Homeদক্ষিণ ২৪ পরগনানিখোঁজের ন’বছর পরেও হদিস নেই, পুলিশের তদন্তে অসন্তুষ্ট হাইকোর্ট, মামলা গেল সিবিআইয়ের হাতে

নিখোঁজের ন’বছর পরেও হদিস নেই, পুলিশের তদন্তে অসন্তুষ্ট হাইকোর্ট, মামলা গেল সিবিআইয়ের হাতে

নিউজ ডেস্ক; প্রায় ন’বছর কেটে গিয়েছে। তবু নিখোঁজ মহিলার কোনও সন্ধান মেলেনি। তদন্তের নামে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার কোনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ। এমনকি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট
images (7)_edited

নিউজ ডেস্ক; প্রায় ন’বছর কেটে গিয়েছে। তবু নিখোঁজ মহিলার কোনও সন্ধান মেলেনি। তদন্তের নামে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার কোনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ। এমনকি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট বা চার্জশিটও জমা দিতে পারেনি রাজ্য পুলিশ। এই দীর্ঘসূত্রতা এবং তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে এবার তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল কলকাতা হাইকোর্ট। শেষ পর্যন্ত রাজ্য পুলিশের হাত থেকে তদন্তভার সরিয়ে তা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিল আদালত।

সোমবার বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি আর্যক দত্তের ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। সেখানেই রাজ্য পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিচারপতিরা। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এত দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চলার পরেও নিখোঁজ মহিলার সন্ধান পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট পর্যন্ত পেশ করা হয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে তদন্তকারী সংস্থা পরিবর্তন করাই উপযুক্ত বলে মনে করেছে ডিভিশন বেঞ্চ।

মামলার সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল মথুরাপুর থানা এলাকার বাসিন্দা আবুজাফর মোল্লার শ্যালিকা আচমকাই নিখোঁজ হয়ে যান। পরিবারের তরফে খোঁজাখুঁজি শুরু হলেও তাঁর কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে মথুরাপুর থানায় অপহরণের অভিযোগ দায়ের করা হয় এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু করে পুলিশ। তদন্ত শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মামলাটি যেন থমকে যায় বলে অভিযোগ পরিবারের।

এক বছর, দু’বছর করে সময় গড়াতে থাকে। কিন্তু নিখোঁজ মহিলার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনও তথ্য পুলিশের হাতে আসেনি। তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও পরিবারের অসন্তোষ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় নিখোঁজ মহিলার পরিবার। হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন দায়ের করে আদালতের কাছে তাঁদের দাবি ছিল, দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ থাকা ওই মহিলাকে খুঁজে বার করতে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হোক।

সোমবার সেই মামলারই শুনানি ছিল ডিভিশন বেঞ্চে। শুনানির সময় রাজ্যের তরফে গত ১৪ অগস্ট জমা দেওয়া ‘অ্যাকশন টেকন রিপোর্ট’-এর প্রসঙ্গ ওঠে। তদন্তে কী কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, তার একটি দীর্ঘ বিবরণ ওই রিপোর্টে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই রিপোর্ট পর্যালোচনা করেই সন্তুষ্ট হতে পারেনি আদালত। বরং আদালতের পর্যবেক্ষণ, রাজ্যের তরফে একাধিক পদক্ষেপের কথা বলা হলেও প্রায় ন’বছর পরেও মূল প্রশ্নটির উত্তর মেলেনি—নিখোঁজ মহিলা কোথায়?

আদালতের অসন্তোষের অন্যতম কারণ ছিল তদন্তের ফলাফল। দীর্ঘ সময় ধরে পুলিশ বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানালেও নিখোঁজ মহিলাকে খুঁজে বার করার ক্ষেত্রে কোনও দৃশ্যমান সাফল্য মেলেনি। শুধু তাই নয়, মামলার তদন্ত শেষ করে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নেও রাজ্যের অবস্থান আদালতকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। এত বছর পরেও তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

এর পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে শুনানিতে। নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার সঙ্গে মানব-পাচার চক্রের কোনও যোগ রয়েছে কি না, সেটিও এখনও স্পষ্ট নয়। তদন্তে সেই দিকটি কতটা খতিয়ে দেখা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত। দীর্ঘ সময় ধরে কোনও নিশ্চিত সূত্র না মেলায় মামলাটির প্রকৃতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে তদন্তে নতুন গতি আনতে রাজ্য পুলিশের পরিবর্তে সিবিআইকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ডিভিশন বেঞ্চ। আদালতের নির্দেশ, সিবিআইকে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করতে হবে। সেই দলের নেতৃত্বে থাকবেন পুলিশ সুপার পদমর্যাদার এক আধিকারিক। তাঁর পছন্দ অনুযায়ী আরও দু’জন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা আধিকারিককে তদন্তকারী দলে রাখা হবে।

শুধু তদন্তভার বদল করাই নয়, রাজ্য পুলিশের কাছে থাকা মামলার সমস্ত নথিপত্রও দ্রুত সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এত দিন ধরে তদন্তে যে সমস্ত তথ্য, নথি, সম্ভাব্য প্রমাণ এবং অন্যান্য উপাদান সংগ্রহ করা হয়েছে, সেগুলিও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করতে হবে। পাশাপাশি মামলার কেস ডায়েরিও সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মামলাকারী পক্ষকেও তদন্তের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ নথি সিবিআইকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বিশেষ করে তাঁদের অভিযোগের প্রতিলিপি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দিতে হবে, যাতে নতুন করে তদন্ত শুরু করার সময় সমস্ত তথ্য এক জায়গায় পাওয়া যায়।

এখন সিবিআইয়ের তদন্ত কোন পথে এগোয়, সেদিকেই নজর থাকবে। দীর্ঘ ন’বছর ধরে যে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি, নতুন তদন্তকারী সংস্থা সেই নিখোঁজ মহিলার সন্ধান দিতে পারে কি না, সেটিই এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্যে কোনও বৃহত্তর অপরাধচক্র, মানব-পাচার বা অন্য কোনও যোগ রয়েছে কি না, তদন্তে তা প্রকাশ্যে আসে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সিবিআইকে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে দ্রুত আদালতকে জানাতে হবে। চার সপ্তাহ পর মামলাটির ফের শুনানি হবে এবং সেই সময় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে তদন্তের অগ্রগতির রিপোর্ট পেশ করতে হবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অমীমাংসিত হয়ে থাকা এই নিখোঁজের মামলায় এবার নতুন করে তদন্তের গতি তৈরি হয় কি না, তার দিকেই তাকিয়ে পরিবার এবং আদালত।

No Comments

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved