্নিগ্ধ আলো আর বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে যখন উৎসবের পর্দা ওঠে, তখন সমগ্র নজরুল মঞ্চ এক অনাবিল শান্তিতে ভরে যায়। শাশ্বত দাস মহারাজ তাঁর আশীর্বাদী ভাষণে শিশুদের চরিত্র গঠন এবং প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষকদের অপরিসীম ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
সুবর্ণ জয়ন্তীর এই মঞ্চ কেবল বিদ্যালয়ের নিজস্ব গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। রানাঘাট শহরের শিক্ষানুরাগী ও সারস্বত সমাজের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল এদিনের অনুষ্ঠানে। রানাঘাটের অন্যান্য স্বনামধন্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক-শিক্ষিকারা এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নিবেদিত শিশুতীর্থের এই সাফল্যকে কুর্নিশ জানান। পাশাপাশি, যে সমস্ত প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষিকা একসময় নিজেদের জীবনের মূল্যবান সময় এই বিদ্যালয়ের জন্য ব্যয় করেছেন, অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতিষ্ঠানটিকে আজকের এই জায়গায় দাঁড় করিয়েছেন, তাঁদের উপস্থিতিও এদিনের অনুষ্ঠানকে আরও মহিমান্বিত করে তোলে। প্রবীণ সেই শিক্ষকদের যখন মঞ্চে সংবর্ধনা দেওয়া হয়, তখন এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় গোটা প্রেক্ষাগৃহে।
যে কোনও বড় আয়োজনের নেপথ্যে থাকে একদল মানুষের নিরলস পরিশ্রম ও সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। সুবর্ণ জয়ন্তীর এই বিশাল অনুষ্ঠানটিকে সার্বিকভাবে সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও সর্বাঙ্গীণ সার্থক করে তুলতে দিনরাত এক করে কাজ করেছেন বিদ্যালয় পরিচালনা সমিতির সদস্যরা। সমগ্র আয়োজনের অগ্রভাগে থেকে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন পরিচালনা সমিতির সভাপতি তরুণ আচার্য এবং সম্পাদক সৌমেন মুখোপাধ্যায়। তাঁদের সুদক্ষ নেতৃত্বেই এই অনুষ্ঠান একটি সফল রূপ পায়। পাশাপাশি, বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা পিয়ালী পোদ্দারের ভূমিকাও ছিল প্রশংসনীয়। তিনি তাঁর বক্তব্যে বিদ্যালয়ের অতীত ইতিহাস, বর্তমানের লড়াই এবং আগামী দিনের স্বপ্নের কথা অত্যন্ত গুছিয়ে উপস্থিত দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন।
এছাড়াও এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে সফল করতে নেপথ্যে থেকে যাঁরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন পূর্ণেন্দু সিংহ রায়, প্রদীপ ঘোষ, অনুরাধা আচার্য, চৈতালী ঘোষ ও কল্যাণ কুমার ঘোষের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তাঁদের সকলের সম্মিলিত প্রয়াসেই সুবর্ণ জয়ন্তীর এই অনুষ্ঠানটি রানাঘাটের সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারে একটি স্মরণীয় দিন হিসেবে খোদাই হয়ে রইল।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ছিল বিদ্যালয়ের খুদে পড়ুয়া এবং প্রাক্তনীদের অংশগ্রহণে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ছোট ছোট শিশুদের নাচ, গান, আবৃত্তি ও শ্রুতিনাটক উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে। যে শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, মঞ্চে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ প্রমাণ করে দেয় যে, নিবেদিত শিশুতীর্থ কেবল পুঁথিগত শিক্ষাই দেয় না, বরং তাদের সাংস্কৃতিক ও মানসিক বিকাশেও সমানভাবে যত্নশীল। সব মিলিয়ে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নস্টালজিয়ার এই ত্রিবেণী সঙ্গম প্রাঙ্গণে উপস্থিত প্রত্যেক দর্শককে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। সুবর্ণ জয়ন্তীর এই আলোড়ন আগামী দিনে বিদ্যালয়টিকে আরও নতুন শিখরে পৌঁছতে সাহায্য করবে, এমনই আশা রানাঘাটবাসীর।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments